১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ | সোমবারবাংলা: ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩
বিশ্লেষণ

গরুর মাংস খেলেই কি সত্যিই মন ভালো থাকে? গবেষণা কী বলছে?

Screenshot_44_original_1780494098

গরম ভাতের সঙ্গে এক বাটি গরুর মাংস—অনেকের কাছেই এটি শুধু পছন্দের খাবার নয়, বরং এক ধরনের স্বস্তি। মন খারাপের দিনে প্রিয় কোনো খাবার খেলে মনটা একটু ভালো লাগতেই পারে। আর এই অনুভূতিকে ঘিরেই সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে একটি গবেষণার তথ্য—গরুর মাংস খেলে নাকি বিষণ্নতা কমে!

দাবিটির পেছনে রয়েছে ব্রাজিলের ১৪ হাজার ২১৬ জন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের ওপর করা একটি গবেষণা। গবেষকেরা অংশগ্রহণকারীদের খাদ্যাভ্যাসের সঙ্গে বিষণ্নতার সম্পর্ক বিশ্লেষণ করেন। সেখানে দেখা যায়, যারা মাংস খেতেন না, তাদের মধ্যে বিষণ্নতার উপস্থিতি মাংস খাওয়া ব্যক্তিদের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ ছিল।

শুনতে চমকপ্রদ হলেও এখানেই একটু থামতে হবে। কারণ গবেষণাটি কিন্তু বলেনি, গরুর মাংস খেলেই বিষণ্নতা কমে যায়। বরং এতে খাদ্যাভ্যাস ও বিষণ্নতার মধ্যে একটি সম্পর্ক বা কোরিলেশন পাওয়া গেছে। অর্থাৎ দুটি বিষয় পাশাপাশি দেখা গেছে, কিন্তু একটির কারণে অন্যটি ঘটছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই।

গবেষণাটি ছিল ক্রস-সেকশনাল। একই সময়ে অংশগ্রহণকারীদের খাদ্যাভ্যাস ও মানসিক স্বাস্থ্যের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে। তাই মাংস না খাওয়ার কারণে কেউ বিষণ্নতায় ভুগছেন, নাকি বিষণ্নতার কারণে তাঁর খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন এসেছে, কিংবা দুটির পেছনেই অন্য কোনো শারীরিক, সামাজিক বা জীবনযাপনগত কারণ রয়েছে—তা এই গবেষণা থেকে নিশ্চিত হওয়া সম্ভব নয়। এ বিষয়ে আরও দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা প্রয়োজন।

গবেষণার অংশগ্রহণকারীদের সংখ্যার দিক থেকেও একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। ১৪ হাজারের বেশি মানুষের মধ্যে মাংস না খাওয়া ব্যক্তির সংখ্যা ছিল মাত্র ৮২ জন। ফলে এই ফলাফলকে সরাসরি সবার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য বলে ধরে নেওয়া ঠিক হবে না। তবে গরুর মাংস যে পুষ্টিকর, তা নিয়ে সন্দেহ নেই। এতে উচ্চমানের প্রোটিনের পাশাপাশি আয়রন, ভিটামিন বি১২ ও জিংকের মতো গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টি উপাদান রয়েছে। এসব উপাদান শরীরের স্বাভাবিক কার্যক্রম এবং স্নায়ুতন্ত্রের জন্য প্রয়োজনীয়। কিন্তু কোনো পুষ্টি উপাদান শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় হওয়া আর একটি খাবার বিষণ্নতার চিকিৎসা হিসেবে কাজ করা—দুটি এক বিষয় নয়।
বিষণ্নতা আসলে অনেক বেশি জটিল একটি মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা। জিনগত ও জৈবিক বিষয় থেকে শুরু করে দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ, সামাজিক পরিবেশ, ঘুম, জীবনযাপনসহ নানা কারণ এতে ভূমিকা রাখতে পারে। তাই একটি নির্দিষ্ট খাবারকে বিষণ্নতা কমানোর সমাধান হিসেবে দেখলে বিষয়টি অতি সরল করে দেখা হয়।

