Skip to content

২৭শে সেপ্টেম্বর, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ | মঙ্গলবার | ১২ই আশ্বিন, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

স্কুলশিক্ষককে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ: আর কত এভাবে চলবে?

সমাজে ধর্ষণ মহামারী আকারে রূপ নিয়েছে। এটা পুরনো খবর। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর গাফিলতির কারণেই ধর্ষণের ঘটনা বেড়ে গেছে। কোনো নারীর সঙ্গে এসব অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটলে পুলিশ তখন নিজেদের অতি পবিত্র হিসেবে তুলে ধরতে চায়। এত পরিমাণে তদন্ত শুরু হয় যে, বিচারপ্রার্থীই হতাশ হয়ে পড়েন। ধর্ষণের অপরাধে দ্রুত বিচারের ব্যবস্থার দাবি জানিয়েছেন তারা। একইসঙ্গে তারা এও পরামর্শ দেন যে, নারীকে সম্মান করতে হবে। আইনের শাসন নিশ্চিত করতে হবে। ধর্ষককে পরিপূর্ণভাবে বয়কট করতে হবে। সমাজের কোথাও জায়গা দেওয়া যাবে না।

বেশ বছর যাবৎ নারীর প্রতি নির্যাতন বেড়ে গেছে বলে উল্লেখ করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের অধ্যাপক ড. রেবেকা সুলতানা। তিনি বলেন, ‘স্কুল, কলেজে যেখানে সভ্যতার ছোঁয়া থাকা দরকার, সেখানেই এমন অরাজক পরিস্থিতি মনকে বিক্ষিপ্ত করে তোলে। নারীদের সঙ্গে এই ধরনের ঘটনাগুলো খুবই অমানবিক, বিকৃত রুচির পরিচয়। শিশু থেকে শুরু করে বৃদ্ধ কোনো নারীই ছাড় পাচ্ছে না। এই ঘটনাগুলো যে ঘটছে, এর ফলে বলাই যায় সমাজে নৈতিক মূল্যবোধের অভাব, অনুশাসন মানার অনীহা, পুরুষ শাসনের অতিরিক্ত আধিপত্য কাজ করে।’

এই শিক্ষক আরও বলেন, ‘আমার যেটা মনে হয়, এগুলোই শুধু কারণ নয়। পারিপার্শ্বিক আরও কারণ আছে। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা না হওয়া, বিকৃত রুচি, অশিক্ষা, কুসংস্কার, ধর্মীয় অপব্যাখ্যাও এর জন্য দায়ী। আইনের দীর্ঘসূত্রিতা ধর্ষণের পেছনে বড় একটা কারণ। আইনের যদি সুষ্ঠু প্রয়োগ হতো তবে অনেকাংশে এসব অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা কমে আসতো। তাই আইনের শাসন জরুরি। আজকাল ধর্ষণ অনেকটা জাতীয় সমস্যায় রূপ নিয়েছে। তরুণদের মধ্যে স্মার্ট ফোনের অবাধ ব্যবহার। পর্ন সাইটগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণহীন থাকা সমাজে নেতিবাচক প্রভাব তৈরি করছে।’

ড. রেবেকা সুলতানা বলেন, ‘পাঠ্যপুস্তকে পরিবর্তন আনা জরুরি৷ নারীদের প্রতি শ্রদ্ধা-সম্মান গড়ে তুলতে হবে পরিবার থেকেই। সিস্টেমের সংকট দূর করতে হবে। পরিবারে, সমাজে, রাষ্ট্রে নারীকে গুরুত্ব দিতে হবে। নারীর যোগ্য মর্যাদা তাকে দিতে হবে। ধর্মীয় অসংলগ্ন ব্যাখ্যা দিয়ে শুধু পোশাককে ধর্ষণের জন্য দায়ী করে অপরাধীকে মুক্ত করার মানসিকতা পরিহার করতে হবে। শুধু পোশাক কখনোই ধর্ষণের জন্য দায়ী হতে পারে না। ইউরোপের অনেক দেশ এখন সভ্য৷ কিন্তু সেখানেও ধর্ষণের ঘটনা ঘটছে।’

