৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ | বুধবারবাংলা: ২৫ ভাদ্র ১৪৩৩
নারী

ভিনদেশে বাঁধনের ওপর হামলা: রাজনৈতিক মতভিন্নতা ও নারীর প্রতি সহিংসতা

badhon-s-1746355641

একটি সুস্থ ও গণতান্ত্রিক সমাজে রাজনৈতিক বা সামাজিক চিন্তাধারায় মতপার্থক্য থাকা খুবই স্বাভাবিক। গণতন্ত্রের সৌন্দর্যই হলো বহুমাত্রিক চিন্তার সহাবস্থান। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে, সাম্প্রতিক রাজনৈতিক সংস্কৃতির অন্যতম বড় সংকট হয়ে দাঁড়িয়েছে আদর্শিক বা রাজনৈতিক ভিন্নমতকে ব্যক্তিগত আক্রমণ, চরিত্রহনন ও সাইবার বুলিংয়ের মাধ্যমে দমন করার প্রবণতা। কোনো ব্যক্তি বা শিল্পী যখন কোনো নির্দিষ্ট সামাজিক বা রাজনৈতিক ইস্যুতে কোনো পক্ষ নেন বা নিজের স্বাধীন মত প্রকাশ করেন, তখন তাঁর ওপর ব্যক্তিগত পর্যায় থেকে আক্রমণ চালানো কোনো সচেতন রাজনৈতিক চর্চার অংশ হতে পারে না। বিশেষ করে সে ব্যক্তিটি যখন বিদেশের মাটিতে দেশের প্রতিনিধিত্ব করে তখন তাকে অসম্মান করা দেশকে অসম্মান করারই সামিল।

বিশেষ করে, আওয়ামী লীগের মতো একটি প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক দল, যার পেছনে দীর্ঘ সংগ্রাম, ঐতিহাসিক আন্দোলন এবং দেশের মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দেওয়ার ইতিহাস রয়েছে, সেই রাজনৈতিক আদর্শের সমর্থকদের কাছ থেকে সমাজ দায়িত্বশীল আচরণ প্রত্যাশা করে।

আওয়ামী লীগের সমর্থক বা অনুসারী দাবি করা এক শ্রেণীর নেটিজেন যখন সামাজিক মাধ্যমে এ ধরনের অসদাচরণে লিপ্ত হন, তখন তারা অজান্তেই দলটির ভাবমূর্তি ও রাজনৈতিক মর্যাদাকে ক্ষুণ্ণ করেন। কারণ, সাধারণ মানুষের চোখে একজন কর্মীর বা সমর্থকের রাজনৈতিক পরশ্রীকাতরতা ও অশালীন আচরণ পুরো দলের নীতি ও সংস্কৃতির ওপর দায় সৃষ্টি করে।

বিশেষত যে দলটি দীর্ঘ সময় সরকার পরিচালনা করেছে এবং দেশে নারী ক্ষমতায়নের অগ্রযাত্রাকে নিজেদের অন্যতম প্রধান অর্জন বলে দাবি করে, সেই আদর্শের অনুসারীদের কাছ থেকে একজন নারী শিল্পীর প্রতি এ ধরনের অশোভন আচরণ কোনোভাবেই সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। নারীর অধিকার ও মর্যাদা রক্ষা যেখানে সমাজের মৌলিক নীতি হওয়া উচিত, সেখানে রাজনৈতিক ভিন্নমতের কারণে কোনো নারীর বিরুদ্ধে অশালীন শব্দচয়ন বা চরিত্রহননের চেষ্টা দলের প্রগতিশীল চেতনার পরিপন্থী।

কোনো বড় ও ঐতিহাসিক দলের ভাবমূর্তি রক্ষার দায়িত্ব কেবল তার নেতৃত্বের নয়, এ দায়ীত্ব তার কর্মী ও সমর্থকদের উপরও বর্তায়। নীতিগত বিরোধ বা সরকারের সমালোচনার জবাব কখনো ব্যক্তিকেন্দ্রীক হিংসা বা কুৎসা দিয়ে হতে পারে না। তার জবাব দিতে হয় যুক্তি, তথ্য ও শালীন রাজনৈতিক আচরণের মাধ্যমে। ভিন্নমতকে শ্রদ্ধা করতে না পারলেও অত্যন্ত শালীনতার সাথে নিজের অবস্থান ধরে রাখাই রাজনৈতিক পরিপক্বতার লক্ষণ।

আজমেরী হক বাঁধনের ঘটনাকে একটি একক উদাহরণ হিসেবে দেখলে দেখা যায়, তাঁর রাজনৈতিক বা সামাজিক অবস্থান অনেকের পছন্দ নাও হতে পারে। তিনি কোনো বিষয়ে কী মতামত দিয়েছেন, তা নিয়ে সুশীল আলোচনা বা গঠনমূলক সমালোচনা হতে পারত। কিন্তু সমালোচনা যখন যুক্তি ছেড়ে ব্যক্তি আক্রমণ, নারীবিদ্বেষী মন্তব্য, অশ্লীল শব্দ প্রয়োগ কিংবা অনলাইনে সংগঠিত হেনস্থায় রূপ নেয়, তখন তা আর নীতিগত রাজনৈতিক চর্চা থাকে না।

