৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ | বুধবারবাংলা: ২৫ ভাদ্র ১৪৩৩
জীবনযাপন

শিশুর মেধা বাড়াতে চান? প্রতিদিনের এই অভ্যাসেই লুকিয়ে আছে বড় রহস্য

1644150149_new-project-2022-02-06t172237-934

স্কুলে ভালো ফল, দ্রুত শেখার ক্ষমতা কিংবা কঠিন সমস্যার সমাধান করতে পারা—এসবের পেছনে শিশুর বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশের ভূমিকা রয়েছে। তবে শিশুর মস্তিষ্কের বিকাশ কেবল বই পড়া কিংবা পড়ার টেবিলে দীর্ঘ সময় বসিয়ে রাখার ওপর নির্ভর করে না। বরং প্রতিদিনের ছোট ছোট অভ্যাস, পারিবারিক পরিবেশ এবং শিশুর সঙ্গে বাবা-মায়ের যোগাযোগও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। মজার বিষয় হলো, শিশুর মস্তিষ্কের বিকাশে সহায়ক অনেক অভ্যাসের জন্য আলাদা কোনো খরচও করতে হয় না। প্রয়োজন শুধু সময়, মনোযোগ এবং নিয়মিত চর্চা।

গল্প বলুন, প্রশ্ন করুন

শিশুর সঙ্গে নিয়মিত কথা বলা মস্তিষ্কের বিকাশে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সে যা দেখছে, তা নিয়ে প্রশ্ন করুন। গল্প বলুন এবং গল্পের মাঝখানে তাকে জিজ্ঞেস করুন—‘তারপর কী হতে পারে?’, ‘তুমি হলে কী করতে?’ কিংবা ‘এমন কেন হলো?’

এ ধরনের কথোপকথন শিশুকে শুধু নতুন শব্দ শেখায় না, বরং চিন্তা করা, যুক্তি তৈরি করা এবং নিজের মত প্রকাশের সুযোগ দেয়। বই পড়ে শোনানোর সময়ও শিশুকে শুধু শ্রোতা না বানিয়ে গল্পের চরিত্র ও ঘটনা নিয়ে কথা বলুন।
খেলতে দিন, সবসময় পড়তে বসাবেন না

শিশুর জন্য খেলা নিছক বিনোদন নয়। ব্লক দিয়ে কিছু তৈরি করা, পাজল সমাধান করা, ছবি আঁকা, লুকোচুরি খেলা কিংবা অভিনয় করে গল্প বানানোর মতো কার্যক্রম শিশুর সমস্যা সমাধানের দক্ষতা, কল্পনাশক্তি ও সামাজিক দক্ষতা বিকাশে সহায়তা করতে পারে। বিশেষ করে মুক্ত খেলার সুযোগ শিশুকে নিজের মতো করে সিদ্ধান্ত নেওয়া ও নতুন কিছু চেষ্টা করার সুযোগ দেয়। তাই ‘খেলছে মানেই সময় নষ্ট করছে’—এই ধারণা বদলানো জরুরি।

ঘুমকে দিন বিশেষ গুরুত্ব

Advertisements

শিশুর মস্তিষ্কের বিকাশে পর্যাপ্ত ঘুম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ঘুমের সময় শরীর বিশ্রাম নেওয়ার পাশাপাশি দিনের শেখা ও অভিজ্ঞতাগুলো প্রক্রিয়াজাত করার সুযোগ পায়। পর্যাপ্ত ঘুম না হলে শিশুর মনোযোগ, মেজাজ ও শেখার সক্ষমতায় নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

তাই বয়স অনুযায়ী পর্যাপ্ত ঘুমের সুযোগ তৈরি করা এবং প্রতিদিন প্রায় একই সময়ে ঘুমানোর অভ্যাস গড়ে তোলা ভালো। ঘুমের আগে দীর্ঘ সময় মোবাইল বা ট্যাব ব্যবহারের অভ্যাসও কমানো উচিত।

খাবারে রাখুন বৈচিত্র্য

শিশুর মস্তিষ্কের জন্য আলাদা কোনো ‘ম্যাজিক ফুড’ নেই। বরং সুষম ও বৈচিত্র্যময় খাবারই গুরুত্বপূর্ণ। ডিম, মাছ, ডাল, দুধ বা দুধজাত খাবার, শাকসবজি, ফল, বাদাম ও বিভিন্ন ধরনের পুষ্টিকর খাবার বয়স ও প্রয়োজন অনুযায়ী খাদ্যতালিকায় রাখা যেতে পারে।