ড. রেবেকা সুলতানা

যুক্তরাজ্য ভিত্তিক সংস্থা ওয়াল্ড পপুলেশন রিভিউ মতে, ২০২০ সালের পরিসংখ্যানে সুইজারল্যান্ডে প্রতি ১ লাখে ৭৭.৫ নারী ধর্ষণের শিকার হচ্ছে। সুইডেনে ৬৩.৫, অস্ট্রেলিয়া ২৮.৬, যুক্তরাষ্ট্রে ২৭.৩, ফ্রান্সে৷ ১৬.২, জার্মানে ৯.৪, নেদারল্যান্ডে ৯.২ নারী ধর্ষণের শিকার হচ্ছে। বাংলাদেশে এর হার ৯.৮২, ভারতে ১.৮, জাপানে ১.০, নেপালে ০.৮, মিশরে ০.১০। সবচেয়ে বেশি ধর্ষণের ঘটনা ঘটছে দক্ষিণ আফ্রিকায়। এই পরিসংখ্যান মতে, শুধু সভ্য জাতি হলেই ধর্ষণ কমিয়ে আনা সম্ভব নয়। ধর্ষণের মূল কারণ পুরুষতান্ত্রিক সমাজ। নারীদের দুর্বল ভাবা। ভোগের সামগ্রী ভাবা। এই হীন মানসিকতার পরিবর্তন করতে হবে।

আইনজীবী ও মানবাধিকার কর্মী দিলরুবা শারমিন বলেন, ‘স্কুলশিক্ষককে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ তো অনেক বড় বিষয়। স্কুল শিক্ষককে কোনো ধরনের কটূক্তি, কোনো ধরনের ট্রল, টোন বা অশালীন আচরণও তো কল্পনায় আসার কথা নয়। অথচ আমাদের সমাজব্যবস্থা এতটাই নীচু যে, শিক্ষকের সঙ্গেও এমন ঘটনা ঘটতে পারে। একদম শৈশবকালে এই ধর্ষণের ঘটনা শুনতাম। সাধারণত কলগার্ল, সেক্স ওয়ার্কার, স্ট্রিট সেক্স ওয়ার্কার, হতদরিদ্র নারী তুলে নিয়ে রেপ করা হতো তখন। অথচ এখণ একজন স্কুল শিক্ষকও রেহাই পান না। কতটা অসহিষ্ণু, অসভ্য, বর্বর, অমানবিক হলে এমন ঘটনা ঘটানো যেতে পারে?’

এই আইনজীবী বলেন, ‘শিক্ষককে আমরা সবসময় সমাজের দর্পণ বা প্রতিচ্ছবি মনে করি। সেখানে যতই বেতনবৈষম্য থাকুক বা আমাদের সিস্টেম যতই সম্মানিত করুক বা না করুক। কিন্তু আমরা অভিভাবক, শিক্ষার্থীদের কাছে শিক্ষক অতি সম্মানের। আদর্শের। সেই শিক্ষকের সঙ্গে যখন এ ধরনের ঘটনা ঘটে তখন বিস্মিত হতে হয়। দেশের পুলিশ- প্রশাসন, বিচার বিভাগ, সামাজিক শাসন, অবক্ষয়, রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণের কতটা বাইরে গেলে এমন ঘটনা ঘটে? কেন রাষ্ট্রের আইন-শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে নেই?’ তিনি আরও বলেন, ‘আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী সরকারের একটা পার্ট। রাজনৈতিক দলের একটা পার্ট। কিন্তু এসব বাহিনীর লোকেরা যখন নিজেদের হর্তাকর্তা ভেবে বসে তখনই শাসন প্রতিষ্ঠা হয় না। তারা ধরাকে সরা জ্ঞান করে। নিজেদের ক্ষমতা আর দাপটে সাধারণ নাগরিকদের রক্ষক ভাবতেই ভুলে যায় তারা। তখনই আইনের শাসনের প্রতি নজরদারি কম থাকে।’

দিলরুবা শরমিন

দিলরুবা শরমিন বলেন, ‘শুনে অবাক হওয়ার কথা, কোনো নারী, স্কুলশিক্ষক, কলেজশিক্ষক, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকের সঙ্গে এমন ঘটনা কিভাবে ঘটাতে পারে? বিকৃত রুচি, অমানবিকতার ফল এসব।’ তিনি আরও বলেন, ‘এসব বেড়ে যাওয়ার কারণ আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর গাফিলতি। কোনো নারীর সঙ্গে এসব অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটলে পুলিশ তখন নিজেদের অতি পবিত্র হিসেবে তুলে ধরতে চায়। এত পরিমাণে তদন্ত শুরু হয় যে বিচারপ্রার্থী হতাশ হয়ে পড়েন। চিকিৎসক পোস্ট মোর্টাম করতেও এতটা কাটা-ছেঁড়া করেন না। তারা বোঝাতে চান, তারা আইনের শাসন করতে চান। মিথ্যাকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দিতে চান না। সুতরাং এগুলো আমলে নিতে প্রচুর তদন্ত করতে হবে।’

