বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনমঙ্গলবার, ২১ জুলাই, ২০২৬
জীবনযাপন

প্রতিদিন ৫ মিনিট নাচ, ভালো থাকবে শরীর ও মন

images – 2026-07-21T161624.718

ব্যস্ত কর্মজীবনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ডেস্কে বসে কাজ করা এখন অনেকেরই দৈনন্দিন রুটিন। দীর্ঘ সময় একটানা বসে থাকার কারণে শুধু শরীর নয়, মন ও মস্তিষ্কের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। ক্লান্তি, মনোযোগের ঘাটতি, মানসিক চাপ, এমনকি দীর্ঘমেয়াদে বিভিন্ন রোগের ঝুঁকিও বেড়ে যায়। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দিনের মাঝে মাত্র পাঁচ মিনিটের নাচ এই সমস্যাগুলোর অনেকটাই কমাতে পারে।

সাম্প্রতিক বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতিদিন মাত্র পাঁচ মিনিট নাচের অভ্যাস মনোযোগ বাড়ানো, স্মৃতিশক্তি উন্নত করা, মানসিক চাপ কমানো, সৃজনশীলতা বৃদ্ধি এবং দীর্ঘক্ষণ বসে থাকার ক্ষতিকর প্রভাব কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

শুধু বিনোদন নয়, কার্যকর ব্যায়ামও

অনেকেই নাচকে কেবল বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে দেখেন। কিন্তু গবেষকদের মতে, নাচ এমন একটি কার্যক্রম যেখানে শারীরিক ব্যায়াম, সঙ্গীত এবং মানসিক সক্রিয়তা একসঙ্গে কাজ করে। ফলে শরীরের পাশাপাশি মস্তিষ্কও সমানভাবে সক্রিয় থাকে।

এক গবেষণায় এক সাংবাদিক টানা এক সপ্তাহ প্রতিদিন কাজের ফাঁকে পাঁচ মিনিট করে নাচের অভ্যাস করেন। প্রথমদিকে কিছুটা অস্বস্তি লাগলেও কয়েক দিনের মধ্যেই তিনি নিজেকে অনেক বেশি প্রাণবন্ত, সতেজ ও কর্মক্ষম অনুভব করেন। বিশেষ করে দুপুরের ক্লান্তি কমে যাওয়ায় কাজে মনোযোগও বেড়ে যায়।

Advertisements

শরীর ও মস্তিষ্কের একসঙ্গে ব্যায়াম

নাচ-মনোবিজ্ঞানী এবং সাবেক পেশাদার নৃত্যশিল্পী পিটার লোভাট বলেন, মানুষের মস্তিষ্ক স্বাভাবিকভাবেই ছন্দ ও নড়াচড়ার প্রতি সাড়া দেয়। ছোটবেলায় সবাই স্বতঃস্ফূর্তভাবে নাচলেও বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অনেকেই এই অভ্যাস থেকে দূরে সরে যান। অথচ এটি মানুষের স্বাভাবিক প্রবৃত্তিরই একটি অংশ।

জার্মানির ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক ইনস্টিটিউট ফর এম্পিরিক্যাল এস্থেটিক্স-এর স্নায়ুবিজ্ঞানী ও সাবেক ব্যালে নৃত্যশিল্পী জুলিয়া ক্রিস্টেনসেন বলেন, নাচ এমন একটি কার্যক্রম যেখানে অ্যারোবিক ব্যায়াম, সামাজিক যোগাযোগ এবং সৃজনশীল প্রকাশ একসঙ্গে ঘটে। অন্য কোনো একক ব্যায়ামে এই তিনটি বিষয় একসঙ্গে পাওয়া খুবই বিরল।

বিশেষজ্ঞদের মতে, অন্যদের সঙ্গে নাচলে শরীরে এন্ডোরফিন ও ভালো অনুভূতি তৈরিতে সহায়ক বিভিন্ন হরমোন নিঃসৃত হয়, যা মানসিক সুস্থতা বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

মনোযোগ ও স্মৃতিশক্তি বাড়াতে কার্যকর

নাচের সময় শুধু শরীর নয়, মস্তিষ্কেরও একাধিক অংশ সক্রিয় থাকে। কোনো নির্দিষ্ট নাচের ধাপ মনে রাখা, সঠিক ক্রম অনুসরণ করা এবং সঙ্গীতের তালে তাল মিলিয়ে চলার কারণে মস্তিষ্কের জ্ঞানীয় কার্যক্রম আরও সক্রিয় হয়।

বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত নাচ স্মৃতিশক্তি উন্নত করতে সাহায্য করে। এমনকি বয়স্কদের ক্ষেত্রে এটি ডিমেনশিয়ার ঝুঁকি কমাতেও ভূমিকা রাখতে পারে বলে গবেষণায় ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।

মাত্র পাঁচ মিনিটেই বাড়তে পারে মনোযোগ

স্কুলপড়ুয়া শিশুদের ওপর পরিচালিত একটি গবেষণায় দেখা গেছে, মাত্র পাঁচ মিনিটের দলবদ্ধ নাচের পর তাদের পরবর্তী গণিত ক্লাসে মনোযোগের মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। শুধু তাই নয়, শিশুরা এই কার্যক্রমকে অন্যান্য ব্যায়ামের তুলনায় অনেক বেশি উপভোগ করেছে।

