ধাত্রী থেকে জলবায়ু-সহিষ্ণু কৃষির সফল চাষি রেনুকা

বাগেরহাটের শরণখোলা উপজেলার পূর্ব আমড়াগাছিয়া গ্রামের রেনুকা রাণী মিস্ত্রির জীবন একসময় আবর্তিত হতো ধাত্রীসেবা আর সংসারের টানাপোড়েন ঘিরে। বছরের পর বছর গ্রামের মানুষের সন্তান প্রসবের সময় পাশে দাঁড়িয়েছেন তিনি। কিন্তু সেই সেবার বিনিময়ে যে আয় হতো, তা দিয়ে চার সদস্যের সংসার চালানো সহজ ছিল না। বছরের বড় একটা সময় তাই অর্থকষ্টেই কাটত ৬৩ বছর বয়সী রেনুকার।
আজ সেই চিত্র অনেকটাই বদলে গেছে। ধাত্রী হিসেবে পরিচিত রেনুকা এখন নিজ এলাকাতেই পরিচিত একজন সফল প্রান্তিক কৃষি উদ্যোক্তা হিসেবে। জলবায়ু-সহিষ্ণু পদ্ধতিতে নানা ধরনের সবজি চাষ করে মাত্র এক মৌসুমেই প্রায় ৫০ হাজার টাকা আয় করছেন তিনি। কৃষিকাজ শুধু তাঁর নিজের আয় বাড়ায়নি, ফিরিয়ে এনেছে সংসারের স্বচ্ছলতাও।
তবে এই পরিবর্তনের পথ মোটেও সহজ ছিল না। উপকূলীয় এলাকার কৃষকদের মতো রেনুকার পরিবারকেও দীর্ঘদিন লড়তে হয়েছে লবণাক্ততা, অনিয়মিত আবহাওয়া ও কৃষি প্রযুক্তির সীমাবদ্ধতার সঙ্গে। তাঁর স্বামী প্রায় এক দশক ধরে কৃষিকাজ করলেও কাঙ্ক্ষিত লাভ পেতেন না। জমিতে দিতে হতো প্রচুর শ্রম, কিন্তু আবহাওয়ার বিরূপতা ও সঠিক কৃষি পরিকল্পনার অভাবে ফসল থেকে আয় থাকত সামান্যই।
পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে ‘অপরাজেয় দেশ’ প্রকল্পের মাধ্যমে। ব্র্যাক ব্যাংকের অর্থায়নে এবং এনজিও ব্র্যাকের ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত এই প্রকল্পের আওতায় রেনুকা যুক্ত হন ‘অ্যাডাপ্টেশন ক্লিনিক’-এর সঙ্গে। সেখানেই কৃষি নিয়ে তাঁর নতুন করে শেখার শুরু।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা করে কীভাবে উপকূলীয় এলাকায় চাষাবাদ করা যায়, কোন মৌসুমে কোন ফসল উপযোগী, মাটির স্বাস্থ্য কীভাবে ধরে রাখতে হয়, কখন বীজ বপন বা চারা রোপণ করতে হবে- এসব বিষয়ে হাতে-কলমে ধারণা পান রেনুকা। একই সঙ্গে শেখেন জৈবিক উপায়ে বালাইনাশক ব্যবহারের কৌশল এবং স্থানীয় বাজারের চাহিদা বুঝে ফসল নির্বাচন করার পদ্ধতি।
প্রশিক্ষণের আগে উপকূলীয় অঞ্চলের জন্য আলাদা ধরনের কৃষি ব্যবস্থাপনার প্রয়োজন রয়েছে- এ বিষয়টি তাঁর জানা ছিল না। প্রশিক্ষণের পর তিনি বুঝতে পারেন, কৃষিতে শুধু পরিশ্রম করলেই হয় না; সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়াও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
সেই জ্ঞান কাজে লাগিয়েই নিজের বসতভিটার জমিকে কাজে লাগানোর উদ্যোগ নেন রেনুকা। বাড়ির আঙিনায় একে একে চাষ শুরু করেন মিষ্টি কুমড়া, লাউ, ব্রকলি, স্কোয়াশ, বিটরুট, মুলা, ওলকপি, ফুলকপি ও বিভিন্ন রঙের বাঁধাকপি। সব মিলিয়ে প্রায় ৫০ জাতের সবজি ফলিয়েছেন তিনি।
