১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ | সোমবারবাংলা: ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩
নারী

যে গ্রামের মেয়েরা ফুটবল দিয়ে বদলে দিচ্ছে পালিচড়ার পরিচয়

rangpur_footballers_09

রংপুর শহর থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরে ছোট্ট এক গ্রাম—পালিচড়া। একসময় দেশের মানচিত্রে আর দশটি গ্রামের মতোই ছিল এর অবস্থান। এখন সেই পরিচয় বদলে গেছে। গ্রামের মেয়েদের পায়ে ফুটবল উঠেছে, আর সেই ফুটবলই পালিচড়াকে পরিচিত করেছে দেশের গণ্ডি পেরিয়ে।

প্রায় দেড় দশক ধরে বয়সভিত্তিক বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় একের পর এক সাফল্য পাচ্ছে এই গ্রামের কিশোরী ও তরুণীরা। কেউ খেলছে জাতীয় দলে, কেউ ঢাকার বিভিন্ন ক্লাবে। কেউ আবার বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে চাকরি পেয়েছে ফুটবলের সুবাদে। ২০২২ সালের সাফ চ্যাম্পিয়ন হওয়া বাংলাদেশ নারী ফুটবল দলের সাফল্যের গল্পেও রয়েছে পালিচড়ার মেয়েদের নাম।

পালিচড়ার এই ফুটবলযাত্রা অবশ্য হঠাৎ করে তৈরি হয়নি। ২০১১ সালে জাতীয় পর্যায়ের প্রাথমিক বিদ্যালয় ফুটবল টুর্নামেন্টে পালিচড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মেয়েদের দল রানারআপ হয়। পরের বছরই আসে আরও বড় সাফল্য—জাতীয় পর্যায়ে চ্যাম্পিয়ন। সেই জয় যেন গ্রামটির মেয়েদের জন্য নতুন একটি দরজা খুলে দেয়।

এরপর ধীরে ধীরে ফুটবল হয়ে ওঠে পালিচড়ার মেয়েদের স্বপ্ন দেখার ভাষা। ২০১৬ সালে তাজিকিস্তানে অনুষ্ঠিত এএফসি অনূর্ধ্ব-১৪ প্রতিযোগিতায় ভারতের বিপক্ষে ৪-০ গোলের জয় নিয়ে বাংলাদেশ শিরোপা জেতে। সেই দলের তিন খেলোয়াড়—লাবনী আক্তার, আর্শিতা জাহান ও আঁখি আক্তার—ছিলেন পালিচড়ারই মেয়ে। ২০২২ সালে সাফজয়ী বাংলাদেশ নারী ফুটবল দলের হয়ে ১০ নম্বর জার্সি পরে মাঠে নামেন এই গ্রামের সিরাত জাহান।

এখন পর্যন্ত পালিচড়ার মাঠ থেকে বিভিন্ন বয়সভিত্তিক জাতীয় দলে খেলেছেন অন্তত ১০ জন ফুটবলার। বাংলাদেশ উইমেন্স প্রিমিয়ার লিগেও খেলেছেন গ্রামের মেয়েরা। আবার ১২ জন নারী খেলোয়াড় ফুটবল খেলার পথ ধরে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে চাকরিও পেয়েছেন।

একটি স্টেডিয়াম, অনেক স্বপ্ন

Advertisements

মেয়েদের ফুটবলের এই সাফল্যকে আরও এগিয়ে নিতে ২০২২ সালে পালিচড়া গ্রামে তৈরি করা হয় একটি স্টেডিয়াম। জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের উদ্যোগে প্রায় পৌনে ছয় কোটি টাকা ব্যয়ে দুটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মাঠের জায়গায় গড়ে ওঠে এটি। পালিচড়া এম এন উচ্চবিদ্যালয় ও মজিদা খাতুন কলেজের পাশে নির্মিত এই স্টেডিয়াম এখন রংপুরের প্রত্যন্ত এলাকার মেয়েদের ফুটবলচর্চার অন্যতম কেন্দ্র। মাঠে প্রতিদিনই আসে কিশোরীরা। কারও চোখে জাতীয় দলের স্বপ্ন, কারও স্বপ্ন ঢাকার কোনো বড় ক্লাবে খেলা।