গ্রিসের অ্যারিস্টটল ইউনিভার্সিটি অব থেসালোনিকি-এর বায়োমেকানিক্স ল্যাবরেটরির সহকারী অধ্যাপক ভ্যাসিলিওস প্যানাউটসা কোপাউলোস বলেন, কাজের ফাঁকে অল্প সময়ের শারীরিক নড়াচড়া কর্মক্ষমতা ও মনোযোগ বাড়াতে সাহায্য করে। অন্যথায় দীর্ঘক্ষণ বসে থাকার কারণে শরীরে ধীরে ধীরে ক্লান্তি জমতে থাকে।

সৃজনশীল চিন্তা বাড়ায়

গবেষকদের মতে, নাচ শুধু শরীরচর্চাই নয়, এটি মানুষের সৃজনশীল চিন্তাভাবনাকেও উৎসাহিত করে। বিশেষ করে তাৎক্ষণিক বা স্বতঃস্ফূর্তভাবে নাচলে মস্তিষ্ক নতুনভাবে চিন্তা করতে শেখে এবং প্রচলিত ধ্যানধারণার বাইরে নতুন ধারণা তৈরি করতে সাহায্য করে।

জুলিয়া ক্রিস্টেনসেনের ভাষ্য, নাচের মাধ্যমে মস্তিষ্কের এমন কিছু অংশ সক্রিয় হয়, যা জটিল সমস্যার নতুন সমাধান খুঁজে পেতে সহায়ক হতে পারে। ফলে কর্মক্ষেত্রেও ইতিবাচক প্রভাব পড়ে।

মানসিক চাপ কমায়, ভালো রাখে মন

বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত নাচ বিষণ্নতা ও উদ্বেগ কমাতে, মানসিক চাপ হ্রাস করতে এবং সামগ্রিক জীবনযাত্রার মান উন্নত করতে সহায়ক। অনেক ক্ষেত্রে এটি অন্যান্য ব্যায়ামের তুলনায়ও বেশি ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, নাচ আত্মবিশ্বাস বাড়ায়, নিজের শরীর সম্পর্কে ইতিবাচক ধারণা তৈরি করে এবং সামাজিক যোগাযোগের সুযোগও বৃদ্ধি করে, যা মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

দীর্ঘক্ষণ বসে থাকার ক্ষতি কমাতে সহায়ক

সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, একটানা ৩০ মিনিটের বেশি সময় বসে থাকলে ক্যানসার, হৃদ্‌রোগ এবং অকাল মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়তে পারে। তবে মাঝেমধ্যে উঠে অল্প সময় হাঁটা, স্ট্রেচিং করা বা কয়েক মিনিট নাচের মতো কার্যক্রম করলে এই ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব।

এ ছাড়া নিয়মিত নাচ শরীরের ভারসাম্য উন্নত করে, পেশি শক্তিশালী করে এবং পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে। এ কারণেই পারকিনসনস রোগীদের পুনর্বাসন ও থেরাপিতেও নাচ ব্যবহার করা হয়।

একটি দীর্ঘমেয়াদি গবেষণায় দেখা গেছে, টানা ১৮ মাস নিয়মিত নাচের অভ্যাস শরীরের ভারসাম্য উন্নত করার পাশাপাশি স্মৃতিশক্তির সঙ্গে সম্পর্কিত মস্তিষ্কের হিপোক্যাম্পাস অংশেও ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে।

কীভাবে শুরু করবেন?

বিশেষজ্ঞদের মতে, শুরুতেই কঠিন কোনো নাচ শেখার প্রয়োজন নেই। নিজের পছন্দের একটি গান চালিয়ে ঘরে পাঁচ মিনিট নাচলেই যথেষ্ট। চাইলে ইউটিউব বা অন্যান্য অনলাইন প্ল্যাটফর্মের সহজ ড্যান্স রুটিন অনুসরণ করা যেতে পারে। পরে আগ্রহ বাড়লে গ্রুপ ড্যান্স, জুম্বা বা ড্যান্স ফিটনেস ক্লাসেও অংশ নেওয়া যেতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সুস্থ থাকতে সবসময় দীর্ঘ সময় জিমে কাটানো প্রয়োজন হয় না। প্রতিদিনের ব্যস্ততার মাঝেই মাত্র পাঁচ মিনিটের নাচ শরীর ও মনকে সতেজ রাখতে, কর্মক্ষমতা বাড়াতে, মানসিক চাপ কমাতে এবং দীর্ঘমেয়াদে সুস্থ জীবনযাপনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তাই প্রতিদিনের রুটিনে কয়েক মিনিটের এই ছোট্ট অভ্যাস যুক্ত করাই হতে পারে সুস্থ থাকার সহজ একটি উপায়।

Advertisements
অভ্যাসনাচবাড়ানব্যায়ামশরীরস্মৃতিশক্তি