বিদ্যুৎ নেই, থেমে যাচ্ছে চিকিৎসা: অস্ত্রোপচার থেকে নেবুলাইজার- হাসপাতালে বাড়ছে ঝুঁকি

একটি ছোট্ট শিশু শ্বাস নিতে পারছে না। নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত ৫৮ দিনের হাফছা জাহানকে চাঁদপুরের মতলব দক্ষিণ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়েছে। শ্বাসকষ্ট কমাতে নিয়মিত নেবুলাইজার দেওয়ার কথা। কিন্তু হাসপাতালে যখন বিদ্যুৎ নেই, তখন নেবুলাইজারও বন্ধ। মাথার ওপরের পাখাটিও ঘোরে না। গরমে শিশুটির শ্বাসকষ্ট আরও বেড়ে যায়। অসুস্থ মেয়েকে কোলে নিয়ে তাই বিদ্যুৎ ফেরার অপেক্ষায় বসে থাকেন মা কামরুন নাহার।
এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। দেশের বিভিন্ন উপজেলা হাসপাতালের চিত্র এখন অনেকটা একই। কোথাও বিদ্যুৎ না থাকায় নেবুলাইজার দেওয়া যাচ্ছে না, কোথাও এক্স-রে বা ইসিজি পরীক্ষা বন্ধ। প্যাথলজি পরীক্ষাও থেমে যাচ্ছে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, কোথাও কোথাও অস্ত্রোপচার চলার সময়ও বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে। তখন জেনারেটর চালু করে কোনোভাবে পরিস্থিতি সামাল দিতে হচ্ছে। আবার জেনারেটর থাকলেও অনেক হাসপাতালে নেই প্রয়োজনীয় জ্বালানি। ফলে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে আসা রোগী ও স্বজনদের নতুন করে অপেক্ষা করতে হচ্ছে—কখন বিদ্যুৎ আসবে, কখন পরীক্ষা হবে, কখন চিকিৎসা শুরু হবে।
গত শনিবার ও রোববার দেশের একটি জেলা সদর ও ১৩টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ঘুরে রোগী, স্বজন, চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে বিদ্যুৎ–সংকটে চিকিৎসাসেবার এমন চিত্র পাওয়া গেছে।
শ্বাসকষ্টের শিশুর চিকিৎসাতেও বিদ্যুতের অপেক্ষা
চাঁদপুরের মতলব দক্ষিণ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি হাফছা জাহানের মতোই দুর্ভোগে পড়েছে আরও অনেক শিশু। চট্টগ্রামের পটিয়ায় নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত দেড় বছরের মোফাছিরকে দিনে ছয়বার নেবুলাইজার দেওয়ার কথা থাকলেও গত শনিবার দেওয়া সম্ভব হয়েছে তিনবার।
লক্ষ্মীপুরের রায়পুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চার বছরের মিনু আক্তারেরও একই অবস্থা। নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত শিশুটির দিনে চারবার নেবুলাইজার প্রয়োজন। কিন্তু বিদ্যুৎ না থাকায় নিয়মিত চিকিৎসা দেওয়া যাচ্ছে না। নেবুলাইজারের মতো জীবনরক্ষাকারী চিকিৎসা সরঞ্জাম চালাতে যেখানে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ প্রয়োজন, সেখানে দীর্ঘ লোডশেডিং রোগীর চিকিৎসাকে সরাসরি ব্যাহত করছে।
মতলব দক্ষিণ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক চিকিৎসক রাজিব কিশোর বণিক জানান, কয়েক দিন ধরে হাসপাতালে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ থাকছে না। ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের কারণে এক্স-রে, ইসিজি ও নেবুলাইজেশন কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।
অস্ত্রোপচারের মাঝেও অন্ধকার
হাসপাতালে বিদ্যুৎ চলে যাওয়া শুধু রোগীর ভোগান্তি বাড়ায় না, কখনো কখনো তৈরি করে সরাসরি চিকিৎসাঝুঁকি।
