১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ | রবিবারবাংলা: ২৯ ভাদ্র ১৪৩৩
বিশ্লেষণ

পৃথিবীতে মহাবিপর্যয় নেমে এলে সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয় হবে কোন দেশ?

a-visually-stunning-representation-of-the-biospher-nhcuSXKOQeqjMIT-_UPL0w-7V3lxlLsTq6uuTJrnS8bdA_11zon

যদি হঠাৎ পৃথিবীর ওপর নেমে আসে ভয়াবহ কোনো মহামারি, শুরু হয় পারমাণবিক যুদ্ধ, আঘাত হানে বিশাল কোনো গ্রহাণু কিংবা বড় ধরনের প্রযুক্তিগত বিপর্যয়ে অচল হয়ে পড়ে আধুনিক সভ্যতা—তাহলে কোন দেশ তুলনামূলকভাবে ভালোভাবে টিকে থাকতে পারবে? এমন প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডকে বেশ সুবিধাজনক অবস্থানে রেখেছেন গবেষকেরা।

সম্প্রতি অস্ট্রেলিয়ার সংবাদমাধ্যম এবিসির এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এমন তথ্য। গবেষকদের মতে, ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতা, পর্যাপ্ত খাদ্য উৎপাদনের সক্ষমতা, জ্বালানি ও প্রাকৃতিক সম্পদের মজুত এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার কারণে বড় ধরনের বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলায় অস্ট্রেলিয়া অন্য অনেক দেশের চেয়ে এগিয়ে থাকতে পারে। একই কারণে নিউজিল্যান্ডের অবস্থানও তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী। তবে এর অর্থ এই নয় যে, পৃথিবীর কোনো একটি দেশই এমন বিপর্যয় থেকে পুরোপুরি নিরাপদ থাকবে। বরং বৈশ্বিক সংকটের ধরন, ব্যাপ্তি এবং স্থানীয় প্রস্তুতির ওপর নির্ভর করবে একটি দেশের টিকে থাকার সক্ষমতা।

গবেষণায় ‘বৈশ্বিক বিপর্যয়কর ঝুঁকি’ বলতে এমন ঘটনাকে বোঝানো হয়েছে, যা বিশ্বের অন্তত ১০ শতাংশ মানুষের জীবনকে হুমকির মুখে ফেলতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে ভয়াবহ মহামারি, ব্যাপক অবকাঠামো ধ্বংস, বৈশ্বিক জৈবিক হুমকি কিংবা এমন কোনো পরিস্থিতি, যার কারণে পৃথিবীতে সূর্যালোকের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যেতে পারে।

গবেষক ম্যাট বয়েড মনে করেন, এ ধরনের আশঙ্কা নিছক কল্পবিজ্ঞানের গল্প নয়। ইতিহাসই তার প্রমাণ। অতীতে বড় আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত পৃথিবীর জলবায়ু ও খাদ্য উৎপাদনে ভয়াবহ প্রভাব ফেলেছে। এর পরিণতিতে দুর্ভিক্ষের পাশাপাশি রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সাম্রাজ্যের পতনের ঘটনাও ঘটেছে। ভবিষ্যতে একই ধরনের ঘটনা আবার ঘটবে না—এমন নিশ্চয়তা নেই।

কোভিড-১৯ মহামারি হয়তো বৈশ্বিক বিপর্যয়কর ঝুঁকির সবচেয়ে চরম উদাহরণ নয়, কিন্তু এই মহামারি দেখিয়ে দিয়েছে আধুনিক বিশ্ব কতটা পরস্পরনির্ভরশীল। একটি ভাইরাস কীভাবে অল্প সময়ের মধ্যে স্বাস্থ্যব্যবস্থা, অর্থনীতি, যোগাযোগ ও মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রার ওপর ব্যাপক চাপ তৈরি করতে পারে, তার বাস্তব অভিজ্ঞতা পেয়েছে গোটা বিশ্ব। এই জায়গাতেই অস্ট্রেলিয়ার ভৌগোলিক অবস্থানকে বড় সুবিধা হিসেবে দেখছেন গবেষকেরা। বিশ্বের প্রধান জনবসতিগুলো থেকে অনেকটা বিচ্ছিন্ন হওয়ায় কোনো কোনো মহামারি বা সংঘাতের অভিঘাত দেশটিতে তুলনামূলক দেরিতে পৌঁছাতে পারে। ফলে সংকটের শুরুতেই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার কিছুটা বাড়তি সুযোগ মিলতে পারে।