রেনুকার ভাষায়, আগে কখন কোন সবজি চাষ করতে হবে, কীভাবে পরিচর্যা করতে হবে কিংবা আবহাওয়া বদলালে কী ব্যবস্থা নিতে হবে—এসব নিয়ে অনিশ্চয়তায় থাকতে হতো। এখন সেই সিদ্ধান্তগুলো অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে নিতে পারেন তিনি।
শুধু প্রশিক্ষণ নয়, প্রকল্প থেকে পাওয়া বীজ ও সারও তাঁর চাষাবাদে বড় ভূমিকা রেখেছে। নিয়মিত আবহাওয়া-সংক্রান্ত কল, এসএমএস ও কৃষি পরামর্শও তাঁকে সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করেছে। কখন চারা রোপণ করতে হবে, কখন ফসল সংগ্রহ করা ভালো কিংবা আবহাওয়ার পরিবর্তনের সঙ্গে কীভাবে মানিয়ে নিতে হবে—এসব তথ্য পেয়েছেন সময়মতো।
ফলে কৃষি এখন আর রেনুকার কাছে শুধু সংসারের সহায়ক একটি কাজ নয়; এটি হয়ে উঠেছে আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস। নিজের সাফল্যের পর অবশ্য থেমে থাকেননি রেনুকা। এলাকার অন্য নারীদেরও জলবায়ু-সহিষ্ণু কৃষিতে যুক্ত হতে উৎসাহ দিচ্ছেন তিনি। নিজের অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিচ্ছেন প্রতিবেশীদের সঙ্গে। তাঁর লক্ষ্য, শুধু নিজের পরিবার নয়—নিজের মতো আরও অনেক পরিবার যেন কৃষির মাধ্যমে স্বাবলম্বী হতে পারে।
রেনুকার গল্প তাই শুধু একজন নারীর পেশা বদলের গল্প নয়। এটি দেখায়, জলবায়ু পরিবর্তনের মতো বড় চ্যালেঞ্জের মধ্যেও সঠিক জ্ঞান, উপযুক্ত প্রযুক্তি, প্রয়োজনীয় উপকরণ ও সময়মতো পরামর্শ পেলে প্রান্তিক কৃষকের জীবনেও পরিবর্তন সম্ভব। শরণখোলা, মোড়েলগঞ্জ, মোংলা ও রামপাল—বাগেরহাটের এই চার উপজেলায় রেনুকার মতো প্রায় ৩ হাজার ৭০০ কৃষক ‘অপরাজেয় দেশ’ প্রকল্পের আওতায় জলবায়ু-সহিষ্ণু বীজ, জৈব সার ও পরিবেশবান্ধব কৃষি প্রযুক্তির সহায়তা পাচ্ছেন। প্রদর্শনী খামারের মাধ্যমে অভিযোজনমূলক কৃষি পদ্ধতি তুলে ধরার পাশাপাশি সৌরচালিত সেচ ব্যবস্থার ব্যবহারও শেখানো হচ্ছে, যাতে ডিজেলের ওপর নির্ভরতা ও কৃষকের খরচ কমে।
এই উদ্যোগের গুরুত্বপূর্ণ অংশ স্থায়ী ও ভ্রাম্যমাণ ‘অ্যাডাপ্টেশন ক্লিনিক’। কৃষকের প্রয়োজন অনুযায়ী ফসল ব্যবস্থাপনা, মাটির স্বাস্থ্য ও পোকামাকড় দমন বিষয়ে তাৎক্ষণিক পরামর্শ দিচ্ছে এসব ক্লিনিক। পাশাপাশি চার হাজারের বেশি কৃষক নিয়মিত আবহাওয়া-ভিত্তিক ভয়েস মেসেজ পাচ্ছেন।
লবণাক্ততা, জলবায়ুর অনিশ্চয়তা আর আর্থিক সংকটের মধ্যে দাঁড়িয়ে রেনুকা আজ যেন সেই পরিবর্তনেরই প্রতিচ্ছবি। একসময় যাঁর পরিচয় ছিল গ্রামের ধাত্রী হিসেবে, এখন তাঁর হাতে শুধু মানুষের নতুন জীবনের সূচনা নয়—নিজের পরিবারেরও নতুন জীবনের গল্প।



