নেতিবাচক চিন্তা যত কম, আয়ু কি তত বেশি?

জীবনকে কেউ দেখেন অর্ধেক ভরা গ্লাস হিসেবে, আবার কেউ একই গ্লাসের খালি অংশটুকুই বেশি দেখতে পান। পরিস্থিতি একই হলেও তাকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি মানুষের মানসিক অবস্থা, আচরণ ও দৈনন্দিন জীবনযাপনে বড় পার্থক্য তৈরি করতে পারে। আর এই পার্থক্য শুধু মন ভালো থাকা বা খারাপ থাকার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; দীর্ঘমেয়াদে শারীরিক স্বাস্থ্যের ওপরও এর প্রভাব পড়তে পারে। এমনকি একজন মানুষ কতটা দীর্ঘ জীবন পাবেন, তার সঙ্গেও আশাবাদী মানসিকতার একটি সম্পর্ক থাকতে পারে বলে বিভিন্ন গবেষণায় ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।

আশাবাদ বলতে সাধারণত ভবিষ্যৎ সম্পর্কে ইতিবাচক প্রত্যাশা রাখা এবং প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও ভালো কিছু ঘটার সম্ভাবনা দেখতে পারাকে বোঝায়। এর অর্থ এই নয় যে একজন মানুষ জীবনের সমস্যা বা বাস্তবতাকে অস্বীকার করবেন। বরং কঠিন পরিস্থিতি মেনে নিয়েও সেখান থেকে বেরিয়ে আসার সম্ভাবনা খোঁজা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে সম্পূর্ণ নেতিবাচক হয়ে না পড়াই আশাবাদী মানসিকতার অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি মানুষের মানসিক চাপ সামলানোর ক্ষমতা, প্রতিকূলতার পর ঘুরে দাঁড়ানোর মানসিকতা এবং দৈনন্দিন জীবনযাপনের অভ্যাসকে প্রভাবিত করতে পারে। এসব বিষয় আবার দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত। ফলে আশাবাদী মানসিকতা সরাসরি আয়ু বাড়ায়—এমন সিদ্ধান্তে না গেলেও, দীর্ঘায়ুর সঙ্গে এর একটি উল্লেখযোগ্য সম্পর্ক থাকতে পারে।
কয়েক লাখ মানুষের ওপর পরিচালিত বিভিন্ন গবেষণায় আশাবাদী মানুষের দীর্ঘায়ুর সঙ্গে সম্পর্ক পাওয়া গেছে। কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, যারা জীবন ও ভবিষ্যৎ সম্পর্কে তুলনামূলক ইতিবাচক প্রত্যাশা রাখেন, তারা গড়ে প্রায় ১৫ শতাংশ বেশি দিন বাঁচতে পারেন এবং তাদের ৯০ বছর বা তার বেশি বয়সে পৌঁছানোর সম্ভাবনাও তুলনামূলক বেশি। তবে গবেষকরা বিষয়টিকে সরলভাবে ‘আশাবাদী হলেই আয়ু বাড়বে’ হিসেবে দেখছেন না। বরং অতিরিক্ত নেতিবাচক চিন্তা, দীর্ঘস্থায়ী হতাশা এবং প্রতিটি পরিস্থিতির সবচেয়ে খারাপ পরিণতি কল্পনা করার প্রবণতা এড়িয়ে চলার বিষয়টিও এখানে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

মানসিক চাপের সঙ্গে এই সম্পর্কটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। জীবনে সমস্যা, অনিশ্চয়তা বা ব্যর্থতা আসবেই। কিন্তু কোনো কঠিন ঘটনা ঘটার পর একজন মানুষ সেটিকে কীভাবে ব্যাখ্যা করছেন, তা তার মানসিক চাপের মাত্রাকে প্রভাবিত করতে পারে। অতিরিক্ত নেতিবাচক চিন্তার কারণে একই ঘটনা নিয়ে বারবার ভাবা, ভবিষ্যতে আরও খারাপ কিছু ঘটবে বলে আশঙ্কা করা কিংবা কোনো সমস্যাকে দীর্ঘ সময় ধরে মনে ঘুরিয়ে যাওয়ার প্রবণতা তৈরি হতে পারে। এতে মানসিক চাপ দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার সুযোগ থাকে।
অন্যদিকে তুলনামূলক ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির মানুষ কঠিন পরিস্থিতিকে একটি সাময়িক সমস্যা হিসেবে দেখার এবং সমাধানের পথ খোঁজার চেষ্টা করতে পারেন। এতে উদ্বেগ ও অতিরিক্ত চিন্তার মাত্রা কম থাকতে পারে। দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ কম থাকলে শরীরের ওপর চাপও তুলনামূলকভাবে কম পড়ে। ফলে মানসিক স্বাস্থ্যের পাশাপাশি সামগ্রিক শারীরিক সুস্থতার ক্ষেত্রেও ইতিবাচক প্রভাব তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
জীবনের প্রতিকূলতা সামলে আবার স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসার ক্ষেত্রেও আশাবাদী মানসিকতা ভূমিকা রাখতে পারে। ব্যর্থতা, আর্থিক সমস্যা, সম্পর্কের জটিলতা কিংবা অন্য কোনো কঠিন অভিজ্ঞতার পর কেউ যদি মনে করেন যে পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসার সুযোগ রয়েছে, তাহলে তিনি সমস্যা মোকাবিলায় সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করতে পারেন। বিপরীতে দীর্ঘ সময় ধরে হতাশায় ডুবে থাকলে সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ নেওয়ার আগ্রহ কমে যেতে পারে।