Advertisements

বাঁধনের ওপর এই আক্রমণ বা কটূক্তির ঘটনাগুলো কেবল একজন ব্যক্তির ওপর আঘাত নয়; এটি আমাদের সমাজ ও সংস্কৃতিতে নারীদের স্বাধীন মত প্রকাশ এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার ক্ষেত্রে বিদ্যমান প্রতিবন্ধকতাগুলোকে নতুন করে সামনে এনে দেয়।

অনলাইন ট্রলিং থেকে মানসিক নিপীড়ন বাঁধনের ব্যক্তিজীবন, বিশেষ করে তাঁর ডিভোর্স ও একমাত্র কন্যাসন্তানের কাস্টডি বা অভিভাবকত্ব অর্জনের লড়াকু গল্প অনেক নারীর জন্য অনুপ্রেরণা হলেও, রক্ষণশীল দৃষ্টিভঙ্গির কাছে তা বারবার সমালোচনার পাত্র হয়েছে। পোশাকের স্বাধীনতা, সোজা সাপ্টা কথা বলা কিংবা নিজের ক্যারিয়ারের সিদ্ধান্ত সবকিছুতেই এক শ্রেণীর নেটিজেন তাঁকে লক্ষ্য করে বিষোদ্গার চালিয়েছে। একজন অভিনেত্রী যখন প্রচলিত সামাজিক ছকের বাইরে গিয়ে নিজের শক্ত অবস্থান তৈরি করতে চান, তখনই তাঁকে সাইবার বুলিং বা আক্রমণের মুখে পড়তে হয়।

তাই বাঁধনের ওপর এই আক্রমণ আমাদের দুটি স্পষ্ট বার্তা দেয়: প্রথমত, সমাজে নারীর প্রতি সহিষ্ণুতা ও নিরাপত্তাহীনতা এখনো চরম পর্যায়ে; এবং দ্বিতীয়ত, রাজনৈতিক ক্ষমতার অপব্যবহার করে সত্যকে চাপা দেওয়ার চেষ্টা কখনোই দীর্ঘস্থায়ী হয় না।

তবে বাঁধনের সবচেয়ে বড় শক্তির জায়গা হলো তিনি আক্রমণ বা সমালোচনার মুখে দমে যাননি। কন্যাসন্তানের অভিভাবকত্ব পাওয়ার আইনি লড়াই থেকে শুরু করে কান চলচ্চিত্র উৎসবে লাল গালিচায় পদচারণা, সবখানেই তিনি প্রমাণ করেছেন যে বাধা অতিক্রম করাই তাঁর স্বভাব। কান উৎসবের ইতিহাসে প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে তাঁর কাজের স্বীকৃতি কেবল তাঁর ব্যক্তিগত অর্জন ছিল না, তা ছিল প্রতিটি লড়াকু নারীর জয়।

বাঁধনের লড়াইটি কেবল একজন অভিনেত্রীর নয়; এটি সমাজের সেই সব নারীর লড়াই, যিনি প্রতিকূল পরিবেশেও নিজের সম্মান ও অধিকার ধরে রাখতে চান। আজমেরী হক বাঁধনের ওপর আক্রমণ বা হেনস্থার ঘটনা আমাদের ভাবিয়ে তোলে। একজন মুক্তচিন্তার, স্বাধীন ও সচেতন নারী হিসেবে তিনি কি কেবল তাঁর লিঙ্গ এবং স্পষ্টভাষী আচরণের কারণে আক্রমণের শিকার হয়েছেন? সমাজ হিসেবে আমরা কতটুকু পরমতসহিষ্ণু হতে পেরেছি? শিল্পীদের মত প্রকাশের স্বাধীনতা ও নিরাপত্ত নিশ্চিত করা এবং সাইবার পরিসরে নারী বিদ্বেষ বন্ধ করা এখন সময়ের দাবি। আজকের দিনে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে যে ধরনের কুৎসিত আক্রমণের সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে, তা কোনো সুস্থ রাজনৈতিক পরিবেশের জন্য শুভ নয়। ব্যক্তিভেদে মতের পার্থক্য থাকবেই, এটিই স্বাভাবিক। কিন্তু সেই ভিন্নমতের দরুন ব্যক্তিগত আক্রমণ বা হেনস্থা চালিয়ে কোনো বড় দলের সুনাম নষ্ট করা একেবারেই কাম্য নয়। একটি দায়িত্বশীল রাজনৈতিক দলের সমর্থকদের কাছ থেকে জনমানুষ বস্তুনিষ্ঠ সমালোচনা ও সংযত আচরণই প্রত্যাশা করে, যেন তা দলের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ঐতিহ্য ও মর্যাদার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ থাকে। নারীর প্রতি সহিংসতা রোধ, সাইবার পরিসরে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং রাজনৈতিক প্রতিশোধপরায়ণতা বন্ধ করাই এখন নতুন বাংলাদেশের মূল অগ্রাধিকার হওয়া উচিত।

রুদমিলা মাহবুব
শিক্ষক, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়

Advertisements