১১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ | শুক্রবারবাংলা: ২৭ ভাদ্র ১৪৩৩
জীবনযাপন

‘ভালো আছি’ বললেই কি সত্যিই ভালো আছি?

publicmentalhealth

‘কেমন আছেন?’—পরিচিত এই প্রশ্নের জবাবও যেন আমাদের সবার মুখস্থ। ‘ভালো আছি।’ কথাটি এতটাই স্বাভাবিক যে, এর ভেতরে লুকিয়ে থাকা গল্পটি আমরা খুব কমই জানতে চাই। অথচ অনেক সময় এই দুটো শব্দের আড়ালেই লুকিয়ে থাকে ক্লান্তি, উদ্বেগ, হতাশা কিংবা দীর্ঘদিনের মানসিক চাপ।

মানসিক চাপ মানেই যে চোখের সামনে কান্না, অস্থিরতা কিংবা প্যানিক অ্যাটাক—বিষয়টি এমন নয়। বরং বাইরে থেকে একেবারে স্বাভাবিক দেখাচ্ছে, এমন মানুষের মধ্যেও তীব্র স্ট্রেস থাকতে পারে। সফল ব্যবসায়ী, ভালো ফল করা শিক্ষার্থী কিংবা হাসিমুখে সংসার সামলানো একজন গৃহিণী—যে কেউ নিজের ভেতরের অস্বস্তি লুকিয়ে রাখতে পারেন।

অনেক সময় দায়িত্ব, সামাজিক প্রত্যাশা কিংবা ‘সবকিছু ঠিক আছে’ দেখানোর প্রবণতা মানুষকে নিজের অনুভূতিগুলো চেপে রাখতে শেখায়। কিন্তু অনুভূতিকে লুকিয়ে রাখলেই যে তা হারিয়ে যায়, তা নয়।

কেন নিজের কষ্টের কথা বলতে চাই না আমরা?

মানসিক চাপের কথা প্রকাশ না করার পেছনে রয়েছে নানা সামাজিক ও ব্যক্তিগত কারণ। কেউ হয়তো ভাবেন, নিজের সমস্যার কথা বললে অন্যরা তাঁকে দুর্বল মনে করবেন। কেউ আবার ভয় পান সমালোচনা বা বিচারকে। পরিবারের দায়িত্বও অনেককে নীরব করে দেয়। সন্তান, জীবনসঙ্গী কিংবা পরিবারের অন্য সদস্যদের সামনে নিজেকে শক্ত রাখার চেষ্টা করতে গিয়ে অনেকে নিজের কষ্টের কথাই ভুলে যান। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে সামাজিকভাবে তৈরি কিছু ধারণাও। বিশেষ করে পুরুষদের ছোটবেলা থেকেই অনেক সময় শেখানো হয়—‘ছেলেরা কাঁদে না’, ‘শক্ত থাকতে হয়’। ফলে কষ্ট, ভয় বা হতাশার মতো আবেগ প্রকাশ করাও তাঁদের কাছে কঠিন হয়ে ওঠে। দীর্ঘদিন আবেগ প্রকাশ না করার এই অভ্যাস ধীরে ধীরে মানসিক চাপকে আরও গভীর করতে পারে।

Advertisements

মনের চাপ শরীরেও পড়ে

মানসিক চাপকে শুধু মনের বিষয় ভাবার সুযোগ নেই। দীর্ঘদিনের স্ট্রেস শরীরের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপে শরীরে করটিসলসহ বিভিন্ন স্ট্রেস-সংশ্লিষ্ট হরমোনের কার্যক্রমে পরিবর্তন আসে। এর প্রভাব পড়তে পারে ঘুম, ক্ষুধা ও মেজাজের ওপর। কারও ঘুম কমে যেতে পারে, আবার কেউ অতিরিক্ত ঘুমাতে পারেন। কারও খাওয়ার ইচ্ছা কমে যায়, আবার কেউ বেশি খেতে শুরু করেন। মাথাব্যথা, ক্লান্তি কিংবা হজমের সমস্যার মতো শারীরিক অস্বস্তিও অনেক সময় মানসিক চাপের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।

দীর্ঘদিনের অনিয়ন্ত্রিত স্ট্রেস উদ্বেগ ও বিষণ্নতার ঝুঁকিও বাড়াতে পারে। তাই শরীরের ছোটখাটো পরিবর্তনগুলোকে সবসময় অবহেলা না করে এর পেছনে মানসিক চাপ কাজ করছে কি না, সেটিও খেয়াল করা জরুরি।