সাধারণ মানুষের প্রতি অবজ্ঞা -অবহেলা করা আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির কারণ উল্লেখ করে দিলরুবা শরমিন বলেন, ‘আমরা কিভবে ঘরের বাইরে আসবো বলুন? অল্প বয়সে পছন্দসই পোশাক পরা যাবে না। মধ্যবয়সে নিজ ইচ্ছে মতো পোশাক, সাজগোজ করা যাবে না। আবার বার্ধক্যেও আরামদায়ক পোশাক পরিধান করা যাবে না। আসলে পুরুষতন্ত্র নারীদের বাইরে আসাকেই সঠিকভাবে নিতে পারে না। আজকাল নারীদের উন্নতিকে তারা মেনে নিতে পারে না। ফলে নারী যেভাবেই থাক, তার বিপক্ষে গিয়ে তাকে মানসিকভাবে জর্জরিত করাই এ শ্রেণির কাজ। সেই জন্য যারা বাইরে আসে, তাদের নেতিবাচক চোখে দেখাই তাদের কাজ। নারীর পোশাককেই দায়ী করে বেশিরভাগ। কিন্তু সাতপর্দা করেও কি নারীরা রক্ষা পেয়েছে?’

নারীরা ঘরে-বাইরে সব জায়গায় নিরাপত্তাহীন বলে উল্লেখ করে এই আইনজীবী আরও বলেন, ‘নির্যাতনের শিকার হলেও সবসময় প্রতিবাদ করতে পারছে না নারীরা। কারণ আইনের সঠিক বাস্তবায়ন নেই। সরকারকে আইনের বাস্তবায়ন করতে হবে। জবাবদিহিতা থাকতে হবে। শিক্ষা ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনতে হবে। ছোট থেকেই সন্তানদের নারীর প্রতি শ্রদ্ধা – সম্মান করতে শেখাতে হবে। পরিবারগুলোর নিজেদের সঠিকভাবে এর চর্চা করতে হবে। চলার অধিকার, বলার অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। ’ তিনি আরও বলেন, ‘রাতারাতি এ ধরনের সমস্যা কমিয়ে আনা সম্ভব নয়। তবে সমাজের সবক্ষেত্রে পরিবর্তন নিয়ে এলে ধীরে ধীরে এসব ঘটনা কমে আসবে। সবচেয়ে জরুরি আইনের কঠোর প্রয়োগ। অপরাধীকে কোনোভাবেই ছাড় দেওয়া চলবে না। সাধারণ নাগরিকদের নিরাপত্তায় পুলিশ-প্রশাসন, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে তৎপর থাকতে হবে। ’

আফরোজা ফেরদৌসী

ঢাকা জেলা জজ আদালতের আইনজীবী আফরোজা ফেরদৌসী বলেন, ‘যুগ পরিবর্তন হচ্ছে। দেশে নারীদের পদচারণা সব জায়গায়। আমাদের দেশে নারী শিক্ষার হার বাড়ছে নারীরা আজ কর্মজীবী। কিন্তু তাদের নিরাপত্তা নেই। নিরাপত্তা নেই কর্মস্থলে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে,নেই নিজ বাসস্থানেও। রাস্তা-ঘাটে মেয়েরা চলাফেরা করতে পারছে না। বখাটে ছেলেরা ইভটিজিং করছে,বিরক্ত করে শেষ পর্যন্ত ধর্ষণ করছে। গুম করেছে। হত্যা করছে। কর্মস্থলে কাজ করতে হয় ৭/৮ ঘণ্টা, সেখানেও যৌন হয়রানির শিকার হচ্ছে, ধর্ষণের শিকার হচ্ছে। প্রত্যেকটা জায়গায় নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে নারীরা।’ তিনি আরও বলেন, ‘একজন শিক্ষিকাও কি নির্যাতনের বাইরে আছেন? এসব বৈরী পরিস্থিতি থেকে নারীদের মুক্ত রাখা জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমাদের দেশে যেমন আইন আছে, তেমনি এর সঠিক ব্যবহার করা এবং আইনের প্রয়োগ করা একান্ত প্রয়োজন। যদি অপরাধীদের দ্রুত বিচার হয়, তাহলে অপরাধ বারবার ঘটবে না। আমরা নারীরাও স্বাভাবিক জীবনযাপন করার সুযোগ পাবো।’