হঠাৎ চারপাশের জিনিস বড়-ছোট মনে হলে যে রোগের লক্ষণ

হঠাৎ মনে হলো, ঘরের পরিচিত জিনিসগুলো অস্বাভাবিক বড় হয়ে গেছে। আবার কখনো নিজের হাত-পা ছোট কিংবা শরীরের কোনো অংশ স্বাভাবিকের চেয়ে বড় মনে হতে পারে। এমনকি সময় খুব দ্রুত বা ধীরে কাটছে, চারপাশের পরিবেশ স্বপ্নের মতো লাগছে—বাস্তবে কোনো পরিবর্তন না ঘটলেও এমন অদ্ভুত অনুভূতি হতে পারে।
চিকিৎসাবিজ্ঞানে এ ধরনের অনুভূতিকে বলা হয় ‘অ্যালিস ইন ওয়ান্ডারল্যান্ড সিনড্রোম’ (এআইডব্লিউএস)। ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস ও হাসপাতালের ক্লিনিক্যাল নিউরোলজি বিভাগের অধ্যাপক ডা. এম এস জহিরুল হক চৌধুরী জানিয়েছেন, এটি একটি বিরল স্নায়বিক অবস্থা। এতে ব্যক্তি বাস্তব জিনিসের আকার, দূরত্ব, অবস্থান কিংবা নিজের শরীর সম্পর্কে বিকৃত অনুভূতি পেতে পারেন।

‘অ্যালিস ইন ওয়ান্ডারল্যান্ড’ গল্পে অ্যালিসের হঠাৎ বড় বা ছোট হয়ে যাওয়ার অভিজ্ঞতার সঙ্গে এ সিনড্রোমের অনুভূতির মিল থাকায় এর এমন নামকরণ করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞের মতে, মস্তিষ্কের দৃষ্টি ও স্থান-শরীর সম্পর্কিত তথ্য প্রক্রিয়াকরণে সাময়িক গোলযোগের কারণে এআইডব্লিউএস হতে পারে। মস্তিষ্কের অক্সিপিটাল ও পারিয়েটাল লোবের কার্যক্রমে সমস্যা হলে জিনিসের আকার, দূরত্ব বা সময়ের অনুভূতিতে পরিবর্তন দেখা দিতে পারে।
এআইডব্লিউএসের সবচেয়ে সাধারণ কারণগুলোর একটি হলো মাইগ্রেন। এ ছাড়া এপস্টাইন-বার ভাইরাসসহ কিছু ভাইরাল সংক্রমণ, এপিলেপসি, মস্তিষ্কে আঘাত, টিউমার, স্ট্রোক এবং কিছু ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াতেও এ সমস্যা দেখা দিতে পারে। অতিরিক্ত মানসিক চাপ ও উদ্বেগও কখনো কখনো এর ট্রিগার হিসেবে কাজ করতে পারে।
শিশু ও কিশোরদের মধ্যে এ সিনড্রোম তুলনামূলক বেশি দেখা যায়। বিশেষ করে ৫ থেকে ১৫ বছর বয়সীদের মধ্যে এর প্রবণতা বেশি। মাইগ্রেন, মৃগী, ভাইরাল সংক্রমণ কিংবা মস্তিষ্কে আঘাতের ইতিহাস থাকলেও ঝুঁকি বাড়তে পারে।
এই সিনড্রোমে আক্রান্ত ব্যক্তির কাছে জিনিসপত্র অস্বাভাবিক ছোট বা বড়, খুব কাছে কিংবা অনেক দূরে মনে হতে পারে। নিজের হাত-পা বা শরীরের বিভিন্ন অংশও স্বাভাবিকের চেয়ে বড় বা ছোট মনে হতে পারে। ঘর বা আশপাশের জায়গার আকার-আয়তন নিয়েও বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে। কখনো সময় দ্রুত বা ধীরে যাচ্ছে বলে মনে হয়। আবার নিজেকে কিংবা চারপাশের পরিবেশকে অবাস্তব বা স্বপ্নের মতোও লাগতে পারে।
অনেক ক্ষেত্রে এসব লক্ষণ কয়েক মিনিট থেকে কয়েক ঘণ্টা স্থায়ী হয়ে আবার স্বাভাবিক হয়ে যায়। লক্ষণ দেখা দিলেও রোগী সাধারণত সচেতন থাকেন এবং বুঝতে পারেন যে বাস্তবে পরিবর্তন ঘটেনি, বরং তার অনুভূতিতেই পরিবর্তন হয়েছে। অনেকের ক্ষেত্রে এসব লক্ষণের পর মাইগ্রেনের মাথাব্যথা শুরু হতে পারে।
অধ্যাপক ডা. এম এস জহিরুল হক চৌধুরী বলেন, এআইডব্লিউএসের চিকিৎসার মূল লক্ষ্য হলো এর পেছনে থাকা কারণটি শনাক্ত করে সেটির চিকিৎসা করা। মাইগ্রেনের কারণে হলে মাইগ্রেন নিয়ন্ত্রণে আনা হলে সিনড্রোমের লক্ষণও কমে যেতে পারে। ভাইরাল সংক্রমণের ক্ষেত্রে সাধারণত বিশ্রাম, পর্যাপ্ত পানি পান ও উপসর্গ অনুযায়ী চিকিৎসাই যথেষ্ট হতে পারে। এপিলেপসির ক্ষেত্রে প্রয়োজন অনুযায়ী খিঁচুনি প্রতিরোধী ওষুধ ব্যবহার করা হয়। মস্তিষ্কে টিউমার, আঘাত বা স্ট্রোকের মতো কারণ থাকলে পরিস্থিতি অনুযায়ী বিশেষ চিকিৎসা প্রয়োজন হতে পারে।
কোনো ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় এমন সমস্যা হলে চিকিৎসকের পরামর্শে সেই ওষুধ পরিবর্তন বা বন্ধ করার প্রয়োজন হতে পারে। অনেক শিশু ও কিশোরের ক্ষেত্রে কোনো নির্দিষ্ট ওষুধ ছাড়াই সময়ের সঙ্গে এ সমস্যা কমে যেতে পারে।
তবে এআইডব্লিউএসের লক্ষণ বারবার দেখা দিলে, বিশেষ করে প্রাপ্তবয়স্ক বয়সে নতুন করে শুরু হলে কিংবা এর সঙ্গে খিঁচুনি, অজ্ঞান হয়ে যাওয়া বা তীব্র মাথাব্যথা থাকলে দ্রুত নিউরোলজিস্টের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
লক্ষণ কমাতে পর্যাপ্ত ঘুম, পানি পান, নিয়মিত ব্যায়াম ও মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইম, উজ্জ্বল আলো এবং ব্যক্তিভেদে যেসব খাবার মাইগ্রেনের ট্রিগার হিসেবে কাজ করে, সেগুলো এড়িয়ে চলার পরামর্শও দেওয়া হয়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, এমন অনুভূতি হলে আতঙ্কিত না হয়ে এর কারণ নির্ণয়ের জন্য চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া।



