জলাতঙ্ক থেকে অলৌকিকভাবে সেরে উঠল ১৫ বছর বয়সী কিশোর, আসলেই সম্ভব?

জলাতঙ্কের লক্ষণ থাকার পরও ১৫ বছর বয়সী এক কিশোরের সুস্থ হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এটিকে অত্যন্ত বিরল এক ঘটনা বলেই বিবেচনা করা হচ্ছে। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
এতে বলা হয়েছে, ভারতের উত্তর প্রদেশের মির্জাপুরে করন নামের এক কিশোর জলাতঙ্কের লক্ষণ দেখা দেওয়ার পরও সুস্থ হয়ে উঠেছে।
বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের মতে, লক্ষণ দেখা দেওয়ার পর জলাতঙ্ক রোগী সম্পূর্ণ সুস্থ হওয়া অত্যন্ত বিরল ও ব্যতিক্রমী ঘটনা। তবে এটি একেবারে অসম্ভব নয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও উল্লেখ করেছে যে, চিকিৎসা বিজ্ঞানের ইতিহাসে হাতে গোনা কয়েকজন মাত্র লক্ষণ প্রকাশের পর জলাতঙ্ক থেকে অলৌকিকভাবে বেঁচে ফিরেছেন।
ভারতের শারদাকেয়ার-হেলথসিটির ইন্টারনাল মেডিসিনের বিশেষজ্ঞ ডক্টর চিরাগ ট্যান্ডন এনডিটিভিকে বলেন, ‘এই ধরনের ব্যতিক্রমী ঘটনাকে চিকিৎসা বিজ্ঞানের সার্বিক নিয়মের পরিবর্তন হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। এটি মোটেও প্রমাণ করে না যে, জলাতঙ্কের লক্ষণ দেখা দেওয়ার পর এটি আর প্রাণঘাতী নয় বা চিকিৎসায় পুরোপুরি নিরাময়যোগ্য।’
এনডিটিভির প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে কুকুর কামড়ানোর পর করণ দুটি ভ্যাকসিন নিয়েছিল। পরবর্তী সময়ে ২০২৬ সালের মার্চে তার মধ্যে জলাতঙ্কের চূড়ান্ত লক্ষণ দেখা দেয়। তাকে বারাণসীর একটি সরকারি হাসপাতালে ২২ দিন ভর্তি রেখে বিশেষ প্রটোকলে চিকিৎসা ও সাতটি ইনজেকশন দেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে সে ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে ওঠে।
তবে চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এমন ঘটনা চূড়ান্তভাবে গ্রহণ করার আগে বিস্তারিত গবেষণাগার পরীক্ষা ও মেডিকেল রেকর্ড যাচাই করা প্রয়োজন।
প্রথমত, ল্যাবরেটরি কনফার্মেশন। লক্ষণগুলো আসলেই র্যাবিস ভাইরাসের কারণে হয়েছিল কি না, নাকি অন্য কোনো তীব্র স্নায়বিক জটিলতা ছিল—তা অ্যান্টিবডি ও রক্তের পরীক্ষার মাধ্যমে শতভাগ নিশ্চিত করা দরকার।
দ্বিতীয়ত, টিকার প্রভাব। ছেলেটি আগেই দুটি টিকা পেয়েছিল। ফলে তার শরীরে কোনো প্রতিরোধ ক্ষমতা বা অ্যান্টিবডি তৈরি হয়েছিল কি না, তাও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
এর আগে ২০০৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রে জিয়ানা গিজ নামের ১৫ বছর বয়সী এক তরুণী জলাতঙ্কের লক্ষণ প্রকাশের পরও চিকিৎসায় সুস্থ হয়ে উঠেছিল। সে সময় চিকিৎসকেরা তাকে কৃত্রিম কোমায় (চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে চেতনানাশক ও সিডেটিভ ওষুধ প্রয়োগ করে রোগীকে ইচ্ছাকৃতভাবে গভীর অচেতনে রাখা) পাঠিয়ে ব্রেন কভারিং ড্রাগ ও অ্যান্টিভাইরাল থেরাপি দেন, যা ‘মিলওয়াকি প্রোটোকল’ নামে পরিচিত। কিন্তু পরবর্তী সময়ে বিশ্বজুড়ে শত শত রোগীর ওপর এই প্রোটোকল প্রয়োগ করা হলেও তা নির্ভরযোগ্য চিকিৎসা পদ্ধতি হিসেবে প্রমাণিত হয়নি।
র্যাবিস ভাইরাস মূলত মানুষের কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্র বা মস্তিষ্কে আঘাত হানে। ভাইরাসটি কোনোভাবে স্নায়ু বেয়ে মস্তিষ্ক ও স্পাইনাল কর্ডে পৌঁছে প্রদাহ তৈরি করলে মস্তিষ্কের কোষগুলো চিরতরে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তখন ভেন্টিলেটর বা আইসিইউ দিয়ে লাইফ সাপোর্ট দেওয়া গেলেও রোগীকে আর বাঁচানো যায় না।
মির্জাপুরের এই ঘটনাটি কোনো নতুন চিকিৎসার বার্তা দেয় না, বরং প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার গুরুত্বকেই পুনর্ব্যক্ত করে।
যেকোনো সন্দেহভাজন প্রাণীর (কুকুর, বিড়াল, শিয়াল, বাদুড় ইত্যাদি) আঁচড় বা কামড় খাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আক্রান্ত স্থানটি অন্তত ১৫ মিনিট প্রবাহমান পানি ও সাবান দিয়ে ভালোভাবে ধুতে হবে।
ক্ষত যত ছোটই হোক, লক্ষণ প্রকাশের অপেক্ষা না করে দ্রুত নিকটস্থ হাসপাতালে গিয়ে র্যাবিস ভ্যাকসিন এবং ক্ষেত্রবিশেষে ‘র্যাবিস ইমিউনোগ্লোবুলিন’ (আরআইজি) ইনজেকশন নিতে হবে।
প্রসঙ্গত, র্যাবিস ইমিউনোগ্লোবুলিন হলো একটি জীবন রক্ষাকারী অ্যান্টিবডি ইনজেকশন, যা জলাতঙ্ক সংক্রমণের উচ্চ ঝুঁকি থাকলে টিকার পাশাপাশি তাৎক্ষণিকভাবে প্রয়োগ করা হয়।
মানবদেহে জলাতঙ্ক ছড়ানোর অন্যতম প্রধান উৎস কুকুর। তাই পথের কুকুর ও গৃহপালিত কুকুরকে নিয়মিত র্যাবিস টিকাদানের মাধ্যমেই কেবল এই মারণব্যাধি প্রতিহত করা সম্ভব।
ভারতীয় চিকিৎসকেরা বলছেন, মির্জাপুরের সুস্থ হওয়া কিশোরের ঘটনাটি ‘অলৌকিক ও ব্যতিক্রম’। লক্ষণ প্রকাশের পর জলাতঙ্ক এখনো বিশ্বের অন্যতম মারাত্মক ও অবধারিতভাবে প্রাণঘাতী একটি রোগ। তাই সচেতনতা ও টিকাই এই রোগ থেকে বাঁচার উপায়।
উল্লেখ্য, এই প্রতিবেদনের বিষয়বস্তু শুধুমাত্র সাধারণ তথ্য প্রদান করে। এটি কোনোভাবেই একজন চিকিৎসকের মতামতের বিকল্প নয়। আরও তথ্যের জন্য একজন বিশেষজ্ঞ বা আপনার পরিচিত চিকিৎসকের সঙ্গে পরামর্শ করুন।