বর্তমানে রংপুরের বিভিন্ন উপজেলা থেকে শতাধিক কিশোরী এখানে প্রশিক্ষণ নিচ্ছে। তাদের বয়স ৮ থেকে ২০ বছর। এর মধ্যে প্রায় ২৫ জন স্টেডিয়ামের ডরমিটরিতে থেকে নিয়মিত অনুশীলন করছে। কিন্তু স্বপ্নের এই মাঠটির বাস্তবতা খুব একটা স্বপ্নের মতো নয়।

সাফল্যের পাশে সংকট

স্টেডিয়ামে বিদ্যুৎ ও পানি সরবরাহের ব্যবস্থা থাকলেও নেই রান্নাঘর। থাকার জায়গা আছে প্রায় ৫০ জনের, অথচ বেড রয়েছে মাত্র ২০টি। সন্ধ্যার পর বিদ্যুৎ চলে গেলে পুরো স্টেডিয়াম অন্ধকার হয়ে যায়। বিকল্প আলোর ব্যবস্থাও নেই। দিনভর অনুশীলনের পর গরমের রাতে লোডশেডিংয়ে ঘুমানো কঠিন হয়ে পড়ে কিশোরীদের। অনুশীলন শেষে গোসলের পানিও সব সময় স্বস্তিদায়ক নয়। গরমে ট্যাংকের পানি অতিরিক্ত উত্তপ্ত হয়ে যায়, আবার শীতকালে নেই গরম পানির ব্যবস্থা।

সবচেয়ে বড় ঘাটতিগুলোর একটি হলো জিমনেসিয়াম ও উন্নত প্রশিক্ষণ সরঞ্জামের অভাব। পুষ্টিকর খাবারের নিশ্চয়তাও নেই। অথচ জাতীয় পর্যায়ের প্রতিযোগিতায় লড়াই করতে হলে কিশোরী খেলোয়াড়দের জন্য পুষ্টি, শারীরিক সক্ষমতা ও আধুনিক প্রশিক্ষণের গুরুত্ব অনেক। স্টেডিয়ামের জন্য নিয়মিত সরকারি বরাদ্দও নেই। ফলে গত দুই বছরে বিদ্যুৎ বিল বকেয়া পড়েছে প্রায় ৬৫ হাজার টাকা। এই পরিস্থিতিতেও থেমে নেই অনুশীলন।

নিজের ঘরের রান্নায় বেড়ে ওঠে ফুটবলার

পালিচড়ার মেয়েদের প্রশিক্ষক সাবেক ফুটবলার মিলন মিয়া। শুধু প্রশিক্ষণ দেওয়াই নয়, আবাসিক কিশোরীদের থাকার-খাওয়ার বিষয়টিও নিজের দায়িত্বে সামলাচ্ছেন তিনি।

স্টেডিয়ামে রান্নাঘর না থাকায় তাঁর বাড়িতেই রান্না হয় প্রশিক্ষণরত মেয়েদের খাবার। তাঁদের খাবারের জন্য সরকারি কোনো বরাদ্দ নেই। এমনকি প্রশিক্ষক মিলন মিয়াও কোনো সরকারি বেতন পান না। তারপরও মেয়েদের নিয়ে তাঁর স্বপ্ন বড়।

বর্তমানে পালিচড়া স্টেডিয়াম থেকে অন্তত ১৫ জন খেলোয়াড় ঢাকার বিভিন্ন ক্লাবে খেলছেন। আর্মি স্পোর্টস ক্লাবে রয়েছেন জয়নব বিবি, সুলতানা আক্তার, বৃষ্টি আখতার, নাসরিন বেগম ও কাকলি সরেন। আইএম ১০ এফসিতে খেলছেন শীলা আক্তার। ঢাকা ওয়ারিয়র্সে খেলছেন ইন্নিমা খানম ও হৈমন্তী শুক্লা খালকো। ক্লাব ফুটবলে খেলে তাঁরা মৌসুমে প্রায় এক থেকে দেড় লাখ টাকা সম্মানীও পান।
অর্থাৎ পালিচড়ার মাঠ শুধু খেলোয়াড় তৈরি করছে না, তৈরি করছে তাঁদের জীবনের নতুন সম্ভাবনাও।

