১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ | শনিবারবাংলা: ৪ আশ্বিন ১৪৩৩
বিবিধ

ইউরোপে যে সমুদ্রসৈকতে ঢুকলেই নারী-পুরুষের পথ আলাদা

images (31)

ইতালির ত্রিয়েস্তে শহরের সমুদ্রতীরে রয়েছে এমন এক সৈকত, যা সাধারণ বিচের চিত্র থেকে একেবারেই আলাদা। সৈকতের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে প্রায় ১০ ফুট উঁচু একটি সাদা দেয়াল। দেয়ালের এক পাশে নারীদের জন্য নির্ধারিত অংশ, অন্য পাশে পুরুষদের। ঐতিহ্যবাহী এই সৈকতের নাম ‘লা ল্যানতার্না’, যদিও স্থানীয়দের কাছে এটি ‘এল পেদোচিন’ নামেই বেশি পরিচিত।

উত্তর-পূর্ব ইতালির বন্দরনগরী ত্রিয়েস্তের কেন্দ্রের কাছেই এই সৈকতের অবস্থান। এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে নারী ও পুরুষের জন্য আলাদা জায়গা রাখার এই ব্যবস্থা টিকে আছে। সামান্য প্রবেশমূল্য দিয়ে সৈকতে ঢুকতে হলে একটি করিডর পেরোতে হয়। এরপরই দর্শনার্থীরা চলে যান নির্ধারিত আলাদা অংশে।

নারীদের অংশে বিভিন্ন বয়সী মানুষের দেখা মেলে। কেউ বই পড়ছেন, কেউ সন্তানদের নিয়ে সময় কাটাচ্ছেন, আবার কেউ ব্যস্ত দিনের ফাঁকে একটু সাঁতার কেটে বা রোদ পোহাতে এসেছেন। অন্যদিকে পুরুষদের অংশে অনেককে আড্ডা দিতে, তাস খেলতে কিংবা বিশ্রাম নিতে দেখা যায়। বিশেষ করে বন্দর এলাকায় কাজ করা শ্রমিকদের জন্য জায়গাটি অবসর কাটানোর একটি পরিচিত স্থান।

স্বামী-স্ত্রী কিংবা পরিবারের নারী-পুরুষ সদস্যরা একসঙ্গে সৈকতে এলেও স্থলে তাদের আলাদা অংশে থাকতে হয়। তবে সাগরের পানিতে গিয়ে এই বিভাজন আর থাকে না। অর্থাৎ সৈকতের নির্ধারিত সীমা পেরিয়ে পানিতে নামলে নারী-পুরুষের একসঙ্গে সাঁতার কাটার সুযোগ রয়েছে।

বাইরের পর্যটকদের কাছে এই ব্যবস্থা প্রথম দেখায় কিছুটা অস্বাভাবিক মনে হতে পারে। এমনকি এই সৈকতে এসে কয়েকজন পর্যটকও বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। কিন্তু স্থানীয় অনেক নারী এই আলাদা পরিবেশকে ব্যক্তিগত স্বাচ্ছন্দ্য ও স্বাধীনতার জায়গা হিসেবে দেখেন। তাদের মতে, এখানে শরীর নিয়ে অস্বস্তি বা অন্যের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে অতিরিক্ত চিন্তা না করেই সময় কাটানো যায়।

স্থানীয়দের কাছে দেয়ালটি বিচ্ছিন্নতার প্রতীক নয়; বরং এটি তাদের দীর্ঘদিনের ঐতিহ্যের অংশ। নারীদের জন্য নির্ধারিত অংশে পোশাক, শরীর কিংবা ব্যক্তিগত স্বাচ্ছন্দ্য নিয়ে সামাজিক চাপ তুলনামূলক কম—এমন অভিজ্ঞতার কথাও অনেক দর্শনার্থী বলেন। স্থানীয় লেখক নিকোল ব্রুসাফেরোর ভাষ্য অনুযায়ী, এটি বৈষম্যের জায়গা হিসেবে নয়, বরং নারীদের নিজস্ব পরিসর হিসেবেই দেখা হয়।

Advertisements

এই বিচিত্র ব্যবস্থার পেছনে রয়েছে দীর্ঘ ইতিহাস। ১৯০৩ সালের দিকে সৈকতটি চালু হওয়ার সময় ত্রিয়েস্তে ছিল অস্ট্রো-হাঙ্গেরিয়ান সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত। সে সময়কার সামাজিক রীতিনীতি ও শালীনতার ধারণা থেকেই নারী-পুরুষের জন্য আলাদা জায়গা রাখার ব্যবস্থা গড়ে ওঠে বলে ইতিহাসবিদদের ধারণা।

‘পেদোচিন’ নামটির অর্থ ‘উকুন’। স্থানীয় একটি প্রচলিত গল্প অনুযায়ী, একসময় অস্ট্রীয় সৈন্যরা এখানে এসে তাদের ঘোড়ার শরীর থেকে পোকামাকড় পরিষ্কার করতেন। পরবর্তী সময়ে সৈকতটি নারীদের জন্যও জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। ১৯৫৮ সালে নারীদের অংশে দর্শনার্থীর সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় দেয়ালটি পুনর্নির্মাণ করে জায়গা বাড়ানো হয়।

ত্রিয়েস্তের সামাজিক ইতিহাসের সঙ্গেও এই সৈকতের সম্পর্ক রয়েছে। ইতিহাসবিদদের মতে, শহরটিতে নারীদের শিক্ষা ও সামাজিক স্বাধীনতার চর্চা তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী ছিল। ফলে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পেদোচিন নারীদের জন্য একটি স্বতন্ত্র ও পরিচিত অবকাশকেন্দ্রে পরিণত হয়।

আধুনিক সময়ে এসে ইতালির অধিকাংশ সমুদ্রসৈকত পর্যটক, সংগীত আর নানা ধরনের বিনোদনে মুখর থাকলেও পেদোচিনের পরিবেশ অনেকটাই আলাদা। এখানে ভিন্ন এক ধরনের নিরিবিলি আবহ পাওয়া যায়। কেউ সমুদ্রের পাশে বসে কফি পান করেন, কেউ বই পড়েন, আবার কেউ পরিচিতদের সঙ্গে গল্প করে সময় কাটান।

তবে সময়ের সঙ্গে এই দেয়াল সরিয়ে দেওয়ার প্রশ্নও উঠেছে। কিন্তু স্থানীয় বাসিন্দাদের বড় একটি অংশ মনে করেন, দেয়ালটি সরিয়ে দিলে সৈকতের স্বাতন্ত্র্য ও ঐতিহ্য দুটোই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাদের কাছে এটি কেবল একটি স্থাপনা নয়, বরং ত্রিয়েস্তের ইতিহাস ও সামাজিক সংস্কৃতির একটি অংশ।

আধুনিকতার যুগেও তাই এক শতাব্দীর বেশি পুরোনো এই সৈকত নিজের আলাদা পরিচয় ধরে রেখেছে। সমুদ্রের একই জল নারী-পুরুষকে একত্র করে, অথচ তীরের বালিতে দাঁড়িয়ে থাকা সাদা দেয়ালটি এখনো মনে করিয়ে দেয়—কখনো কখনো একটি শহরের ইতিহাস ও মানুষের অভ্যাসই কোনো জায়গাকে পৃথিবীর অন্য সব সৈকত থেকে আলাদা করে দিতে পারে।

Advertisements