৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ | বুধবারবাংলা: ২৫ ভাদ্র ১৪৩৩
বিবিধ

রাস্তায় রোবটের মিছিল, দাবি ‘কর্মসংস্থান বাঁচাও’

5412e3266278e04a577cf3674dddf2f9-6aa149b546870

রাস্তায় সাধারণত দেখা যায় মানুষকে—কেউ ব্যস্ত অফিসে ছুটছেন, কেউ যানজটে আটকে আছেন, আবার কেউ ব্যস্ত কোনো দাবিতে মিছিল করছেন। কিন্তু পোল্যান্ডের রাজধানী ওয়ারশতে সম্প্রতি দেখা গেল একেবারেই অন্যরকম দৃশ্য। সেখানে মানুষের বদলে রাস্তায় নেমেছিল একদল রোবট। হাতে পতাকা, মুখে স্লোগান—দেখলে মনে হতে পারে, কোনো সিনেমার দৃশ্য!

সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) ডিজিটাল বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সামনে প্রায় ৩০টি রোবট জড়ো হয়ে বিক্ষোভে অংশ নেয়। তাদের দাবি একটাই—কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই এবং রোবট প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তারের সঙ্গে তাল মিলিয়ে কার্যকর নিয়ম ও আইন তৈরি করতে হবে। বিশেষ করে প্রযুক্তির কারণে মানুষের কর্মসংস্থান যাতে হুমকির মুখে না পড়ে, সে বিষয়ে এখনই ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়।

অবশ্য এই রোবটদের হাতে থাকা পতাকা কিংবা মুখে শোনা স্লোগানের পেছনে ছিল মানুষেরই উদ্যোগ। অভিনব এই বিক্ষোভের আয়োজন করে ‘ডেমোক্র্যাটিজম’ নামের একটি সংগঠন। সংগঠনটির লক্ষ্য, এআই ও রোবটকরণ কীভাবে ভবিষ্যতের চাকরির বাজার বদলে দিতে পারে, তা নিয়ে জনমনে আলোচনা তৈরি করা।

যখন রোবটই হয়ে উঠল বিক্ষোভকারী

বিক্ষোভে অংশ নেওয়া রোবটগুলোর চেহারাতেও ছিল বৈচিত্র্য। ছিল মানুষের মতো দেখতে দুই পায়ের হিউম্যানয়েড রোবট, আবার ছিল কুকুরের আদলে তৈরি চার পায়ের রোবটও। তারা দল বেঁধে হাঁটছিল, গোল হয়ে ঘুরছিল এবং বিক্ষোভের পরিবেশ তৈরি করছিল।

লাউডস্পিকারে বারবার শোনা যাচ্ছিল—‘কর্মসংস্থান রক্ষা করো’, ‘নিয়ম চাই’ এবং ‘দেরি না করে নিয়ন্ত্রণ চালু করো’—এমন সব স্লোগান।

Advertisements

এজিবট এ৩ নামের একটি মানবাকৃতির এআই রোবট এএফপিকে জানায়, এই বিক্ষোভের মাধ্যমে দেখানো হচ্ছে যে রোবট ও এআই আর ভবিষ্যতের কল্পবিজ্ঞান নয়; এগুলো ইতিমধ্যেই বাস্তব জীবনের অংশ হয়ে উঠেছে।

চাকরি হারানোর ভয় কতটা বাস্তব?

বিক্ষোভের অন্যতম আয়োজক গ্রেগোর্জ কুলিসের বক্তব্যে উঠে আসে ভবিষ্যতের কর্মসংস্থান নিয়ে উদ্বেগ। তাঁর মতে, মানবাকৃতির রোবট এবং এআইয়ের মাধ্যমে মানুষের বুদ্ধিভিত্তিক কাজও একসময় প্রতিস্থাপিত হতে পারে। তাই প্রযুক্তির অগ্রগতি থামিয়ে দেওয়ার কথা নয়, বরং এর সঙ্গে তাল মিলিয়ে শ্রমিকদের সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় আইন ও নীতিমালা তৈরি করা জরুরি।

কুলিস বলেন, এখনই যদি এ বিষয়ে প্রতিক্রিয়া দেখানো না হয়, তাহলে খুব শিগগিরই বড় ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হতে পারে সমাজ।

