শিশুকে কত বয়সে ও কীভাবে কৃমির ওষুধ খাওয়াবেন?

শিশুর পেটের নানা সমস্যার পেছনে কৃমির সংক্রমণও একটি কারণ হতে পারে। ক্ষুধামন্দা, পেটব্যথা, ওজন কমে যাওয়া কিংবা মলদ্বারে চুলকানির মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। আবার অনেক শিশুর ক্ষেত্রে কৃমি থাকলেও স্পষ্ট কোনো উপসর্গ দেখা যায় না। তাই শুধু লক্ষণ দেখেই কৃমির সংক্রমণ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া সব সময় সম্ভব নয়।

পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখার পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় নিয়মিত কৃমিনাশক কর্মসূচি সংক্রমণের চাপ কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও কৃমির প্রকোপ বেশি এমন এলাকায় শিশুদের জন্য নির্দিষ্ট সময় পরপর কৃমিনাশক দেওয়ার পরামর্শ দেয়।
শিশুর শরীরে কৃমি থাকলে কী লক্ষণ দেখা দিতে পারে?
সব শিশুর উপসর্গ এক রকম হয় না। তবে নিচের সমস্যাগুলো দেখা দিতে পারে—
১। খাবারের প্রতি আগ্রহ কমে যাওয়া
২। বমি বমি ভাব বা বমি
৩। পেটে ব্যথা কিংবা অস্বস্তি
৪। ওজন কমে যাওয়া
৫। ডায়রিয়া
৬। অস্বাভাবিক খিটখিটে মেজাজ
৭। রাতে মলদ্বারে চুলকানি এবং এর কারণে ঘুমের ব্যাঘাত
৮। কিছু ক্ষেত্রে কাশি বা অন্যান্য শারীরিক উপসর্গ
৯। গুরুতর সংক্রমণে অন্ত্রে ক্ষত, রক্তপাত বা রক্তশূন্যতা হতে পারে
তবে এসব লক্ষণ অন্য অনেক রোগেও হতে পারে। তাই দীর্ঘদিন সমস্যা থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই নিরাপদ।
কৃমি সংক্রমণ ছড়ায় কীভাবে?

কৃমির ডিম সাধারণত আক্রান্ত ব্যক্তির মলের মাধ্যমে পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ে। অপরিষ্কার হাত, দূষিত পানি, অপর্যাপ্ত স্যানিটেশন কিংবা মাটি থেকে সেগুলো শরীরে প্রবেশ করতে পারে। খালি পায়ে হাঁটার অভ্যাসও কিছু ধরনের কৃমির সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ায়।
তাই শিশুকে শুধু ওষুধ খাওয়ালেই হবে না; পুনরায় সংক্রমণ ঠেকাতে স্বাস্থ্যবিধিও মেনে চলতে হবে।
শিশুকে কৃমিমুক্ত রাখতে যা করবেন
শিশুর নখ নিয়মিত কেটে ছোট রাখুন।
খাবারের আগে এবং টয়লেট ব্যবহারের পর সাবান দিয়ে হাত ধোয়ার অভ্যাস করান।
বিশুদ্ধ পানি পান করান।
খাবার ভালোভাবে পরিষ্কার ও নিরাপদভাবে পরিবেশন করুন।
শিশুকে খালি পায়ে হাঁটা থেকে বিরত রাখুন, বিশেষ করে মাটি বা অপরিষ্কার জায়গায়।
ঘর ও আশপাশের পরিবেশ পরিষ্কার রাখুন।
টয়লেট ব্যবহারের পর পরিচ্ছন্নতার বিষয়ে শিশুকে ছোটবেলা থেকেই সচেতন করুন।
কৃমির ওষুধ কত বয়সে দেওয়া যায়?
কৃমির ওষুধের ধরন ও শিশুর বয়স অনুযায়ী ডোজ আলাদা হতে পারে। WHO-এর বর্তমান নির্দেশনায় মাটি থেকে ছড়ানো কৃমির সংক্রমণের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় ১২–২৩ মাস বয়সী শিশুদেরও নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে কৃমিনাশক দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। এই বয়সে অ্যালবেনডাজলের সাধারণত অর্ধেক ডোজ ব্যবহার করা হয়। দুই বছর বা তার বেশি বয়সে অ্যালবেনডাজল ৪০০ মিলিগ্রাম এক ডোজ অথবা মেবেনডাজল ৫০০ মিলিগ্রাম এক ডোজ ব্যবহারের সুপারিশ রয়েছে।
তবে শিশুর ক্ষেত্রে নিজের সিদ্ধান্তে বারবার ওষুধ না দিয়ে স্থানীয় চিকিৎসকের পরামর্শ এবং সরকারি কৃমিনাশক কর্মসূচির নির্দেশনা অনুসরণ করা ভালো। বিশেষ করে এক বছরের কম বয়সী শিশুকে কৃমির ওষুধ দেওয়ার আগে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ প্রয়োজন।
কতদিন পরপর কৃমির ওষুধ?
সবার জন্য তিন বা চার মাস পরপর কৃমির ওষুধ খাওয়ানোর নিয়ম এক নয়। WHO-এর মতে, কোনো এলাকায় কৃমির সংক্রমণের প্রকোপ ২০ শতাংশের বেশি হলে ঝুঁকিপূর্ণ শিশুদের বছরে একবার কৃমিনাশক দেওয়া যেতে পারে; প্রকোপ ৫০ শতাংশের বেশি হলে বছরে দুবার দেওয়ার সুপারিশ রয়েছে।
অর্থাৎ শিশুর বয়স, এলাকার সংক্রমণের মাত্রা এবং স্থানীয় স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের কর্মসূচি বিবেচনা করে সময় নির্ধারণ করা উচিত।

