আজ বিশ্ব বাঁশ দিবস

বাংলা ভাষায় ‘বাঁশ খাওয়া’ কথাটি সাধারণত নেতিবাচক অর্থেই ব্যবহৃত হয়। কিন্তু বাস্তব জীবনে সেই বাঁশই আমাদের দৈনন্দিন জীবন, কৃষিকাজ, হস্তশিল্প ও অর্থনীতির নানা ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে। আজ ১৮ সেপ্টেম্বর, বিশ্ব বাঁশ দিবস। প্রতিবছর এই দিনে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বাঁশের বহুমুখী ব্যবহার, পরিবেশগত গুরুত্ব এবং অর্থনৈতিক সম্ভাবনা তুলে ধরা হয়।

২০২৫ সালের বিশ্ব বাঁশ দিবসের প্রতিপাদ্য ছিল ‘Next Generation Bamboo: Solutions, Innovation and Design’। নতুন প্রযুক্তি, উদ্ভাবন ও আধুনিক নকশার মাধ্যমে বাঁশকে ভবিষ্যতের আরও কার্যকর ও টেকসই উপকরণ হিসেবে ব্যবহারের বিষয়টিই এতে গুরুত্ব পেয়েছে।
বাংলাদেশের গ্রামীণ জীবনের সঙ্গে বাঁশের সম্পর্ক বহু পুরোনো। ঘরের বেড়া, চালা, মাচা কিংবা অস্থায়ী সেতু তৈরিতে বাঁশের ব্যবহার দীর্ঘদিনের। ডালি, ঝুড়ি, চালুনি, হাতপাখা, খাটিয়াসহ নানা প্রয়োজনীয় সামগ্রী তৈরিতেও বাঁশের ব্যবহার রয়েছে। কৃষিকাজেও এর প্রয়োজন কম নয়। ধান শুকানোর মাচা, ফসল বহনের ঝুড়ি, সবজি চাষের খুঁটি কিংবা মাছ ধরার চাঁই—বিভিন্ন কাজে বাঁশ ব্যবহৃত হয়।

সময়ের সঙ্গে বাঁশের ব্যবহারও বদলেছে। ঐতিহ্যবাহী সামগ্রীর পাশাপাশি এখন বাঁশ দিয়ে তৈরি হচ্ছে আধুনিক আসবাব, বোর্ড, কাগজ ও টেক্সটাইল ফাইবার। পরিবেশবান্ধব বিকল্প হিসেবে বাঁশের তৈরি স্ট্র, প্লেট, কাটলারি ও টুথব্রাশের মতো পণ্যও জনপ্রিয়তা পাচ্ছে।
বাঁশকে ঘিরে গড়ে উঠেছে বড় একটি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে বাঁশ চাষ, সংগ্রহ, পরিবহন, কেনাবেচা এবং বাঁশজাত পণ্য তৈরির সঙ্গে বহু মানুষ যুক্ত। বিভিন্ন আঞ্চলিক বাজারের হিসাব বিবেচনায় দেশে বাঁশের বার্ষিক বাজারমূল্য ৫০০ কোটি টাকার বেশি বলে ধারণা করা হয়। রাঙামাটিতে বছরে প্রায় ৭০ কোটি টাকার বাঁশ বিক্রির তথ্য রয়েছে। রাজশাহী অঞ্চলে বাঁশের বাজারের পরিমাণ প্রায় ২৫০ কোটি টাকা বলে উল্লেখ করা হয়েছে। মানিকগঞ্জের স্থানীয় হাটগুলোতে মাসে প্রায় ২৫ লাখ টাকার বাঁশ বিক্রি হয়। অন্যদিকে মৌলভীবাজারের কালারবাজারেও বছরে দেড় কোটি টাকার বেশি বাঁশ কেনাবেচা হয়।

