প্রতিদিন মাত্র ৫ মিনিট দ্রুত হাঁটা, কমতে পারে অকালমৃ’ত্যুর ঝুঁকি

ব্যস্ত জীবনে শরীরচর্চার জন্য আলাদা সময় বের করা অনেকের কাছেই কঠিন। দিনের শুরু থেকে কাজ, যাতায়াত, সংসার কিংবা পড়াশোনার ব্যস্ততায় নিয়মিত ব্যায়াম করার সুযোগ হয় না। ফলে ‘ব্যায়াম করতে হলে অন্তত ৩০ মিনিট সময় দিতে হবে’—এমন ধারণায় অনেকেই শুরু করার আগেই পিছিয়ে যান। তবে নতুন এক গবেষণা বলছে, সুস্থ থাকার জন্য শুরুতেই দীর্ঘ সময় ব্যায়াম করার প্রয়োজন নেই। প্রতিদিন মাত্র পাঁচ মিনিট দ্রুত হাঁটাও শরীরের জন্য ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে।
গবেষণাটি কীভাবে করা হয়েছে?

চলতি আগস্টে চিকিৎসাবিষয়ক সাময়িকী দ্য ল্যানসেট-এ প্রকাশিত এই গবেষণায় বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, প্রতিদিনের জীবনে সামান্য পরিমাণ শারীরিক কর্মকাণ্ড বাড়ালে তা দীর্ঘমেয়াদে স্বাস্থ্যের ওপর কী ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। এ জন্য ইউরোপের কয়েকটি দেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের ১ লাখ ৩৫ হাজারের বেশি প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়। গবেষণায় অংশ নেওয়া ব্যক্তিরা কয়েক বছর ধরে অ্যাকটিভিটি ট্র্যাকার ব্যবহার করেছিলেন। ফলে তাঁদের দৈনন্দিন হাঁটা ও অন্যান্য শারীরিক কর্মকাণ্ডের পরিমাণ সম্পর্কে তুলনামূলকভাবে নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যায়।
গবেষকেরা শুধু শারীরিক কর্মকাণ্ডের মাত্রাই বিবেচনায় নেননি। অংশগ্রহণকারীদের বয়স, শারীরিক গঠন এবং আগে থেকে থাকা বিভিন্ন রোগের ইতিহাসও বিশ্লেষণে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। গড়ে ৮ বছর ২ মাস তাঁদের অনুসরণ করা হয়েছে।
মাত্র পাঁচ মিনিটেই কী পরিবর্তন?
গবেষণার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ হলো, প্রতিদিন অতিরিক্ত পাঁচ মিনিট দ্রুতগতিতে হাঁটা অকালমৃত্যুর ঝুঁকি কমার সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। গবেষণায় ঘণ্টায় প্রায় ৩ থেকে সাড়ে ৪ মাইল গতিতে হাঁটার মতো মাঝারি থেকে তুলনামূলক দ্রুত শারীরিক কর্মকাণ্ডকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে যারা দৈনন্দিন জীবনে সবচেয়ে কম সক্রিয়, তাঁদের ক্ষেত্রে সামান্য বাড়তি শারীরিক কর্মকাণ্ডের সুফল তুলনামূলক বেশি হতে পারে বলে গবেষকেরা জানিয়েছেন।
অর্থাৎ, এত দিন যারা প্রায় কোনো ব্যায়ামই করতেন না, তাঁদের জন্য হঠাৎ কঠিন শরীরচর্চার রুটিন শুরু করার বদলে প্রতিদিন অল্প সময় দ্রুত হাঁটা দিয়েও শুরু করা সম্ভব।
যত বেশি নড়াচড়া, তত বেশি সম্ভাব্য সুফল