রোবটগুলোকে বিক্ষোভে আনার পেছনে আরও একটি উদ্দেশ্য ছিল—মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করা। কুলিসের ভাষ্য অনুযায়ী, এসব রোবট এখনই নিজেদের মতো করে চলাফেরা করতে পারে। এমনকি তাদের দিয়ে বিক্ষোভের মতো কার্যক্রমও পরিচালনা করা সম্ভব। অর্থাৎ প্রযুক্তি যে কতটা দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে, তা চোখের সামনে দেখানোই ছিল এই আয়োজনের অন্যতম লক্ষ্য।

মন্ত্রীর কণ্ঠেও উদ্বেগ

বিক্ষোভের খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে যান পোল্যান্ডের ডিজিটাল বিষয়ক মন্ত্রী ক্রিশতফ গাভকোভস্কি। তিনি আয়োজক গ্রেগোর্জ কুলিসের সঙ্গে কথা বলেন এবং এআই ও রোবটকরণ নিয়ে উদ্বেগের কথা জানান।

মন্ত্রী মনে করেন, নিয়ন্ত্রণহীন এআই মডেল যখন মানবাকৃতির রোবটের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে, তখন বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। রোবট প্রযুক্তি যত এগোবে, এসব সিস্টেমের সক্ষমতাও তত বাড়বে। তাই এর সম্ভাব্য ঝুঁকি মোকাবিলায় আগে থেকেই প্রস্তুতি নেওয়া প্রয়োজন।

কুলিস নিজেও প্রযুক্তি ও কর্মসংস্থান—দুই ক্ষেত্রের সঙ্গে যুক্ত। তিনি একটি রোবোটিকস প্রতিষ্ঠানের সিআইও এবং একই সঙ্গে একটি নিয়োগ সংস্থার সিইও। এর আগে পরিবার, শ্রম ও সামাজিক নীতি মন্ত্রণালয়ের শ্রমবাজার কাউন্সিলেও দুই মেয়াদে দায়িত্ব পালন করেছেন। তাঁর মতে, দ্রুত পরিবর্তনশীল প্রযুক্তি নিয়ে সমাজকে সচেতন করা এখন সময়ের দাবি। কারণ প্রযুক্তির সম্ভাবনার পাশাপাশি এর অজানা ভবিষ্যৎ নিয়েও মানুষের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হচ্ছে।

পোল্যান্ডে এরই মধ্যে শুরু হয়েছে এআই নিয়ন্ত্রণ

রোবটদের এই অভিনব বিক্ষোভের সময়টিও তাৎপর্যপূর্ণ। এর আগে জুলাইয়ে পোল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট কারোল নাভরোৎস্কি একটি আইনে স্বাক্ষর করেন, যার মাধ্যমে ইউরোপীয় ইউনিয়নের এআই আইন দেশটিতে বাস্তবায়নের পথ তৈরি হয়। ডিজিটাল বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাবিত ওই আইনের আওতায় একটি জাতীয় কর্তৃপক্ষ গঠন করা হয়েছে। এই কর্তৃপক্ষ ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিদ্যমান এআই-সংক্রান্ত নিয়মগুলো কার্যকর করতে পারবে।

তবে আইন ও নীতিমালা তৈরির পাশাপাশি প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়ে বিতর্কও যে থামছে না, ওয়ারশর রাস্তায় রোবটদের এই অদ্ভুত মিছিল যেন তারই প্রতীক।
একদিকে এআই ও রোবট মানুষের কাজ সহজ করছে, অন্যদিকে একই প্রযুক্তি ভবিষ্যতে মানুষের কাজের জায়গা দখল করবে কি না—এই প্রশ্নও ক্রমেই জোরালো হচ্ছে। আর সেই প্রশ্নই এবার মানুষের হয়ে রাস্তায় তুলে ধরল রোবটেরা।

হয়তো এটাই ভবিষ্যতের এক অদ্ভুত ইঙ্গিত—যে প্রযুক্তি একদিন মানুষের কাজ কেড়ে নেওয়ার আশঙ্কা তৈরি করছে, সেই প্রযুক্তির রোবটই এখন মানুষের কর্মসংস্থান রক্ষার দাবিতে ‘মিছিল’ করছে!

Advertisements