এআই যখন অপতথ্যের হাতিয়ার, নিয়ন্ত্রণে কী ভাবছে সরকার?

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের দ্রুত প্রসারের সঙ্গে এর অপব্যবহার নিয়েও বাড়ছে উদ্বেগ। ডিপফেক তৈরি, হয়রানি, প্রতারণা, অপতথ্য ছড়ানো থেকে শুরু করে শিশুদের লক্ষ্য করে ক্ষতিকর কনটেন্ট তৈরির মতো ঘটনায় প্রযুক্তিটির অপব্যবহার নিয়ে দেশে-বিদেশে আলোচনা চলছে। বাংলাদেশেও বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখছে সরকার।
এআই ব্যবহার করে তৈরি ভুয়া ছবি, ভিডিও, অডিও কিংবা বানোয়াট তথ্য অনেক সময় বাস্তব বলে মনে হতে পারে। ফলে সাধারণ মানুষের পক্ষে সত্য-মিথ্যা যাচাই করা কঠিন হয়ে উঠছে। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমন কনটেন্ট দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায় ব্যক্তিগত সুনাম, সামাজিক নিরাপত্তা ও জনমতের ওপর এর প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকেও এআই ও ডিপফেকের অপব্যবহার ঠেকাতে নীতিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগের কথা জানানো হয়েছে। তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী সংসদে জানিয়েছেন, এআই ও ডিপফেক ব্যবহার করে গুজব, ভুল তথ্য, অপতথ্য ও সাইবার হয়রানি ছড়ানোর বিরুদ্ধে বিভিন্ন কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। একই সঙ্গে এআই-নির্ভর নতুন ধরনের ঝুঁকি মোকাবিলায় বিদ্যমান কাঠামোকে আরও কার্যকর করার প্রয়োজনীয়তার কথাও উঠে এসেছে।

এদিকে আইনমন্ত্রীও এআইয়ের অপব্যবহার ঠেকাতে কার্যকর নিয়ন্ত্রণ কাঠামোর প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, এআই ব্যবহার করে মানুষের কণ্ঠস্বর নকল, ছবি পরিবর্তন কিংবা এমনভাবে বিভ্রান্তিকর তথ্য তৈরি করা সম্ভব, যা মানুষের সিদ্ধান্ত ও মতামতকে প্রভাবিত করতে পারে। এ কারণে বিশেষজ্ঞদের মতামতের ভিত্তিতে এআই ব্যবহারের জন্য একটি আইনি কাঠামো তৈরির বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে।
সরকারের জাতীয় এআই নীতির খসড়াতেও ডিপফেক, অনলাইন হয়রানি, অপতথ্য এবং এআই-নির্ভর সাইবার অপরাধের ঝুঁকি মোকাবিলার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। সেখানে এআই-নির্মিত কনটেন্ট শনাক্ত ও লেবেলিং, জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং ক্ষতিকর এআই-নির্ভর কনটেন্টের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার মতো প্রস্তাব রয়েছে। একই সঙ্গে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া এবং রাষ্ট্রীয় অপব্যবহার থেকে সুরক্ষার বিষয়টিও নীতির খসড়ায় উল্লেখ করা হয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও এআই-নির্ভর অপতথ্যের অভিযোগ সামনে এসেছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার কর্মকর্তারা দাবি করেছেন, কিছু স্বার্থান্বেষী মহল রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে এআই ব্যবহার করে বানোয়াট সংবাদ, ছবি ও মতামত ছড়িয়ে দিচ্ছে। তবে এ ধরনের অভিযোগের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কনটেন্ট, উৎস ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা আলাদাভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
এআইয়ের অপব্যবহার নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়েও উদ্বেগ বাড়ছে। সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন দেশে এআই-নির্মিত ডিপফেক ব্যবহার করে ব্যক্তিকে হয়রানি, ভুয়া বক্তব্য প্রচার এবং বিভ্রান্তিকর কনটেন্ট ছড়ানোর ঘটনা নিয়ে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ও নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোও পদক্ষেপের কথা বলছে।
বাংলাদেশে এআই ব্যবহারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সাইবার নিরাপত্তা কাঠামো শক্তিশালী করার উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে। প্রস্তাবিত সাইবার নিরাপত্তা সংশোধনীতে ক্ষতিকর ও মানহানিকর এআই-নির্মিত কনটেন্ট দ্রুত অপসারণের ব্যবস্থা এবং সংশ্লিষ্ট প্ল্যাটফর্মগুলোর জবাবদিহির বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করার কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্য বিভাগীয় পর্যায়ে আধুনিক সাইবার ইউনিট ও বিশেষায়িত ল্যাব স্থাপনের উদ্যোগের কথাও জানানো হয়েছে।
প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ এখন এমন একটি ভারসাম্য তৈরি করা, যেখানে এআইয়ের উদ্ভাবনী ও ইতিবাচক ব্যবহার বাধাগ্রস্ত হবে না, আবার এর মাধ্যমে মানুষের ক্ষতি, প্রতারণা, হয়রানি বা ব্যাপক অপতথ্য ছড়ানোর সুযোগও সীমিত করা যাবে। ফলে শুধু আইন তৈরি নয়, এআই-সচেতনতা, ডিজিটাল সাক্ষরতা, দ্রুত তথ্য যাচাই এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানোও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।