তবে এসব আঞ্চলিক লেনদেনের তথ্য থাকলেও বাঁশ খাতের পূর্ণাঙ্গ জাতীয় পরিসংখ্যান এখনো সহজলভ্য নয়। ফলে দেশের অর্থনীতিতে এই খাতের প্রকৃত অবদান নির্ধারণ করা কঠিন।
শুধু দেশের বাজারেই নয়, বাংলাদেশের বাঁশ ও বেতজাত পণ্য বিদেশেও যাচ্ছে। মানিকগঞ্জের ঘিওর উপজেলার শ্রীবাড়ি রিশিপাড়া এলাকার কারিগররা বাঁশ ও বেতের তৈরি পণ্য ২৫টিরও বেশি দেশে রপ্তানি করছেন বলে জানা যায়। গাজীপুরের কয়েকটি হস্তশিল্প প্রতিষ্ঠান থেকেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বাঁশজাত পণ্য বিদেশে যাচ্ছে।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছরে বাংলাদেশের হস্তশিল্প খাতে প্রায় ২৯.৭৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে। এই রপ্তানির একটি উল্লেখযোগ্য অংশ বাঁশ ও বেতজাত পণ্য। ইউরোপ, আমেরিকা, মধ্যপ্রাচ্য ও এশিয়ার বিভিন্ন দেশে পরিবেশবান্ধব পণ্যের চাহিদা বাড়ার কারণে বাংলাদেশের বাঁশজাত পণ্যের জন্যও নতুন বাজার তৈরির সুযোগ রয়েছে।
বিশ্বব্যাপী বাঁশ শিল্পের উন্নয়ন ও এর সম্ভাবনা কাজে লাগানোর উদ্দেশ্যে ২০০৫ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় বিশ্ব বাঁশ সংস্থা। পরে ২০০৯ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে অনুষ্ঠিত অষ্টম বিশ্ব বাঁশ কংগ্রেসে দিনটিকে বিশ্ব বাঁশ দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। ওই সম্মেলনে প্রায় ১০০টি দেশের প্রতিনিধি অংশ নেন। বিশ্ব বাঁশ দিবস পালনের প্রস্তাব উত্থাপন করেছিলেন সংস্থাটির তৎকালীন সভাপতি কামেশ সালাম। বর্তমানে বিশ্বের ৫০টিরও বেশি দেশে বিভিন্ন আয়োজনের মাধ্যমে দিবসটি পালন করা হয়।
বাংলাদেশে বাঁশের ব্যবহার ব্যাপক হলেও অর্থনীতির একটি স্বতন্ত্র খাত হিসেবে এর সম্ভাবনা এখনো পুরোপুরি কাজে লাগানো যায়নি। উন্নত জাতের বাঁশ চাষ, কৃষক ও কারিগরদের প্রশিক্ষণ, আধুনিক প্রক্রিয়াজাতকরণ প্রযুক্তি, বিনিয়োগ এবং রপ্তানি সহায়তা বাড়ানো গেলে এই খাত আরও বিস্তৃত হতে পারে।
বিশেষ করে বিশ্ববাজারে পরিবেশবান্ধব পণ্যের চাহিদা বাড়ার সময়ে বাঁশ বাংলাদেশের জন্য একটি সম্ভাবনাময় কাঁচামাল হতে পারে। এজন্য বাঁশ উৎপাদন ও বাজারজাতকরণে পরিকল্পনা, জাতীয় পর্যায়ে নির্ভরযোগ্য তথ্য-উপাত্ত তৈরি এবং উদ্যোক্তাদের প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করা জরুরি।

ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সাবেক সভাপতি রিজওয়ান রাহমানও দেশের গ্রামীণ অর্থনীতিতে বাঁশের গুরুত্বের কথা উল্লেখ করেছেন। তাঁর মতে, বাঁশকে শুধু ঘরদোর বা দৈনন্দিন ব্যবহারের উপকরণ হিসেবে না দেখে শিল্পপণ্য তৈরির কাঁচামাল হিসেবেও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। ইতোমধ্যে বাঁশজাত পণ্য বিদেশে রপ্তানি হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের এই খাতের সম্ভাবনাও স্পষ্ট হয়েছে।
কথার ছলে ‘বাঁশ’ নিয়ে যত রসিকতাই থাকুক, বাংলাদেশের বাস্তব অর্থনীতিতে এর গুরুত্ব মোটেও কম নয়। সঠিক পরিকল্পনা, বিনিয়োগ ও আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে বাঁশ হতে পারে গ্রামীণ মানুষের জীবিকা, হস্তশিল্প এবং রপ্তানি আয়ের আরও বড় একটি উৎস।