তবে পাঁচ মিনিটেই সব শেষ নয়। গবেষণায় দেখা গেছে, শারীরিক কর্মকাণ্ডের সময় বাড়ার সঙ্গে সম্ভাব্য স্বাস্থ্যগত সুফলও বাড়ে।
গবেষকদের হিসাবে, প্রতিদিন অতিরিক্ত ১০ মিনিট মাঝারি মাত্রার শারীরিক কর্মকাণ্ড অধিকাংশ প্রাপ্তবয়স্কের ক্ষেত্রে গবেষণার অনুসরণকালীন সময়ে সব ধরনের মৃত্যুর ঝুঁকি প্রায় ১৫ শতাংশ কম হওয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল।
এখানে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি—এ ধরনের গবেষণায় কোনো নির্দিষ্ট পরিমাণ হাঁটাকে সরাসরি ‘আয়ু বাড়ানোর কারণ’ হিসেবে প্রমাণ করা হয় না। বরং শারীরিক কর্মকাণ্ডের মাত্রা ও মৃত্যুঝুঁকির মধ্যে একটি সম্পর্ক পাওয়া যায়।
শুধু ব্যায়াম নয়, বসে থাকাটাও গুরুত্বপূর্ণ
গবেষণার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—শুধু কতটা সক্রিয় থাকছি, সেটিই নয়; দিনের কতটা সময় নিষ্ক্রিয় থাকছি, সেটিও স্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। গবেষণাটির প্রধান লেখক ও নরওয়ের স্কুল অব স্পোর্টস সায়েন্সেসের শারীরিক কর্মকাণ্ড ও স্বাস্থ্যবিষয়ক অধ্যাপক উলফ একেলুন্ডের মতে, শরীরের জন্য প্রতিটি নড়াচড়াই গুরুত্বপূর্ণ। কেউ নিয়মিত শারীরিকভাবে সক্রিয় হতে শুরু করলে শরীরে বিভিন্ন ধরনের শারীরবৃত্তীয় পরিবর্তন ঘটতে থাকে। অন্যদিকে সক্রিয় একটি দিনের মধ্যে কিছুটা সময় শরীর ও মনকে বিশ্রাম দেওয়াও প্রয়োজন। অর্থাৎ সারাক্ষণ ব্যস্ত বা শারীরিকভাবে সক্রিয় থাকাই স্বাস্থ্যকর—এমন নয়। কাজের পাশাপাশি পর্যাপ্ত বিশ্রাম ও ঘুমও সুস্থতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
হাঁটা কেন এত উপকারী?
হাঁটা এমন একটি শারীরিক কর্মকাণ্ড, যা প্রায় সব বয়সী মানুষের দৈনন্দিন জীবনে সহজেই যুক্ত করা যায়। নিয়মিত শারীরিক কর্মকাণ্ড শরীরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়ায় ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। এটি রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে, শরীরে দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহের ঝুঁকি কমাতে ভূমিকা রাখে এবং রোগ প্রতিরোধব্যবস্থার কার্যকারিতার ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। এসব পরিবর্তনের সঙ্গে হৃদ্রোগ ও কিছু দীর্ঘমেয়াদি গুরুতর রোগের ঝুঁকি কমার সম্পর্ক রয়েছে। ফলে হাঁটাকে শুধু ওজন কমানোর উপায় হিসেবে দেখলে এর সম্ভাব্য উপকারের একটি বড় অংশই বাদ পড়ে যায়।
শুরুটা হোক ছোট করে
ব্যায়ামের অভ্যাস গড়ে তোলার সবচেয়ে বড় বাধা অনেক সময় সময়ের অভাব নয়, বরং শুরু করার ভয়। ‘প্রতিদিন এক ঘণ্টা ব্যায়াম করতে হবে’—এমন লক্ষ্য শুরুতেই ঠিক করলে তা ধরে রাখা কঠিন হতে পারে। অধ্যাপক একেলুন্ডের পরামর্শও তাই বাস্তবসম্মত—যারা এখন খুব একটা সক্রিয় নন, তাঁরা দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় ছোট ছোট পরিবর্তন আনতে পারেন। ধীরে শুরু করে সময় ও শারীরিক কর্মকাণ্ডের মাত্রা ধাপে ধাপে বাড়ানোই হতে পারে কার্যকর পথ।
শুরু করার জন্য খুব কঠিন কোনো রুটিনও দরকার নেই। যেমন—
– লিফটের পরিবর্তে সিঁড়ি ব্যবহার করা।
-কাছাকাছি গন্তব্যে গাড়ি বা রিকশার বদলে হেঁটে যাওয়া।
-কাজের ফাঁকে কয়েক মিনিট হাঁটা।
-ফোনে কথা বলার সময় বসে না থেকে হাঁটা।
-প্রতিদিন অন্তত পাঁচ মিনিট তুলনামূলক দ্রুতগতিতে হাঁটার অভ্যাস করা।
দিনের ব্যস্ততার মধ্যে এই পাঁচ মিনিট হয়তো খুব সামান্য মনে হতে পারে। কিন্তু নিয়মিত শারীরিক কর্মকাণ্ডের ক্ষেত্রে ছোট পদক্ষেপও গুরুত্বপূর্ণ। তাই ‘সময় নেই’ বলে একেবারে নিষ্ক্রিয় থাকার বদলে আজ থেকেই কয়েক মিনিট হাঁটা দিয়ে শুরু করাই হতে পারে স্বাস্থ্যকর জীবনের একটি সহজ প্রথম ধাপ।



