যে নারী বদলে দিয়েছিলেন বুয়েটের নেতৃত্বের ইতিহাস

বাংলাদেশের প্রকৌশল শিক্ষার সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়—বুয়েট। জ্ঞান, গবেষণা ও প্রযুক্তির উৎকর্ষের এই প্রতিষ্ঠানটির দীর্ঘ ইতিহাসে উপাচার্যের পদটি ছিল মূলত পুরুষদের দখলে। সেই প্রচলিত চিত্রে প্রথম বড় পরিবর্তন আসে ২০১৪ সালে। ইতিহাসের সেই বাঁকবদলে নামটি হয়ে ওঠে—অধ্যাপক খালেদা একরাম।
যে বুয়েটে একজন স্থাপত্য শিক্ষার্থী হিসেবে তার পথচলা শুরু, জীবনের দীর্ঘ কর্মযাত্রা শেষে সেই প্রতিষ্ঠানেই তিনি অধিষ্ঠিত হন সর্বোচ্চ প্রশাসনিক পদে। শুধু একজন নারী হিসেবে নয়, বুয়েটের প্রথম নারী উপাচার্য হিসেবে তার এই অর্জন বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার ইতিহাসেও একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।
শিক্ষার্থী থেকে শিক্ষক
১৯৭৪ সালে বুয়েটের স্থাপত্য বিভাগ থেকে ব্যাচেলর অব আর্কিটেকচার ডিগ্রি অর্জন করেন খালেদা একরাম। এর পরের বছরই একই বিভাগে প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন তিনি। শিক্ষার্থী হিসেবে যে ক্যাম্পাসে তার স্বপ্নের শুরু, সেখানেই শুরু হয় শিক্ষকতার দীর্ঘ অধ্যায়।
সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষকতার পাশাপাশি গবেষণা ও একাডেমিক প্রশাসনেও নিজের দক্ষতার পরিচয় দেন খালেদা একরাম। ধীরে ধীরে বুয়েটের স্থাপত্য ও পরিকল্পনা শিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ একাডেমিক ব্যক্তিত্বে পরিণত হন তিনি।
উচ্চশিক্ষার তাগিদে পাড়ি জমান যুক্তরাষ্ট্রে। ইউনিভার্সিটি অব হাওয়াই থেকে নগর ও আঞ্চলিক পরিকল্পনায় স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। পরবর্তী সময়ে সুইডেনের লুন্ড ইউনিভার্সিটিতেও উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন। দেশে ফিরে আবারও বুয়েটের শিক্ষা ও গবেষণার জগতে সক্রিয় হন।
বুয়েটের স্থাপত্য বিভাগের বিভাগীয় প্রধান এবং স্থাপত্য ও পরিকল্পনা অনুষদের ডিনের দায়িত্বও পালন করেন তিনি। একাডেমিক দক্ষতা, প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা এবং দীর্ঘ শিক্ষকতার পথ পেরিয়ে শেষ পর্যন্ত তার সামনে খুলে যায় বুয়েটের সর্বোচ্চ নেতৃত্বের দরজা।
ইতিহাসের সেই সেপ্টেম্বর
২০১৪ সালের সেপ্টেম্বর। বুয়েটের ইতিহাসে যোগ হয় নতুন একটি অধ্যায়। অধ্যাপক খালেদা একরামকে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। এর মধ্য দিয়ে প্রথমবারের মতো কোনো নারী বুয়েটের সর্বোচ্চ প্রশাসনিক পদে আসীন হন।
১৩ সেপ্টেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন তিনি।
বাংলাদেশের প্রকৌশল ও প্রযুক্তি শিক্ষার অন্যতম প্রধান প্রতিষ্ঠান বুয়েটের নেতৃত্বে একজন নারীর আসীন হওয়া ছিল সময়ের বিচারে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, শিক্ষাক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ বাড়লেও তখনও দেশের শীর্ষ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর সর্বোচ্চ নেতৃত্বে নারীর উপস্থিতি ছিল সীমিত।
