১১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ | শুক্রবারবাংলা: ২৭ ভাদ্র ১৪৩৩
নারী

পা’চারের শি’কার নারী-শিশুদের জন্য এক নারীর নিরন্তর সংগ্রাম: অনুরাধা কৈরালা

IMG_20260910_205900

আজ থেকে প্রায় ২৬ বছরেরও আগে তথা নব্বইয়ের দশকে অনুরাধা কৈরালা নারী ও শিশু পাচার বন্ধ করতে এবং তাদেরকে যৌন নির্যাতন থেকে বাঁচানোর জন্য কিছু করার প্রয়োজন অনুভব করেন। এর পাশাপাশি যেসকল নারী নিজ পরিবারে অত্যাচারের স্বীকার হন, তাদের জন্যও কিছু করবেন বলে ঠিক করেন। সেই সময়ে তিনি কাঠমান্ডুর পশুপতিনাথ মন্দিরে প্রতি সকালেই যেতেন। যাওয়ার পথে ভিক্ষারত নারীদেরকে দেখে তার তাদের জীবন সম্পর্কে জানার ইচ্ছা জাগে। তিনি তাদের সাথে কথাবার্তা শুরু করেন। কথা বলে তিনি জানতে পারেন, প্রায় সকলেই কোনো না কোনোভাবে নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন।

তাদের এসব কষ্ট এবং ভোগান্তি অনুরাধা খুব ভালোভাবেই বুঝতে পারছিলেন। কারণ, জীবনের একটা সময় তিনিও শিকার হন অমানবিক শারীরিক নির্যাতনের। অনুরাধার স্বামী প্রায়ই তাকে মারধোর করতেন। আর এর ফলে অনুরাধার তিন তিনবার গর্ভপাতও ঘটে। তবে এমন পরিস্থিতিতে কী করা উচিত, কার কাছে যাওয়া উচিত, কিছুই তার জানা ছিলো না। তাই অনেকদিনই মুখ বুজে সব সহ্য করে নেন। কিন্তু তৃতীয়বার গর্ভপাত ঘটলে তাদের বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটে। নির্যাতনের শিকার অনুরাধা তার মতো নির্যাতিতদের কথা শুনে বুঝতে পারলেন যে সঠিক জ্ঞান, সহায়তা এবং ব্যবস্থার অভাবে তারাও দুর্বিষহ জীবন পার করছেন।

শুরু হয় তার নির্যাতিত নারীদের স্বাবলম্বী করে তোলার সফর। যেসকল ভিক্ষুকদের সাথে তিনি কথা বলতেন, তাদেরকে তিনি আর্থিক সহায়তার কথা দেন, যদি তারা ভিক্ষা ছেড়ে দেন। এ প্রস্তাবে মাত্র আটজন নারী সাড়া দেন। তাদের প্রত্যেককে তিনি ১০০০ রুপি করে দেন, যেন তারা রাস্তায় ছোট ছোট দোকান চালিয়ে নিজের ভরণ-পোষণ করতে পারেন। তারা প্রতিদিন যা লাভ করত, তা থেকে দুই রুপি করে সংগ্রহ করতেন অনুরাধা। সংগৃহীত সকল অর্থই অন্য সুবিধাবঞ্চিত নারীদের জন্য খরচ করা হতো। অনুরাধার নিজের আয় ছিলো কম। তবে তার চেষ্টায় এবং ইচ্ছায় কোনো ত্রুটি ছিলো না। সাধ্যের মধ্যে যতটুক আর্থিক সহায়তা দেওয়া সম্ভব হয়, তিনি তার পুরোটাই দেন।

অনুপ্রেরণা

১৯৪৯ সালের ১৪ এপ্রিল অনুরাধা কৈরালা জন্মগ্রহণ করেন। পরিবারের কাছ থেকে সবসময়ই কম ভাগ্যবানদের তথা সুবিধাবঞ্চিতদের সাহায্য-সহযোগিতা করার শিক্ষা পান। তাই ছোটবেলা থেকেই সামাজিক কল্যাণমূলক কাজের সদিচ্ছা তার মধ্যে দেখা যায়। তিনি ভারতের কালিম্পং জেলার একটি হিল স্টেশনে পড়াশোনা করেন। সেন্ট জোসেফ কনভেন্ট স্কুলের মাদার এবং সিস্টারস তার মধ্যে সামাজিক কল্যাণমূলক কাজ করার স্পৃহা আরো বাড়িয়ে দেয়।

প্রাপ্তির ঝুলি

Advertisements

অনুরাধা কৈরালা তার কাজের জন্য এখন পর্যন্ত ৩৮টি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পুরস্কার জিতেছেন। এর মধ্যে রয়েছে- পদ্মশ্রী, যা কিনা ভারতের চতুর্থ সর্বোচ্চ বেসামরিক পুরস্কার। ২০১০ সালে অনুরাধাকে ‘সিএনএন হিরো অব দ্য ইয়ার’ নামে অভিহিত করা হয়।

তিনি যেন নিজের কাজ চালিয়ে যেতে পারেন, তাই তাকে ১,২৫,০০০ মার্কিন ডলারও দেওয়া হয়। তাছাড়া প্রবাল গোর্খা দক্ষিণ বহু পদক ১৯৯৯, ত্রিশক্তিপত্ত অ্যাওয়ার্ড ২০০২, বেস্ট সোশ্যাল ওয়ার্কার অব দ্য ইয়ার অ্যাওয়ার্ড- নেপাল ১৯৯৮, জার্মান ইউনিফেম প্রাইজ ২০০৭, কুইন সোফিয়া সিলভার মেডেল অ্যাওয়ার্ড ২০০৭, দ্য পিস আবে এবং কারেজ অভ কনশাস ২০০৬ তার উল্লেখযোগ্য প্রাপ্তি। অনুরাধার অবিচ্ছিন্ন প্রচেষ্টা এবং সংগ্রামের জন্য নেপাল সরকার সেপ্টেম্বরের ৫ তারিখকে ‘পাচারবিরোধী দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করেন। অনুরাধাকে তার কৃতিত্বের জন্য একসময় নারী-শিশু এবং সামাজিক কল্যাণ বিভাগের সহযোগী প্রাদেশিক মন্ত্রী হিসেবেও নিয়োজিত করা হয়েছিল।

তিনি কৈরালা যেভাবে নিপীড়িত নারী এবং শিশুদের জন্য কাজ করে যাচ্ছেন, তা অত্যন্ত প্রশংসনীয়। হাজারো অনাথ শিশুর জন্য তিনিই মা এবং বাবা দু’জনেরই দায়িত্ব পালন করছেন। আর নির্যাতিত নারীদের নতুন করে বেঁচে থাকার সুযোগ করে দিয়েছেন এই মহীয়সী নারী। অনুরাধা যে তার উপাধি যথাযথভাবে ধরে রাখছেন, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।

Advertisements