রাজশাহীর বাগমারা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সপ্তাহখানেক আগে সিজারিয়ান অস্ত্রোপচার চলার সময় হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে যায়। অস্ত্রোপচার শুরু হওয়ার পরই ওটিতে নেমে আসে অন্ধকার। রোগী ও স্বজনদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে আতঙ্ক।
পরিস্থিতি সামাল দিতে মুঠোফোনের আলো ব্যবহার করা হয়। পরে দ্রুত তেল কিনে জেনারেটর চালু করে অস্ত্রোপচার শেষ করা হয়।
৫০ শয্যার এই হাসপাতালটিতে বিদ্যুৎ–বিভ্রাটের কারণে শুধু অস্ত্রোপচার নয়, এক্স-রে, ল্যাবরেটরি ও ইসিজি সেবাও ব্যাহত হচ্ছে।
বাগমারা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা শংকর কুমার বিশ্বাস বলেন, বিদ্যুৎ না থাকলে পরীক্ষা-নিরীক্ষাসহ হাসপাতালের প্রায় সব কার্যক্রমই স্থবির হয়ে পড়ে। অস্ত্রোপচার শুরু হওয়ার পর বিদ্যুৎ চলে যাওয়া অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। জেনারেটর মেরামত করা হলেও প্রয়োজনীয় জ্বালানি বরাদ্দ না থাকায় সেটি নিয়মিত চালানো সম্ভব হচ্ছে না। নীলফামারী জেনারেল হাসপাতালেও ঘটেছে একই ধরনের ঘটনা। গত শনিবার সেখানে সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারের সময় বিদ্যুৎ চলে যায়। অস্ত্রোপচার শুরুর প্রায় ১৫ মিনিট পর শাপলা বেগমের কন্যাসন্তানের জন্ম হয়। শিশুটিকে ওটি থেকে বের করে আনা গেলেও তখনো মায়ের অস্ত্রোপচার শেষ হয়নি। সেলাই চলছিল। পরে জেনারেটর চালু করে অস্ত্রোপচারের বাকি কাজ শেষ করা হয়।
জেনারেটর আছে, কিন্তু তেল নেই
লোডশেডিং হলে হাসপাতালের বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে জেনারেটর থাকার কথা। কিন্তু বাস্তবে অনেক জায়গায় জেনারেটর থাকলেও তা চালানোর মতো জ্বালানি নেই। মতলব দক্ষিণ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের একমাত্র জেনারেটরটিও জ্বালানির অভাবে বন্ধ। এটি চালাতে প্রতিদিন প্রায় ১৫ থেকে ২০ লিটার তেল প্রয়োজন। কিন্তু সেই তেল কেনার জন্য অর্থ বরাদ্দ নেই।
লক্ষ্মীপুরের রায়পুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সেও জেনারেটর রয়েছে। তবে ডিজেলের বরাদ্দ না থাকায় বিদ্যুৎ চলে গেলে সেটি প্রয়োজনমতো চালানো যাচ্ছে না।অর্থাৎ বিদ্যুৎ চলে গেলে হাসপাতালের হাতে বিকল্প ব্যবস্থা থাকার কথা থাকলেও বাস্তবে সেই ব্যবস্থাটিও অনেক জায়গায় অচল।সরকারি হাসপাতালে পরীক্ষা বন্ধ, রোগীর বাড়তি খরচ
বিদ্যুৎ–সংকটের আরেকটি বড় ধাক্কা পড়ছে রোগ নির্ণয়ের ক্ষেত্রে। টাঙ্গাইলের সখীপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে লোডশেডিংয়ের পাশাপাশি কম ভোল্টেজের কারণে এক্স-রে মেশিনও মাঝেমধ্যে অচল হয়ে পড়ছে। গত শনিবার মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় আহত গড়গোবিন্দপুর গ্রামের রফিকুল ইসলাম হাসপাতালে এসে এক্স-রে করাতে পারেননি। মেশিন চালু না থাকায় তাঁকে বেসরকারি ক্লিনিকে গিয়ে ৫০০ টাকা খরচ করে পরীক্ষা করাতে হয়েছে। অথচ সরকারি হাসপাতালে একই পরীক্ষার জন্য তাঁর খরচ হতো মাত্র ৫৫ টাকা।
সখীপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের এক্স-রে বিভাগের মেডিকেল টেকনোলজিস্ট এস এম আমিরুল ইসলাম মোমেন জানান, লোডশেডিংয়ের পাশাপাশি কম ভোল্টেজের কারণেও এক্স-রে মেশিন মাঝেমধ্যে অচল হয়ে যাচ্ছে। এর অর্থ, বিদ্যুৎ–সংকট শুধু চিকিৎসাসেবা থামিয়ে দিচ্ছে না; রোগীর চিকিৎসা ব্যয়ও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎহীন হাসপাতাল