খালেদা একরামের এই নিয়োগ তাই কেবল একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক পরিবর্তন ছিল না; এটি ছিল নারীর নেতৃত্বের সক্ষমতা নিয়ে প্রচলিত ধারণাকে নতুন করে দেখার একটি উপলক্ষ।
শুধু ‘প্রথম নারী’ নন
খালেদা একরামের গল্পকে শুধু ‘বুয়েটের প্রথম নারী উপাচার্য’ পরিচয়ে আটকে রাখলে তার দীর্ঘ কর্মজীবনের বড় অংশই আড়ালে থেকে যায়।
একজন স্থপতি হিসেবে তার পেশাজীবনের শুরু। এরপর শিক্ষকতা, গবেষণা, উচ্চশিক্ষা এবং একাডেমিক প্রশাসনের বিভিন্ন স্তর পেরিয়ে তিনি বুয়েটের শীর্ষ নেতৃত্বে পৌঁছান। অর্থাৎ তার এই অবস্থান কোনো আকস্মিক অর্জন ছিল না; এর পেছনে ছিল কয়েক দশকের শিক্ষা, অভিজ্ঞতা ও পেশাগত পথচলা।
তার জীবনপথের সবচেয়ে শক্তিশালী দিকটিই হয়তো এখানে—যে প্রতিষ্ঠানের শ্রেণিকক্ষে তিনি একসময় শিক্ষার্থী ছিলেন, সময়ের পরিক্রমায় সেই প্রতিষ্ঠানেই তিনি হয়ে উঠেছিলেন সিদ্ধান্ত গ্রহণের অন্যতম কেন্দ্রীয় ব্যক্তি।
অসমাপ্ত মেয়াদ
চার বছরের জন্য উপাচার্যের দায়িত্ব পেলেও পুরো মেয়াদ শেষ করতে পারেননি খালেদা একরাম। ২০১৬ সালের ২৪ মে ব্যাংককে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান তিনি। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৬৫ বছর।
তার মৃত্যুতে বুয়েটসহ দেশের শিক্ষা, স্থাপত্য ও পরিকল্পনা অঙ্গনে শোকের ছায়া নেমে আসে। অল্প সময়ের মধ্যেই তার নেতৃত্বের অধ্যায় শেষ হলেও ইতিহাসে তার অবস্থানটি স্থায়ী হয়ে যায়।
যে দরজা তিনি খুলে দিয়েছিলেন
একটি প্রতিষ্ঠানের ইতিহাসে ‘প্রথম’ শব্দটি অনেক সময় শুধু একটি তথ্য নয়—এটি পরিবর্তনের সূচনা। খালেদা একরামের ক্ষেত্রেও বিষয়টি তেমনই।
বুয়েটের মতো একটি শীর্ষ প্রকৌশল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সর্বোচ্চ পদে তার পৌঁছে যাওয়া দেখিয়ে দিয়েছিল, নেতৃত্বের জায়গায় নারীর উপস্থিতি কেবল সম্ভাবনা নয়, বাস্তবতাও হতে পারে। তার আগে যে পদে কোনো নারী বসেননি, সেই জায়গায় তিনি নিজের যোগ্যতা ও দীর্ঘ একাডেমিক অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে দায়িত্ব নিয়েছিলেন।
তাই খালেদা একরামের উত্তরাধিকার শুধু একটি পদবির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তাঁর পথচলা বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষায় নারীর নেতৃত্বের ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
স্থাপত্যের শিক্ষার্থী থেকে শিক্ষক, গবেষক ও প্রশাসক—শেষ পর্যন্ত বুয়েটের প্রথম নারী উপাচার্য। খালেদা একরামের এই যাত্রা যেন একটি বার্তাই রেখে যায়—প্রতিষ্ঠানের দরজা সবসময় খোলা থাকে না; কখনো কখনো প্রথম কাউকেই সেই দরজা খুলে দিতে হয়।



