১০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ | বৃহস্পতিবারবাংলা: ২৬ ভাদ্র ১৪৩৩
জীবনযাপন

অন্যকে হাসাতে গিয়ে নিজেকেই ছোট করছেন না তো?

2ff5f78e-73d0-4525-845f-0b8277ab3016

নিজের ভুল নিয়ে হেসে ফেলতে পারা অনেক সময় মানসিক শক্তির পরিচয়। জীবনের ছোটখাটো ব্যর্থতা, বিব্রতকর মুহূর্ত কিংবা নিজের কোনো অদ্ভুত অভ্যাসকে খুব বেশি গুরুত্ব না দিয়ে মজার চোখে দেখতে পারলে চাপ কমে, মনও হালকা হয়। কিন্তু এখানেই রয়েছে একটি সূক্ষ্ম সীমারেখা। নিজেকে নিয়ে হাসা আর নিজেকে নিয়ে হাসাহাসির সুযোগ তৈরি করা এক বিষয় নয়।
কখনো আত্মরসিকতা মানুষকে আত্মবিশ্বাসী করে তোলে, আবার কখনো একই অভ্যাস ধীরে ধীরে আত্মসম্মান ক্ষয় করতে পারে। তাহলে কোনটি স্বাস্থ্যকর, আর কোনটি মানসিক আঘাতের ইঙ্গিত?

শৈশবেই তৈরি হতে পারে হাসির সঙ্গে সম্পর্ক

অন্যের ঠাট্টা বা বিদ্রুপকে একজন মানুষ কীভাবে গ্রহণ করবেন, তার ভিত্তি অনেক সময় তৈরি হয় ছোটবেলাতেই। ১৯৯০-এর দশকে শিশুদের ওপর পরিচালিত কিছু গবেষণায় দেখা যায়, সহপাঠীদের নিয়মিত উপহাসের শিকার হওয়া শিশুদের মধ্যে পরবর্তীতে নানা ধরনের আচরণগত পরিবর্তন দেখা দিতে পারে। কেউ হয়ে ওঠে আক্রমণাত্মক, আবার কেউ নিজেকে গুটিয়ে নেয় কিংবা অতিরিক্ত আত্মকেন্দ্রিক হয়ে পড়ে।

দীর্ঘদিন বিদ্রুপের অভিজ্ঞতা একজন মানুষকে এমনভাবে প্রভাবিত করতে পারে যে পরবর্তী জীবনে সাধারণ হাসি-ঠাট্টাকেও সে সন্দেহের চোখে দেখতে শুরু করে। বিপরীতে, যারা পরিবার, বন্ধু ও সহপাঠীদের সঙ্গে ইতিবাচক সামাজিক সম্পর্কের মধ্যে বড় হয়, তারা অনেক সময় বিব্রতকর পরিস্থিতিকেও তুলনামূলক সহজভাবে সামলাতে পারে। অর্থাৎ, নিজের দিকে তাকিয়ে হাসতে পারা নিছক রসবোধের বিষয় নয়; এর সঙ্গে সামাজিক নিরাপত্তাবোধ ও মানসিক স্বাচ্ছন্দ্যেরও সম্পর্ক রয়েছে।

নিজের ভুল দেখে সত্যিই কি হাসা যায়?

নিজের আচরণ বা চেহারা দেখে মানুষ সত্যিই হাসতে পারে কি না—এ নিয়েও একসময় মনোবিজ্ঞান ও দর্শনে বিতর্ক ছিল। প্রাচীন দার্শনিকদের অনেকের ধারণায়, হাসির সঙ্গে অন্যের ওপর শ্রেষ্ঠত্ববোধের সম্পর্ক রয়েছে। সেই কারণে নিজের দুর্বলতা বা ভুল নিয়ে মানুষ কীভাবে আনন্দের সঙ্গে হাসতে পারে, তা ছিল বেশ কৌতূহলের বিষয়। ২০১১ সালের একটি পরীক্ষায় এই প্রশ্নের বাস্তব প্রমাণ খোঁজার চেষ্টা করা হয়। গবেষকেরা অংশগ্রহণকারীদের অজান্তে তাদের ভিডিও ধারণ করেন। পরে সেই ভিডিও তাদের দেখানো হলে বেশির ভাগ অংশগ্রহণকারীর মুখে হাসি দেখা যায়। প্রায় ৮০ শতাংশ মানুষ অন্তত একবার হেসেছিলেন এবং প্রায় ৪০ শতাংশ জোরে হেসেছিলেন। অর্থাৎ, নিজের অস্বাভাবিক বা মজার মুহূর্ত দেখেও মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে হাসতে পারে। তবে এই ক্ষমতা সবার ক্ষেত্রে সমান নয়।

Advertisements

অন্যের হাসি কেন এত ভয়ংকর মনে হয়?

