করাইলে শিশুদের জন্য আশার আলো ‘জোনাকি ঘর’

ঢাকার ঘনবসতিপূর্ণ করাইল এলাকায় শিশু ও নারীদের জন্য তৈরি হয়েছে ব্যতিক্রমী কমিউনিটি স্পেস ‘জোনাকি ঘর’। জায়গার তীব্র সংকটের কারণে যেখানে এক টুকরো খালি জমিও প্রায় নেই, সেখানে বিদ্যমান একটি বর্জ্যপানি শোধনাগারের ওপর এই স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছে। বাংলাদেশ, গ্রিস, ইতালি ও সুইজারল্যান্ডের স্থপতি ও শিল্পীদের সমন্বয়ে গঠিত ‘আড্ডা কালেকটিভ’ দুই বছরের কর্মশালা, আলোচনা ও শিশুদের আঁকা ছবি থেকে প্রকল্পটির পরিকল্পনা করে।

করাইলে গত এক দশকে একাধিক বড় অগ্নিকাণ্ডে শত শত ঘরবাড়ি, দোকানপাট ও মানুষের সম্পদ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এমন বাস্তবতায় কমিউনিটির জন্য একটি নিরাপদ ও উন্মুক্ত জায়গা তৈরির প্রয়োজনীয়তা দীর্ঘদিনের। কিন্তু নতুন করে জমি বের করার সুযোগ না থাকায় স্থপতিরা বিদ্যমান অবকাঠামোর ওপরই নতুন পরিসর তৈরির পরিকল্পনা করেন।
ইউনিসেফের সহায়তায় পরিচালিত একটি বর্জ্যপানি শোধনাগারের কংক্রিটের স্ল্যাবের ওপর চারটি স্টিলের পিলারের সাহায্যে দাঁড় করানো হয়েছে ‘জোনাকি ঘর’। নিচে শোধনাগারের কার্যক্রম চলবে, আর ওপরের জায়গাটি ব্যবহার করবে স্থানীয় শিশু ও কমিউনিটি।
দিনের বেলায় এখানে শিশু ও নারীদের জন্য কর্মশালা, শিক্ষামূলক কার্যক্রম ও বিভিন্ন সামাজিক আয়োজন করা যাবে। ভবিষ্যতে এটি পাঠাগার, প্রদর্শনীকেন্দ্র কিংবা আয়-উৎপাদনকারী জায়গা হিসেবেও ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে। খোলা ও প্রশস্ত নকশার কারণে করাইলের ঘিঞ্জি পরিবেশের মধ্যে এটি শিশুদের জন্য কিছুটা স্বস্তির জায়গা তৈরি করেছে।

এই স্থাপনার নকশায় শিশুদের অংশগ্রহণও ছিল গুরুত্বপূর্ণ। কর্মশালায় শিশুদের কাছে তাদের কাঙ্ক্ষিত করাইল সম্পর্কে জানতে চাওয়া হয়। তারা ছবি আঁকে, মডেল তৈরি করে এবং নিজেদের ভাবনা জানায়। সেসব ধারণা থেকেই ছাউনি, বসার জায়গা ও খেলাধুলার পরিসরসহ বিভিন্ন নকশার উপাদান তৈরি করা হয়। স্থপতি নিকলাউস গ্রাবারের মতে, এক অর্থে এই প্রকল্পের প্রকৃত স্থপতি শিশুরাই।
স্থাপনাটিতে কাঠ বা বাঁশের পরিবর্তে স্টিল ব্যবহার করা হয়েছে, যাতে এটি তুলনামূলকভাবে দীর্ঘস্থায়ী ও আগুন প্রতিরোধে বেশি সক্ষম হয়। ভবনের বাইরের আবরণে ব্যবহার করা হয়েছে স্থানীয়ভাবে তৈরি জুটিন প্যানেল, যা পাট ও রেজিন দিয়ে তৈরি। এগুলোকে স্বচ্ছ করে তৈরি করায় দিনের বেলায় সূর্যের আলো ভেতরে প্রবেশ করে এবং রাতে ভেতরের আলো বাইরে ছড়িয়ে পড়ে। ফলে দূর থেকে পুরো ভবনটিকে আলোকিত জোনাকির মতো দেখায়।

‘জোনাকি ঘর’ নামটিও এসেছে শিশুদের কাছ থেকেই। কর্মশালায় ভবনটির নাম নিয়ে আলোচনা হলে শিশুরা ‘জোনাকি ঘর’ নামটি পছন্দ করে। তাদের ভাবনা ছিল, তারাই হবে জোনাকি—জ্ঞান অর্জন করবে, তা অন্যদের সঙ্গে ভাগ করে নেবে এবং চারপাশে আলো ছড়াবে।
প্রকল্পটির সুইস স্থপতি নিকলাউস গ্রাবার আশা করছেন, একসময় এই স্থাপনাটি করাইলের মানুষের জন্য এতটাই প্রয়োজনীয় হয়ে উঠবে যে তারা নিজেরাই এটি ব্যবহার, রক্ষণাবেক্ষণ ও সুরক্ষার দায়িত্ব নেবে। তার মতে, একাধিকবার আগুন ও নানা সংকটের পর নিজেদের জীবন নতুন করে গড়ে তোলা করাইলের মানুষের জন্য এমন একটি জায়গা ভবিষ্যতে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ হয়ে উঠতে পারে।
সোর্স: টিবিএস



