১০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ | বৃহস্পতিবারবাংলা: ২৬ ভাদ্র ১৪৩৩
বিনোদন

আলো-সুর-স্মৃতির মেলবন্ধনে এক রবীন্দ্রমগ্ন সন্ধ্যা

WhatsApp Image 2025-12-03 at 8.09.53 PM

ঢাকার শেরাটন হোটেলের গ্র্যান্ড বলরুমটি সে সন্ধ্যায় যেন তার পরিচিত রূপ ভুলে গিয়েছিল। আলো-ছায়ার সৌম্য নকশা আর মৃদু গুঞ্জনের ভেতর তৈরি হয়েছিল এক অন্যরকম আবেশ—যেন শতাব্দী পেরিয়ে রবীন্দ্রনাথ নিজেই এসে দাঁড়িয়েছেন মানুষের অনুভবের ভেতর। সুইডেন দূতাবাস ও এইচএসবিসি বাংলাদেশের আয়োজনে অনুষ্ঠিত ‘আলোকের এই ঝর্‌না-ধারায়’ ছিল কেবল একটি অনুষ্ঠান নয়; তা হয়ে উঠেছিল স্মৃতি, সংগীত ও শিল্পের মিলিত এক মানসী-উৎসব।

রবীন্দ্রনাথকে আমরা প্রায়ই স্মৃতির গভীরতায় খুঁজে পাই। কিন্তু এই আয়োজন স্মরণ করিয়ে দিল—তিনি নস্টালজিয়ার বন্দি নন। তার কবিতা ও গান আমাদের জীবন, আমাদের সময়, আমাদের চিন্তার সঙ্গে স্পন্দিত হয়ে ওঠে বারবার। তার শব্দ শুধু উচ্চারণ নয়; তা আমাদের বেঁধে রাখে শেকড়ে, আবার খুলে দেয় নতুন সৃষ্টির দুয়ারও।

সন্ধ্যার তাপমাত্রা ঠিক রাখার দায়িত্বে ছিলেন সংস্কৃতিকর্মী ত্রপা মজুমদার। তার সাবলীল, কোমল অথচ দৃঢ় সঞ্চালনা অনুষ্ঠানকে কোনো আনুষ্ঠানিকতার খোলসে আটকে রাখেনি। বরং শিল্পকে তার স্বাভাবিক ছন্দে উন্মুক্ত করে দিয়েছিল।

মঞ্চে আলো পড়তেই অদিতি মহসিন যেন নিজের ভুবন খুলে দিলেন দর্শকের সামনে। ‘আনন্দধারা বহিছে ভুবনে’—এর প্রথম সুর নেমে আসতেই যেন পুরো হলঘর নিস্তব্ধ হয়ে গেল। এরপর ‘তুমি একটু কেবল বসতে দিও’—র শেষ গন্তব্যে পৌঁছাতে পৌঁছাতে শ্রোতাদের চাউনি আরও কোমল, আরও নিবিষ্ট হলো। অদিতির গানে স্মৃতি, শোক, বিস্ময় আর ভালোবাসা—সব মিলেমিশে তৈরি করল এক দার্শনিক অথচ ব্যক্তিগত অনুভব।

দর্শক তখন আর কেবল দর্শক নন—তাদের ঠোঁট নড়ে, কেউ গুনগুন করে, কেউ চোখ বুজে সময়ের অতলে হারিয়ে যায়। গ্র্যান্ড বলরুম যেন পরিণত হলো এক বিশাল, সুরভরা কোরাসে।

এরপর ডালিয়া আহমেদ। তার উচ্চারণে ছিল নির্মলতা, ধ্বনিতে ছিল আত্নস্থিরতার টান। রবীন্দ্রচিন্তার মানবিকতা আর গভীর সত্তা তার কণ্ঠে যেন নতুন করে জন্ম নিল। শব্দগুলো শুধু শোনা গেল না—দর্শককে ভাবতে, অনুভব করতে ও নিজস্ব এক নীরবতায় ডুব দিতে বাধ্য করল।

রাতের পরতে পরতে নেমে এল নৃত্যের মোহময় আলো—ওয়ার্দা রিহাব ও তার দলের পরিবেশনায় ‘আকাশ ভরা সূর্য তারা’ ও ‘আলোকের এই ঝর্‌না-ধারায়’। নৃত্যের ভঙ্গিমায় যেন রবীন্দ্রনাথের দর্শন শরীরী রূপ পেল; ছন্দ, মুদ্রা ও অনুরণনে তৈরি হলো এক ধ্যানমগ্ন সৌন্দর্য।

এইচএসবিসির প্রধান নির্বাহী মাহবুব উর রহমান বললেন রবীন্দ্রনাথের নৈতিক শক্তির কথা—যা আজকের জটিল সময়ে আরও প্রয়োজন।

সুইডেনের রাষ্ট্রদূত নিকোলাস উইকস স্মরণ করালেন রবীন্দ্রনাথের আন্তর্জাতিক আবেদন—যা দুই দেশের দীর্ঘ পাঁচ দশকের সাংস্কৃতিক বন্ধনকে আরও দৃঢ় করেছে।

শ্রোতারা যখন একসঙ্গে গলা মেলাচ্ছিলেন, মনে হচ্ছিলো—রবীন্দ্রনাথের গানগুলো যেন মঞ্চের দিক থেকে আসছে না; বরং সবার ভেতরের চেনা, নরম জায়গাগুলো থেকে উঠে আসছে।
কেউ স্মৃতিতে ডুব দিচ্ছেন, কেউ ভালোবাসায়, কেউ নীরব বিস্ময়ে।

শব্দ, সুর, নৃত্য—সব মিলিয়ে হৃদয়ের ভিতর এক কোমল আলো জ্বলে উঠল।
এক আলো, যা আশ্বস্ত করে। যা বলে—শিল্পের কাছে ফিরে এলে কখনো একা হতে হয় না।

Advertisements