কেউ কেউ নিজের দিকে তাকিয়ে হাসতে তো পারেনই না, বরং অন্যরা হাসলেই মনে করেন—তাকে নিয়েই বুঝি হাসাহাসি চলছে। মনোবিজ্ঞানে এই প্রবণতাকে বলা হয় জেলোটোফোবিয়া (Gelotophobia)। সহজভাবে বললে, অন্যের হাসির বিষয় হয়ে যাওয়ার ভয় বা অস্বস্তি।

এ ধরনের মানুষ বন্ধুদের স্বাভাবিক রসিকতাকেও ব্যক্তিগত আক্রমণ হিসেবে ব্যাখ্যা করতে পারেন। সামাজিক পরিস্থিতিতে তাই তারা অস্বস্তিতে পড়েন, মানুষের কাছ থেকে দূরে সরে যেতে চান কিংবা নতুন সম্পর্ক তৈরিতে সংকোচ বোধ করেন। এর পেছনে থাকতে পারে ছোটবেলার অপমানজনক অভিজ্ঞতা, কঠোর পারিবারিক পরিবেশ, সহপাঠীদের নিয়মিত উপহাস কিংবা দীর্ঘদিনের সামাজিক প্রত্যাখ্যান। কিছু গবেষণায় আবার সংস্কৃতি ও সামাজিক পরিবেশের পার্থক্যের কথাও উঠে এসেছে।

এই প্রবণতার সঙ্গে একাকিত্ব, বন্ধুত্ব এড়িয়ে চলা, কম জীবনসন্তুষ্টি এবং বিষণ্নতার মতো নেতিবাচক অভিজ্ঞতার সম্পর্কও পাওয়া গেছে।

হাসির আরেক রূপ—নিজেকে হালকা করে দেখা

গল্পের অন্য দিকটিও বেশ ইতিবাচক। মনোবিজ্ঞানে জেলোটোফিলিয়া (Gelotophilia) বলতে এমন একটি প্রবণতাকে বোঝানো হয়, যেখানে মানুষ অন্যের হাসি বা মজার পরিস্থিতিকে ভয় না পেয়ে সেটিকে ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করতে পারে। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে ‘প্লেফুলনেস’ বা খেলাচ্ছলে জীবনকে দেখার ক্ষমতা। অর্থাৎ, জীবনের প্রতিটি ঘটনাকে অতিরিক্ত গম্ভীরভাবে না নিয়ে কখনো কখনো তার মজার দিকটিও খুঁজে পাওয়া।

ধরা যাক, দীর্ঘ সময় ধরে একটি একঘেয়ে কাজ করতে হচ্ছে। একজন হয়তো পুরো বিষয়টিকে বিরক্তিকর হিসেবে দেখবেন। অন্যজন একই কাজের মধ্যে ছোট কোনো মজার দিক খুঁজে নেবেন। পরিস্থিতি একই, কিন্তু দেখার দৃষ্টিভঙ্গি আলাদা।
এই মানসিক নমনীয়তা অনেক সময় আত্মসম্মান, সামাজিক স্বাচ্ছন্দ্য ও ব্যক্তিগত সন্তুষ্টির সঙ্গে ইতিবাচকভাবে যুক্ত থাকে।