খাদ্যাভ্যাসের সঙ্গে মানসিক স্বাস্থ্যের সম্পর্ক নিয়ে আরও বড় পরিসরের গবেষণাতেও অবশ্য কিছু গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। ব্রাজিলের আরেকটি গবেষণায় ৪৬ হাজার ৭৮৫ জন প্রাপ্তবয়স্কের খাদ্যাভ্যাস বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, তুলনামূলক স্বাস্থ্যকর সামগ্রিক খাদ্যাভ্যাসের সঙ্গে বিষণ্নতার কম উপস্থিতির সম্পর্ক রয়েছে। অর্থাৎ আলোচনাটি শুধু গরুর মাংসকে ঘিরে নয়; বরং একজন মানুষ প্রতিদিন কীভাবে, কতটা বৈচিত্র্যপূর্ণ ও কতটা পুষ্টিকর খাবার খাচ্ছেন—সেটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

Advertisements

তাই খাবারের টেবিলে গরুর মাংস থাকতেই পারে। এক প্লেট ভাতের সঙ্গে পরিমিত মাংস, পাশে ডাল, শাকসবজি, সালাদ—এমন একটি সুষম খাবার শরীরের জন্যও ভালো হতে পারে। একই সঙ্গে পর্যাপ্ত ঘুম, নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম, প্রিয়জনের সঙ্গে সময় কাটানো এবং নিজের মানসিক অবস্থার যত্ন নেওয়াও গুরুত্বপূর্ণ। তবে খাবারের সঙ্গে মনের সম্পর্কের আরেকটি দিকও আছে। খাবার কেবল পুষ্টি দেয় না, অনেক সময় স্মৃতিও ফিরিয়ে আনে। মায়ের হাতের রান্না, ঈদের দুপুর, পরিবারের সবাইকে নিয়ে একই টেবিলে বসা কিংবা বৃষ্টির দিনে গরম ভাতের সঙ্গে পছন্দের মাংস—এসব অভিজ্ঞতা স্বাভাবিকভাবেই ভালো লাগার অনুভূতি তৈরি করতে পারে। কিন্তু সেই সাময়িক স্বস্তিকে বিষণ্নতার চিকিৎসা হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না।

যারা মাংস খান, তারা সুষম খাদ্যতালিকার অংশ হিসেবে পরিমিত গরুর মাংস খেতে পারেন। আবার যারা নিরামিষভোজী, তাদেরও শুধু এই একটি গবেষণার ফল শুনে খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন করার প্রয়োজন নেই। পরিকল্পিত ও সুষম নিরামিষ খাদ্য থেকেও প্রয়োজনীয় পুষ্টি পাওয়া সম্ভব। তবে ভিটামিন বি১২-এর মতো কিছু পুষ্টির ক্ষেত্রে খাবারের পরিকল্পনা এবং প্রয়োজন হলে সম্পূরকের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হয়। শেষ পর্যন্ত মন ভালো রাখার জন্য কোনো জাদুকরি খাবার নেই। একটি ভালো খাদ্যাভ্যাস, পর্যাপ্ত ঘুম, নিয়মিত শরীরচর্চা, সামাজিক ও পারিবারিক বন্ধন এবং প্রয়োজন হলে মানসিক স্বাস্থ্য পেশাজীবীর সহায়তা—সবকিছু মিলেই তৈরি হয় ভালো থাকার ভিত্তি।

আর তার মাঝখানে যদি কোনো এক বৃষ্টিভেজা দুপুরে গরম ভাতের সঙ্গে প্রিয় গরুর মাংস থাকে, সেটিকে উপভোগ করতেই পারেন। কারণ সেটি হয়তো বিষণ্নতার ওষুধ নয়, কিন্তু জীবনের ছোট ছোট আনন্দের একটি হতে পারে।

Advertisements