এই মানসিকতার প্রভাব দৈনন্দিন অভ্যাসেও দেখা যেতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, আশাবাদী মানুষ অনেক সময় নিজের ভবিষ্যৎ স্বাস্থ্য সম্পর্কে বেশি ইতিবাচক প্রত্যাশা রাখেন এবং সেই অনুযায়ী স্বাস্থ্যকর অভ্যাস বজায় রাখার চেষ্টা করেন। নিয়মিত শরীরচর্চা করা, পুষ্টিকর খাবার খাওয়া, পর্যাপ্ত ঘুম, ধূমপান বা ক্ষতিকর অভ্যাস এড়িয়ে চলা এবং প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার মতো আচরণ দীর্ঘমেয়াদে স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী। এসব অভ্যাসের সম্মিলিত প্রভাবও দীর্ঘায়ুর সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।
তবে এখানে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি—আশাবাদী হওয়া মানেই সবসময় হাসিখুশি থাকা বা কোনো নেতিবাচক অনুভূতি প্রকাশ না করা নয়। দুঃখ, ভয়, হতাশা কিংবা উদ্বেগ মানুষের স্বাভাবিক আবেগ। সেগুলোকে অস্বীকার না করে পরিস্থিতি বুঝে সামলে ওঠার চেষ্টা করাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। অতিরিক্ত বা অবাস্তব আশাবাদ কখনো কখনো বাস্তব সমস্যাকে উপেক্ষা করার কারণও হতে পারে।
গবেষণাগুলো মূলত মানুষের দীর্ঘমেয়াদি আচরণ ও স্বাস্থ্যগত ফলাফলের মধ্যে সম্পর্ক পর্যবেক্ষণ করেছে। তাই শুধু আশাবাদী মানসিকতার কারণেই একজন মানুষ বেশি দিন বাঁচেন—এমন সরাসরি কারণ-ফল সম্পর্ক এখনো নিশ্চিতভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। জেনেটিক বৈশিষ্ট্য, আর্থসামাজিক অবস্থা, জীবনযাপন, খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক কার্যক্রম, চিকিৎসাসেবা পাওয়ার সুযোগসহ আরও অনেক বিষয় মানুষের আয়ুকে প্রভাবিত করে।

তারপরও এখন পর্যন্ত পাওয়া গবেষণার ফলাফল একটি বিষয়কে সামনে আনে—জীবনকে কীভাবে দেখছি, সেটি হয়তো শরীর ও মনের জন্য যতটা গুরুত্বপূর্ণ ভাবি, তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিকূলতার মধ্যেও বাস্তবতা মেনে নিয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়ার মানসিকতা, চাপ সামলানোর দক্ষতা এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের অভ্যাস—সবকিছু মিলেই দীর্ঘ ও সুস্থ জীবনের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করতে পারে।
তাই দীর্ঘায়ুর কোনো জাদুকরী সূত্র হিসেবে আশাবাদকে দেখার সুযোগ নেই। তবে প্রতিদিনের জীবনে অকারণ নেতিবাচক চিন্তায় ডুবে না থেকে সমস্যাকে বাস্তবভাবে মোকাবিলা করা, ভবিষ্যতের সম্ভাবনার দিকে তাকানো এবং নিজের যত্ন নেওয়ার অভ্যাস গড়ে তোলা মানসিক ও শারীরিক সুস্থতার জন্য উপকারী হতে পারে। শেষ পর্যন্ত হয়তো দীর্ঘ জীবনের পাশাপাশি ভালোভাবে বেঁচে থাকার ক্ষেত্রেও দৃষ্টিভঙ্গির একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।