পরপর দুই শিরোপায় পালিচড়ার আট মুখ

সাম্প্রতিক সময়েও পালিচড়ার মেয়েরা নিজেদের সামর্থ্যের প্রমাণ দিয়েছে। গত জুলাইয়ে নতুন কুঁড়ি স্পোর্টসের প্রথম আসরে মেয়েদের ফুটবলে চ্যাম্পিয়ন হয় রংপুর অঞ্চল। এর পর আগস্টে জাপান ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন বা জেএফএ অনূর্ধ্ব-১৪ ফুটবল টুর্নামেন্টেও শিরোপা জেতে রংপুর জেলার কিশোরীরা।
এই দুই শিরোপাজয়ী দলের প্রথম একাদশে থাকা আটজন খেলোয়াড়ই পালিচড়ার।

নতুন কুঁড়ি স্পোর্টসের মেয়েদের ফুটবলে ‘ফাইনাল-সেরা’ হয়েছে পালিচড়া স্টেডিয়ামে প্রশিক্ষণ নেওয়া স্মৃতি কিসকু। রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলার চক কৃষ্ণপুর গ্রামের এই কিশোরীর চোখেও বড় স্বপ্ন। তবে সেই স্বপ্ন পূরণ করতে হলে আগে দরকার ভালো পরিবেশ।

স্টেডিয়ামের সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথা বলতে গিয়ে সে বারবার একই কথাই জানিয়েছে—অনুশীলনের জন্য আরও ভালো ব্যবস্থা দরকার।

স্বপ্ন থামাতে চায় না পালিচড়া

রংপুরের সাবেক কৃতী ফুটবলার নিয়ামুল আতিকুর রহমান মনে করেন, পালিচড়ার মেয়েরা শুধু জাতীয় পর্যায়েই নয়, আন্তর্জাতিক পর্যায়েও দেশের জন্য সম্মান বয়ে এনেছে। প্রয়োজনীয় সহযোগিতা পেলে তারা আরও অনেক দূর যেতে পারবে।
প্রশিক্ষক মিলন মিয়ার চাওয়াটাও খুব বেশি নয়—খেলোয়াড়দের জন্য একটি জিমনেসিয়াম, পুষ্টিকর খাবার, উন্নত প্রশিক্ষণ সরঞ্জাম এবং ভালো মানের মাঠ।
স্টেডিয়ামের সমস্যাগুলো নিয়ে প্রায় এক মাস আগে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকেও জানানো হয়েছে। রংপুর সদরের ইউএনও লোকমান হোসেন জানিয়েছেন, সমস্যাগুলো তিনি জেনেছেন এবং সমাধানের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

পালিচড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নুরুল আমিনও চান, দেশের জন্য সুনাম বয়ে আনা এই মেয়েদের সুযোগ-সুবিধা আরও বাড়ুক। কারণ পালিচড়ার গল্পটা এখন আর শুধু একটি গ্রামের গল্প নয়। এটি এমন এক গ্রামের গল্প, যেখানে মেয়েদের পায়ে ফুটবল উঠলে বদলে যায় সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি, বদলে যায় ভবিষ্যতের স্বপ্ন।

একসময় যে গ্রামের পরিচয় ছিল স্রেফ রংপুরের একটি প্রত্যন্ত জনপদ হিসেবে, আজ সেই পালিচড়াকে মানুষ চেনে মেয়েদের ফুটবলের জন্য। মাঠের সংকট, আলো-বিদ্যুতের সমস্যা কিংবা পুষ্টির অভাব—কোনোটিই এখনো থামাতে পারেনি তাদের ছুটে চলা।

তবে এই মেয়েরা শুধু মাঠে জিততে চায় না। তারা চায়, তাদের জন্য তৈরি মাঠটিও যেন তাদের স্বপ্নের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগিয়ে যায়।

পালিচড়ার মেয়েদের গল্প তাই এখনো শেষ হয়নি। বরং প্রতিটি নতুন ম্যাচ, প্রতিটি নতুন শিরোপা আর প্রতিটি নতুন ফুটবলার জানান দিচ্ছে—এই ছোট্ট গ্রামের মাঠ থেকেই হয়তো বাংলাদেশের নারী ফুটবলের আরও অনেক বড় গল্প লেখা হবে।

Advertisements