শিশুকে শুধু পরীক্ষার ফল ভালো করার জন্য খাবার খাওয়ানোর পরিবর্তে তার সামগ্রিক বৃদ্ধি ও সুস্থতার কথা মাথায় রাখা প্রয়োজন।

প্রকৃতির সঙ্গে সময় কাটাতে দিন

শিশুকে সারাক্ষণ ঘরের ভেতরে বা স্ক্রিনের সামনে আটকে না রেখে বাইরে খেলতে দিন। পার্কে হাঁটা, গাছপালা দেখা, মাটিতে খেলা কিংবা প্রকৃতি পর্যবেক্ষণের মতো অভিজ্ঞতা শিশুর কৌতূহল বাড়াতে পারে।

বাইরের জগৎ শিশুর জন্য একটি জীবন্ত শ্রেণিকক্ষের মতো। ‘পাতার রং কেন বদলায়?’, ‘পিঁপড়া কোথায় যাচ্ছে?’—এমন ছোট প্রশ্ন থেকেই শুরু হতে পারে বড় কৌতূহল।

ভুল করতে দিন

শিশু কোনো কাজ ভুল করলে সঙ্গে সঙ্গে বকা না দিয়ে তাকে ভাবার সুযোগ দিন। একটি অঙ্ক ভুল হয়েছে? উত্তর বলে না দিয়ে জিজ্ঞেস করুন, ‘আবার চেষ্টা করলে কীভাবে করতে পারো?’

ভুল থেকে শেখার সুযোগ শিশুর আত্মবিশ্বাস ও সমস্যা সমাধানের দক্ষতা তৈরিতে সহায়তা করতে পারে। সবসময় সঠিক উত্তর বলে দেওয়া কিংবা প্রতিটি কাজ করে দেওয়া শিশুর স্বাধীনভাবে চিন্তা করার সুযোগ কমিয়ে দিতে পারে।

স্ক্রিনের বদলে তৈরি করুন ‘কথার সময়’

প্রযুক্তি পুরোপুরি বাদ দেওয়া বাস্তবসম্মত নয়। তবে শিশুর বয়স অনুযায়ী স্ক্রিন ব্যবহারে সীমা থাকা জরুরি। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—স্ক্রিন যেন বাবা-মায়ের সঙ্গে কথা বলা, খেলা, ঘুম, পড়াশোনা ও শারীরিক কর্মকাণ্ডের জায়গা দখল না করে।

একসঙ্গে বসে খাওয়ার সময় ফোন সরিয়ে রেখে পরিবারের সবাই কথা বলতে পারেন। দিনের সবচেয়ে মজার ঘটনা কী ছিল, কী নতুন শিখেছে কিংবা কোনো বিষয় তাকে অবাক করেছে—এসব জানতে চাওয়া যেতে পারে।

শিশুর কৌতূহলকে থামিয়ে দেবেন না

‘এত প্রশ্ন করো কেন?’—শিশুর মুখে এমন কথা শুনলে বিরক্ত না হয়ে বরং তার প্রশ্নকে গুরুত্ব দিন। সব প্রশ্নের উত্তর আপনার জানা না থাকলেও সমস্যা নেই। বরং বলতে পারেন, ‘চলো, আমরা দুজন মিলে বের করি।’ এতে শিশু বুঝতে শেখে যে না জানা কোনো লজ্জার বিষয় নয়; বরং জানার আগ্রহই শেখার প্রথম ধাপ। সবশেষে মনে রাখতে হবে, শিশুর আইকিউ একটি সংখ্যামাত্র; শিশুর সামগ্রিক বুদ্ধিবৃত্তিক, আবেগীয়, সামাজিক ও শারীরিক বিকাশ আরও বড় বিষয়। তাই তাকে অন্য শিশুর সঙ্গে তুলনা না করে এমন একটি পরিবেশ তৈরি করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, যেখানে সে নিরাপদে প্রশ্ন করতে, খেলতে, ভুল করতে, নতুন কিছু শিখতে এবং নিজের মতো করে ভাবতে পারে।

শিশুর মস্তিষ্ককে ‘দ্রুত’ বানানোর কোনো জাদুকরী কৌশল নেই। তবে প্রতিদিনের কয়েকটি স্বাস্থ্যকর অভ্যাস তার শেখার পথকে আরও সমৃদ্ধ করতে পারে—আর সেই পরিবর্তনের শুরু হতে পারে আজকের ছোট্ট একটি গল্প, একটি খেলা কিংবা সন্তানের করা একটি প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার মধ্য দিয়েই।

Advertisements