মৌলভীবাজারের কুলাউড়া ও জুড়ী স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে রোগী ও স্বজনদের ভাষ্য, দিনে-রাতে ৮ থেকে ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকে না। কুলাউড়া স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চার দিন ধরে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত দুই বছরের সন্তানকে নিয়ে ভর্তি ছিলেন পপি রানী। রাতে বিদ্যুৎ চলে গেলে মোমবাতি জ্বালিয়ে থাকতে হয় বলে জানান তিনি।
লক্ষ্মীপুরের ছয় উপজেলায়ও গত দুই-তিন মাস ধরে লোডশেডিং বেড়েছে। লক্ষ্মীপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির মহাব্যবস্থাপক শফিউল আলমের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, চাহিদার তুলনায় সেখানে প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ কম বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে।
পাবনার বেড়াতেও একই সংকট। সেখানে দিনে প্রায় ৯ মেগাওয়াট এবং রাতে ১২ থেকে ১৩ মেগাওয়াট বিদ্যুতের চাহিদা রয়েছে। এর বিপরীতে দিনে ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ এবং রাতে ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ ঘাটতি থাকছে বলে জানিয়েছেন পাবনা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২-এর বেড়া জোনাল কার্যালয়ের ডিজিএম উত্তম কুমার সাহা।
সংকটের পেছনে জ্বালানি
বিদ্যুতের এই ঘাটতির পেছনে বড় কারণ হিসেবে উঠে আসছে জ্বালানি সংকট। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) ও বিদ্যুৎ সঞ্চালন কোম্পানি পাওয়ার গ্রিড পিএলসির (পিজিসিবি) তথ্য অনুযায়ী, জ্বালানির অভাবে চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যাচ্ছে না। ফলে সাপ্তাহিক ছুটির দিনেও লোডশেডিং কমছে না। গত শনিবার সর্বোচ্চ লোডশেডিং ছিল বেলা তিনটায়—৩ হাজার ৬১২ মেগাওয়াট। আগের দিন শুক্রবার সর্বোচ্চ লোডশেডিং ছিল রাত ১২টায়, ৩ হাজার ২৪৪ মেগাওয়াট।
দেশের সবচেয়ে বড় বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থা পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের তথ্য বলছে, শুক্রবার তাদের সর্বোচ্চ লোডশেডিং ছিল ২ হাজার ৬৭৩ মেগাওয়াট। ওই সময় ময়মনসিংহ অঞ্চলে বিদ্যুৎ ঘাটতি ছিল ৪৬ শতাংশ।
হাসপাতালের বিদ্যুৎ–সংকট কি শুধু অস্বস্তি?
লোডশেডিং সাধারণ মানুষের কাছে হয়তো কিছু সময়ের অস্বস্তি। কিন্তু হাসপাতালের ক্ষেত্রে বিষয়টি সম্পূর্ণ ভিন্ন। একটি পাখা বন্ধ হওয়া মানে গরমে রোগীর কষ্ট বাড়া; নেবুলাইজার বন্ধ হওয়া মানে শ্বাসকষ্টের শিশুর চিকিৎসা ব্যাহত হওয়া; এক্স-রে মেশিন বন্ধ হওয়া মানে রোগ নির্ণয় পিছিয়ে যাওয়া। আর অস্ত্রোপচারের মাঝখানে বিদ্যুৎ চলে যাওয়া তৈরি করতে পারে আরও বড় ঝুঁকি।
বিশেষ করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে, যেখানে সীমিত সামর্থ্যের মধ্যে সাধারণ মানুষের চিকিৎসার বড় একটি অংশ নির্ভর করে, সেখানে বিদ্যুৎ–সংকট দ্রুত সমাধান করা জরুরি। কারণ হাসপাতালের দরজায় এসে একজন রোগী শুধু বিদ্যুতের অপেক্ষায় থাকতে চান না। তিনি চান সময়মতো চিকিৎসা, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা এবং নিরাপদ সেবা। বিদ্যুৎ–সংকট যখন সেই মৌলিক চিকিৎসাসেবার পথেই বাধা হয়ে দাঁড়ায়, তখন সেটি আর শুধু লোডশেডিংয়ের সমস্যা থাকে না—তা হয়ে ওঠে জনস্বাস্থ্যের সংকট।