কর্মক্ষেত্রেও লুকিয়ে থাকতে পারে স্ট্রেস

দিনের বড় একটি সময় আমরা কর্মক্ষেত্রে কাটাই। তাই অফিসের পরিবেশ আমাদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব ফেলবে—এটাই স্বাভাবিক। আলো, শব্দ, তাপমাত্রা, আর্দ্রতা কিংবা দীর্ঘ সময় একই জায়গায় বসে থাকার মতো বিষয়গুলো অস্বস্তি তৈরি করতে পারে। অতিরিক্ত উজ্জ্বল বা অপর্যাপ্ত আলো চোখ ও মাথার ওপর চাপ ফেলতে পারে। আবার অতিরিক্ত শব্দও বিরক্তি ও মানসিক ক্লান্তি বাড়াতে পারে।

অন্যদিকে, দীর্ঘ সময় একটানা বসে কাজ করার অভ্যাস শরীরকে যেমন অস্বস্তিতে ফেলে, তেমনি মানসিকভাবেও ক্লান্ত করে তুলতে পারে। কাজের ফাঁকে সামান্য হাঁটাহাঁটি, অবস্থান পরিবর্তন কিংবা কিছুক্ষণ বিরতি নেওয়া তাই শুধু শারীরিক নয়, মানসিক স্বস্তির জন্যও উপকারী হতে পারে।

এমনকি জরুরি পরিস্থিতিতে অন্ধকার বা ধোঁয়ার কারণে দৃষ্টিশক্তি সাময়িকভাবে বাধাগ্রস্ত হলেও মানুষের ভয় ও উদ্বেগ বেড়ে যেতে পারে। অর্থাৎ আমাদের চারপাশের পরিবেশও কখনো কখনো অজান্তেই মানসিক চাপের মাত্রা বাড়িয়ে দিতে পারে।

তাহলে কীভাবে সামলাবেন?

স্ট্রেস জীবনের পুরোপুরি এড়িয়ে যাওয়ার মতো কোনো বিষয় নয়। কাজ, সম্পর্ক, দায়িত্ব কিংবা জীবনের নানা পরিবর্তনের সঙ্গে কিছুটা চাপ থাকবেই। তবে সেটিকে দীর্ঘদিন চেপে রাখা কিংবা ‘আমি ভালো আছি’ বলে এড়িয়ে যাওয়া সমস্যার সমাধান নয়। প্রথমেই নিজের অনুভূতিকে চিনুন। আপনি কি আসলে ক্লান্ত, হতাশ, উদ্বিগ্ন নাকি কোনো নির্দিষ্ট বিষয় নিয়ে ভয় পাচ্ছেন—অনুভূতির সঠিক নাম দিতে পারা গুরুত্বপূর্ণ। মনোবিজ্ঞানে বহুল ব্যবহৃত একটি ধারণা হলো, অনুভূতিকে চিহ্নিত করা তাকে সামলানোর প্রথম ধাপ হতে পারে।

কর্মপরিবেশও গুরুত্ব দিন। পর্যাপ্ত আলো-বাতাস, আরামদায়ক তাপমাত্রা এবং অপ্রয়োজনীয় শব্দ কমানোর চেষ্টা করুন। কাজের জায়গায় সম্ভব হলে এমন পরিবেশ তৈরি করুন, যেখানে কিছুটা স্বস্তি পাওয়া যায়। একটানা কাজ করবেন না। দীর্ঘ সময় একই ভঙ্গিতে বসে থাকার পরিবর্তে মাঝেমধ্যে উঠে দাঁড়ান, কয়েক মিনিট হাঁটুন কিংবা চোখ ও মনকে কাজ থেকে সাময়িক বিরতি দিন।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—নিজের অনুভূতিকে ছোট করে দেখবেন না। সবসময় শক্ত থাকার প্রয়োজন নেই। কখনো কখনো ‘ভালো আছি’ বলার বদলে নিজের কাছেই স্বীকার করা দরকার—‘আজ আমার মনটা ভালো নেই।’ কারণ মানসিক সুস্থতার শুরু হয় সমস্যাকে লুকিয়ে রাখার মধ্য দিয়ে নয়, বরং সেটিকে স্বীকার করার মধ্য দিয়েই।

Advertisements