খালি পেটে নাকি খাবারের পর?
কৃমির ওষুধের ক্ষেত্রে খাবারের সঙ্গে খেতে হবে কি না, তা ওষুধের ধরন ও চিকিৎসকের নির্দেশনার ওপর নির্ভর করতে পারে। তাই ওষুধের প্যাকেটের নির্দেশনা বা চিকিৎসকের পরামর্শ অনুসরণ করাই সবচেয়ে নিরাপদ।
শুধু কৃমি হয়েছে মনে হলেই নিজের মতো করে একাধিক ওষুধ বা বারবার ডোজ দেওয়া উচিত নয়।
গর্ভাবস্থায় কী হবে?
গর্ভাবস্থায় কৃমির ওষুধ ব্যবহারের নিয়ম আলাদা। WHO নির্দিষ্ট উচ্চ-ঝুঁকির পরিস্থিতিতে প্রথম তিন মাস পার হওয়ার পর অ্যালবেনডাজল বা মেবেনডাজল ব্যবহারের সুপারিশ করে। তাই গর্ভবতী নারী, গর্ভধারণের পরিকল্পনা করছেন এমন ব্যক্তি কিংবা বিশেষ কোনো শারীরিক সমস্যা রয়েছে—এমন ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কৃমির ওষুধ খাওয়া উচিত নয়।
কিছু প্রচলিত ভুল ধারণা
কৃমির ওষুধ নিয়ে মানুষের মধ্যে বেশ কিছু প্রচলিত ধারণা রয়েছে। যেমন, মিষ্টি বা চিনি খেলেই কৃমি হয়—এমন ধারণার বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। আবার গরমকাল বা নির্দিষ্ট কোনো ঋতুতে কৃমির ওষুধ খাওয়া যাবে না—এমন সাধারণ নিয়মও নেই।
কৃমি প্রতিরোধে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো নিরাপদ পানি ও খাবার, পরিচ্ছন্নতা, নিয়মিত হাত ধোয়া এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সঠিক কৃমিনাশক গ্রহণ।
ওষুধের পাশাপাশি সচেতনতাও জরুরি
শিশুকে কৃমির ওষুধ খাওয়ানোর পাশাপাশি তাকে স্বাস্থ্যকর অভ্যাস শেখানো জরুরি। কারণ ওষুধে বিদ্যমান সংক্রমণের পরিমাণ কমলেও অপরিষ্কার পরিবেশ, দূষিত পানি বা অপরিচ্ছন্নতার কারণে আবার সংক্রমণ হতে পারে। WHO-ও নিয়মিত চিকিৎসার পাশাপাশি স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যবিধির ওপর গুরুত্ব দেয়।
তাই শিশুর বয়স ও শারীরিক অবস্থার কথা বিবেচনা করে সঠিক সময়ে কৃমিনাশক দেওয়া এবং একই সঙ্গে পরিচ্ছন্নতার অভ্যাস গড়ে তোলাই হতে পারে কৃমি সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের সবচেয়ে কার্যকর উপায়।



