Skip to content

৭ই মে, ২০২৪ খ্রিষ্টাব্দ | মঙ্গলবার | ২৪শে বৈশাখ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

বসন্তে রঙিন এক ভালোবাসার দিন

 

 

পৌষ আর মাঘের তীব্র শীতের রিক্ততা আর কুয়াশার ঘন চাদরে ঢাকা প্রকৃতিতে আবারো ফুটে উঠছে প্রাণের চাঞ্চল্য। ফুল ফুটছে ডালে ডালে। দিনের আলোর উষ্ণতার পরশে ডানা মেলেছে রঙিন প্রজাপতি। আবারো নতুন করে সাজতে শুরু করেছে প্রকৃতি। অলৌকিক স্পর্শে জেগে উঠছে কৃষ্ণচূড়া, রাধাচূড়া, নাগলিঙ্কন। দখিনা বাতাস আর নানা রঙের ফুলের সৌরভ জানান দিচ্ছে এসে গেছে ঋতুরাজ বসন্ত।

 

একদিকে থোকায় থোকায় রক্তরঙ্গা শিমুল আর আগুন লাগা পলাশের সমারোহ, আর অন্যদিকে কোকিলের কুহুতান। এক সাথে এতো রং, এতো বৈচিত্র্যময়তা অন্য কোনো ঋতুতে দেখা যায় না। তাই বাঙলার কবি-লেখকরা এই ঋতুকে বলছেন সৃজনশীলতার ঋতু। কী নেই তার! আছে রঙ, রূপ, রস, লাবণ্য। আছে মাতাল দখিনা সমীরণ। ঋতুরাজের আগমনে খুলে গেছে দখিনা দুয়ার। মানব-মানবীর চিরন্তন ভালোবাসা উড়ছে রঙিন প্রজাপতি হয়ে। ফুলে ফুলে আছে মৌমাছির গুঞ্জন। নতুন প্রাণের পত্রপল্লবে জেগে উঠছে বৃক্ষ-লতা-গুল্ম। নদীর কিনার থেকে আদিগিন্ত প্রান্তর, কুঞ্জবন, অরণ্য-পর্বতে ডেকেছে নবযৌবনের বান। প্রকৃতির এই রূপতরঙ্গ দেখেই কবিগুরু লিখেছিলেন- ‘ওরে ভাই, ফাগুন লেগেছে বনে বনে।’

 

বসন্তের আগমনে প্রকৃতির মতো মানুষের মনেও ছড়িয়ে পড়ে বসন্তের রঙ। তাকে বরণ করে নিতে তাই প্রকৃতির রঙে রঙ মিলিয়ে সবাই মেতে ওঠে উৎসবে। ‘ফুল ফুটুক-আর নাই বা  ফুটুক-আজ বসন্ত।’ বাঙালির প্রিয় কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় বসন্তকে প্রতিভাত করে গেছেন এই একটি বাক্যেই। পৌষ আর মাঘের শীতার্ত দিনগুলোর পর ফাল্গুন মাসের প্রথম দিনকে তাই ঘটা করেই বরণ করে বাঙালি। এ কারণেই ১লা ফাল্গুনে হয়ে উঠেছে বাঙালির জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। প্রকৃতির সাথে তাল মিলিয়ে তাই এই ঋতুকে বাসন্তি রঙের শাড়ি দিয়ে বরণ করবে তারা। 

 

বঙ্গাব্দের ক্যালেন্ডার সংশোধনের কারণে আজ ১৪ ফেব্রুয়ারি একসঙ্গে পালন করা হচ্ছে পহেলা ফাল্গুন আর বিশ্ব ভালোবাসা দিবস। একই দিনে দুই দিবসের আনন্দ ছুঁয়ে যাচ্ছে বাঙলার মানুষের প্রাণ। ঋতুরাজের প্রথম দিনেই ভালোবাসা দিবস। উৎসবপ্রিয় বাঙালির ঘর ছেড়ে বের হতে আর কী লাগে? নিসর্গবিবর্জিত মানুষের বসনে, ভূষণে এ দিন লাগবে বসন্তের ছোঁয়া। ভালোবাসার পরশে ঢেউ উঠবে হৃদয়সমুদ্রেও। বাঙালির জীবনে এটি তাই অন্য রকম উৎসবের একটি দিন। প্রকৃতিতে বসন্তের প্রকৃত ছোঁয়া পাওয়া যায় গ্রামের প্রান্তরে। নগরজীবনে প্রকৃতির ছোঁয়া কিছুটা দুর্লভ। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে করোনার সংক্রমণের ভয় আর সতর্কতা। এরপরও প্রকৃতির টানে, ভালোবাসার গানে ঘর ছেড়ে বের হচ্ছেন সাধারণ মানুষ। বাঙালি ললনার পরনে হলুদ রঙের শাড়িতে লাল পাড় আর তরুণ-যুবাদের হলুদ পাঞ্চাবি, কোর্তা গায়ে দিয়ে বসন্তের প্রথম দিনে জমজমাট হয়ে উঠেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসির চত্বর, শাহবাগ আর রমনার সবুজ প্রান্তর।