কিন্তু সব আত্মরসিকতা স্বাস্থ্যকর নয়

এখানেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্যটি। নিজেকে নিয়ে রসিকতা করা মানেই আত্মবিশ্বাসী হওয়া নয়। ২০০৩ সালে কানাডীয় গবেষকেরা মানুষের হাস্যরসের ধরনকে চারটি ভাগে দেখেছিলেন—
১. সামাজিক সম্পর্ক তৈরির হাস্যরস
অন্যদের সঙ্গে যোগাযোগ ও সম্পর্ক সহজ করতে ব্যবহৃত রসিকতা।
২. নিজেকে ইতিবাচকভাবে সামলে নেওয়ার হাস্যরস
কঠিন পরিস্থিতিতেও মজার দিক খুঁজে নিয়ে মানসিক চাপ কমানোর চেষ্টা।
৩. আক্রমণাত্মক হাস্যরস
অন্যকে আঘাত, অপমান বা নিয়ন্ত্রণ করার জন্য রসিকতা ব্যবহার।
৪. আত্মঅবমাননামূলক হাস্যরস
অন্যকে আনন্দ দেওয়ার জন্য বারবার নিজের দুর্বলতা, ব্যর্থতা বা ত্রুটিকে হাসির বিষয় বানানো।

প্রথম দুই ধরনের হাস্যরস সাধারণত বেশি ইতিবাচক। কিন্তু চতুর্থ ধরনটি সমস্যাজনক হতে পারে।

‘আমি আবার ভুল করলাম’ আর ‘আমি কিছুই পারি না’—এক নয়

ধরুন, কোনো কাজে ভুল হয়েছে। আপনি হেসে বললেন, ‘আবারও একই কাণ্ড করলাম!’—এটি হতে পারে পরিস্থিতিকে হালকা করে নেওয়ার স্বাভাবিক উপায়।

কিন্তু যদি একই ঘটনার পর আপনি বলতে থাকেন, ‘আমি কিছুই পারি না’, ‘আমি সবসময় ব্যর্থ’, ‘আমাকে দিয়ে কিছু হবে না’, তখন বিষয়টি আর নিছক রসিকতার মধ্যে থাকে না। বারবার নিজের সম্পর্কে নেতিবাচক কথা বলতে বলতে সেটিই একসময় নিজের প্রতি বিশ্বাসের অংশ হয়ে যেতে পারে। অন্যকে হাসানোর জন্য নিজেকে ছোট করা তখন আত্মসম্মানের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

তাহলে বুঝবেন কীভাবে—আপনার রসিকতা স্বাস্থ্যকর কি না?

এর একটি সহজ মাপকাঠি হতে পারে রসিকতার পর আপনার নিজের অনুভূতি। নিজেকে নিয়ে মজা করার পর যদি আপনার মন হালকা হয়, পরিস্থিতিকে গ্রহণ করা সহজ হয় এবং নিজের প্রতি বিরূপতা তৈরি না হয়, তাহলে সেটি স্বাস্থ্যকর আত্মরসিকতার অংশ হতে পারে।

অন্যদিকে, রসিকতার পর যদি লজ্জা, অপমান, অপরাধবোধ বা নিজের প্রতি ঘৃণা বাড়তে থাকে, তাহলে থামা দরকার।

বিশেষজ্ঞদের মতে, নিজের কোনো দুর্বলতা নিয়ে মজা করার আগে সেটি নিয়ে নিজের ভেতরে কিছুটা স্বস্তি তৈরি হওয়া জরুরি। যে বিষয়টি এখনো গভীরভাবে কষ্ট দেয়, সেটিকে শুধু অন্যকে হাসানোর জন্য রসিকতার বিষয় বানানো সবসময় ভালো ফল নাও দিতে পারে।

শেষ পর্যন্ত হাসিটা যেন নিজের বিরুদ্ধেই না যায়

নিজেকে নিয়ে হাসতে পারা আসলে নিজের অসম্পূর্ণতাকে স্বীকার করার একটি সুন্দর উপায় হতে পারে। এতে বোঝা যায়—ভুল করেছি, কিন্তু সেই ভুলই আমার পুরো পরিচয় নয়।

জীবনে ভুল হবে, বিব্রতকর মুহূর্ত আসবে, কখনো ব্যর্থতাও আসবে। প্রতিটি ঘটনাকে নিজের মূল্য নির্ধারণের মাপকাঠি বানানোর প্রয়োজন নেই। তাই নিজের দিকে তাকিয়ে হাসুন—তবে নিজেকে ছোট করে নয়, নিজেকে গ্রহণ করে। কারণ আত্মরসিকতার সবচেয়ে সুন্দর জায়গা।

Advertisements