শুধু ভৌগোলিক অবস্থান নয়, খাদ্য উৎপাদনের সক্ষমতাও অস্ট্রেলিয়াকে এগিয়ে রাখছে। বিশাল কৃষিজমি ও প্রাকৃতিক সম্পদের কারণে দীর্ঘমেয়াদি বৈশ্বিক সংকট দেখা দিলেও দেশটি উল্লেখযোগ্য পরিমাণ খাদ্য উৎপাদন চালিয়ে যেতে পারে। নিজস্ব জ্বালানি ও গুরুত্বপূর্ণ সম্পদের মজুতও সংকটের সময়ে বাইরের বিশ্বের ওপর নির্ভরতা কমাতে সহায়ক হতে পারে।

Advertisements

এর সঙ্গে রয়েছে রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক স্থিতিশীলতা। কোনো বড় সংকট দেখা দিলে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া, জরুরি ব্যবস্থা কার্যকর করা এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে স্থিতিশীল প্রতিষ্ঠান একটি দেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হয়ে উঠতে পারে। তবে অস্ট্রেলিয়ার ক্ষেত্রেও সব জায়গার ঝুঁকি এক নয়। বিশেষ করে সিডনি, মেলবোর্নের মতো বড় ও ঘনবসতিপূর্ণ শহরগুলো বৈশ্বিক বিপর্যয়ের সময় তুলনামূলক বেশি ঝুঁকিতে পড়তে পারে। কারণ আধুনিক শহরের জীবনযাত্রা পানি, বিদ্যুৎ, খাদ্য, যোগাযোগ ও পরিবহন—এমন অসংখ্য আন্তঃসংযুক্ত ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল।

এর যেকোনো একটি ব্যবস্থা বড় দুর্যোগে অচল হয়ে পড়লে তার প্রভাব দ্রুত অন্য ক্ষেত্রেও ছড়িয়ে যেতে পারে। যেমন, বড় কোনো আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত কিংবা পারমাণবিক বিস্ফোরণের ফলে বায়ুমণ্ডলে বিপুল পরিমাণ ছাই ও কণা ছড়িয়ে পড়লে সূর্যালোক কমে যেতে পারে। এতে কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হয়ে খাদ্যসংকট তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

আবার বড় ধরনের সাইবার হামলা হলে বিদ্যুৎ, পানি, যোগাযোগ কিংবা পরিবহনব্যবস্থা একসঙ্গে বিপর্যস্ত হতে পারে। নতুন কোনো সংক্রামক রোগের আবির্ভাব হলে ঘনবসতিপূর্ণ শহরগুলোতে মানুষের মধ্যে দ্রুত সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিও বেশি। তাই বিপর্যয়ের সময় একটি দেশের শক্তি শুধু তার অর্থনীতি, ভূগোল কিংবা সম্পদের ওপর নির্ভর করবে না। গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে স্থানীয় পর্যায়ের প্রস্তুতি এবং মানুষের পারস্পরিক সহযোগিতাও।

এর একটি উদাহরণ দেখা গেছে কোভিড-১৯ মহামারির সময়। সে সময় অস্ট্রেলিয়ার অনেক মানুষ বড় শহর ছেড়ে তুলনামূলক ছোট শহর ও আঞ্চলিক এলাকায় চলে গিয়েছিলেন। নিউ সাউথ ওয়েলসের দক্ষিণ উপকূলের বেগা ভ্যালি এমনই একটি অঞ্চল। প্রায় ৪০ হাজার মানুষের বসবাস এই এলাকায় ছড়িয়ে থাকা ছোট শহর ও গ্রামগুলোতে।

সেখানকার বাসিন্দা কেট সলিসের মতে, সংকটের সময় একটি এলাকার সবচেয়ে বড় শক্তি হতে পারে মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ক। একে অপরের পাশে দাঁড়ানো, প্রয়োজনের সময় সহযোগিতা করা এবং সামাজিক বন্ধন ধরে রাখার সক্ষমতা কোনো দুর্যোগের পর দ্রুত স্বাভাবিক জীবনে ফেরার পথ সহজ করতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের ধারণা, বিপর্যয়ের আগে কোনো কমিউনিটির সামাজিক সংহতি যত শক্তিশালী থাকে, বিপর্যয়ের পর ঘুরে দাঁড়ানোর সম্ভাবনাও তত বেশি। অর্থাৎ বৈশ্বিক কোনো মহাবিপর্যয়ের মুখে শেষ পর্যন্ত শুধু কোন দেশ কতটা শক্তিশালী, সেটিই বড় প্রশ্ন নয়; বরং সেই দেশের মানুষ কতটা প্রস্তুত, স্থানীয় সমাজ কতটা সংযুক্ত এবং সংকটের মুহূর্তে মানুষ কতটা একে অপরের পাশে দাঁড়াতে পারে—সেটিও হয়ে উঠতে পারে টিকে থাকার অন্যতম চাবিকাঠি।

Advertisements