 

তারুণ্যের বিশুদ্ধ উচ্ছ্বাসে সারা বিশ্বের মতো আমাদের দেশের তরুণ-তরুণীদের মাঝেও পালিত হচ্ছে ভালোবাসা দিবস। বিশেষ এ দিনটিতে সব কিছুতেই প্রাধান্য পাচ্ছে ভালোবাসার মানুষটির পছন্দ। তাই প্রিয় মানুষটি প্রিয় রং বা প্রিয় পোশাকে নিজেকে সাজিয়ে উপস্থিত হচ্ছেন আরেকবার। তবে ভালোবাসার রঙ লাল বলে অনেক যুগলই নিজেদের সাজাচ্ছেন লাল রঙে।

 

আজ পুরো দিনজুড়েই প্রেমিকযুগলের পদচারণে মুখর থাকবে শহরের নানা পথ-প্রান্তর। দুজন-দুজনার হাত ধরে ঘুরবে এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত। কারণ আজ নিজেদের মতো করে হারিয়ে যাওয়ার দিন। একসঙ্গে খাওয়া-দাওয়া, ছবি-সেলফি তোলা চলবে। অনেক যুগল রিকশায় ঘুরবে। অনেকে আবার বিভিন্ন উদ্যানে-পার্কে গাছের ছায়ায় বসে মন খুলে কথা বলবে। অনেকে আবার ধানমণ্ডি, বনানী, গুলশান, উত্তরার ফাস্ট ফুড ও কফি শপগুলোতে জড়ো হবে। রাজধানীর শপিং মলের ফুডকোর্টে চলবে খাওয়া-দাওয়া। অনেকে আবার একসঙ্গে দেখবে সিনেমা।

 

এ উৎসবের ছোঁয়া লাগবে গ্রাম-বাংলার জনজীবনেও। মুঠোফোনের মেসেজ, ই-মেইল অথবা অনলাইনের চ্যাটিংয়ে পুঞ্জ পুঞ্জ প্রেমকথার কিশলয় হয়ে উঠবে পল্লবিত। এ দিনে চকোলেট, পারফিউম, গ্রিটিংস কার্ড, ই-মেইল, মুঠোফোনের এসএমএস-এমএমএসে প্রেমবার্তা, হীরার আংটি, প্রিয় পোশাক, জড়াজড়ি করা খেলনা মার্জার অথবা বই ইত্যাদি শৌখিন উপঢৌকন প্রিয়জনকে উপহার দেয়া হবে। নীল খামে হালকা লিপস্টিকের দাগ, একটা গোলাপ ফুল, চকোলেট, ক্যান্ডি, ছোট্ট চিরকুট আর তাতে দু`ছত্র গদ্য অথবা পদ্য হয়ে উঠবে উপহারের অনুষঙ্গ। এ ভালোবাসা শুধুই প্রেমিক আর প্রেমিকার জন্য নয়। মা-বাবা, স্বামী-স্ত্রী, ভাইবোন, প্রিয় সন্তান এমনকি বন্ধুর জন্যও ভালোবাসার জয়গানে আপ্লুত হতে পারে সবাই। চলবে উপহার দেয়া-নেয়া। খোঁপায় গাঁদা ফুল, পরনে বাসন্তী রংয়ের শাড়ি, নিজের হাত প্রিয়জনের মুঠোয় বন্দি করে সময় কাটাবে অনেকেই। 

 

প্রকৃতির মতোই বাঙালি জীবনের শিল্প-সাহিত্য, এমনকি রাজনীতিতেও বসন্ত খুবই তাৎপর্যময়। এ বসন্তেই ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বাঙালির স্বাধীনতার বীজ রোপিত হয়েছিল। মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের শুরুও এ বসন্তেই।  ফুলের মঞ্জরিতে মালা গাঁথার দিন বসন্ত শুধু প্রকৃতিকেই রঙিন করেনি, আবহমানকাল ধরে বাঙালি তরুণ-তরুণীর প্রাণও রঙিন করেছে।

 

এদিন সকাল থেকেই সবার মনের কোণে উঁকি দিচ্ছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সেই গান‘ফুলে ফুলে দুলে দুলে বহে কে বা মৃদু বায়ে/ কে জানে কিসের লাগি প্রাণ করে হায় হায়।’ কিংবা লতা মুঙ্গেশকরের সেই গান-‘পাখি আজ কোন সুরে গায়/ কোকিলের ঘুম ভেঙে যায়/ আজ কোনো কথা নয়/ শুধু গান/ আরো গান/ আজ বুঝি দু’জনের মন/ কতো সুরে করে আলাপন/ আজ কোনো কথা নয়/ শুধু গান আরো গান…।’
 

 

ডাউনলোড করুন অনন্যা অ্যাপ