৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ | মঙ্গলবারবাংলা: ২৪ ভাদ্র ১৪৩৩
স্পটলাইট

হামে প্রাণহানি হাজারের পথে, টিকার আওতায় আসেনি ৪০ লাখ শিশু

IMG_4704

বাংলাদেশে হামের প্রাদুর্ভাব শুরুর প্রায় ছয় মাস পেরিয়ে গেলেও পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়নি। বরং আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা এখনো বাড়ছে। এ পর্যন্ত হাম ও হামের উপসর্গে আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৮৫ হাজার ৬০। অন্যদিকে নিশ্চিত ও সন্দেহভাজন হাম-সংশ্লিষ্ট মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ৯৯৭।

সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) সকাল ৮টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় হাম ও হামসদৃশ উপসর্গে আরও তিন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এতে প্রাণহানির সংখ্যা হাজারের কাছাকাছি পৌঁছেছে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমানে প্রায় সব বয়সি শিশুর মধ্যেই হাম ছড়িয়ে পড়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে টিকাদানের বয়সসীমা প্রমাণভিত্তিকভাবে অন্তত ১৫ বছর পর্যন্ত বাড়ানো, মাঠপর্যায়ে মাইক্রোপ্ল্যানিং জোরদার এবং কমিউনিটি পর্যায়ে নজরদারি বাড়ানো জরুরি।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী বলেন, বিপুলসংখ্যক শিশু টিকাদানের বাইরে থাকায় তাদের শরীরে প্রয়োজনীয় ইমিউনিটি তৈরি হয়নি। এমনকি ছয় মাসের কম বয়সি শিশুরাও হামে আক্রান্ত হচ্ছে। মায়েদের হামের টিকা না থাকায় অনেক শিশুর শরীরেও পর্যাপ্ত রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয়নি বলে মনে করেন তিনি।

তার মতে, দেশে প্রায় ৪০ লাখ পথশিশু রয়েছে, যাদের অনেকেই হামের টিকা পায়নি। অন্তত ৯৫ শতাংশ শিশুকে টিকার আওতায় না আনা গেলে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা কমানো কঠিন।

ডা. মোহাম্মদ মুশতাক হোসেন বলেন, হাম নিয়ন্ত্রণের কৌশল শুধু হাসপাতাল বা আইসিইউকেন্দ্রিক হলে হবে না, কমিউনিটি পর্যায়ে কার্যক্রম জোরদার করতে হবে। রোগী শনাক্ত, প্রতিরোধ ও আইসোলেশনের জন্য কমিউনিটির সম্পৃক্ততা প্রয়োজন।

Advertisements

তিনি বলেন, জরুরি পরিস্থিতিতে বাড়ি বাড়ি গিয়ে টিকা দেওয়া যেতে পারে। তবে দীর্ঘমেয়াদে ইপিআইয়ের প্রচলিত মাইক্রোপ্ল্যানিং পদ্ধতিতে ফিরতে হবে। প্রতিটি শিশুর তালিকা তৈরি করে কার টিকা প্রয়োজন তা নির্ধারণ এবং নিকটবর্তী টিকাকেন্দ্রের তথ্য পরিবারগুলোকে আগে থেকেই জানানো দরকার। ছিটেফোঁটা টিকাদানের মাধ্যমে ৯৫ শতাংশ কভারেজ নিশ্চিত করা সম্ভব নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

জাতীয় হাম ও রুবেলা নির্মূল যাচাই কমিটির চেয়ারম্যান ও মহামারি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক মাহমুদুর রহমান বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে হাম কমার উল্লেখযোগ্য কোনো লক্ষণ নেই। ছয় থেকে নয় মাস, নয় মাস থেকে এক বছর এবং এক থেকে পাঁচ বছর বয়সি শিশুদের মধ্যেও সংক্রমণ দেখা যাচ্ছে।

তার দাবি, ঘোষিত টিকাদান কভারেজের সঙ্গে বাস্তব পরিস্থিতির মিল পাওয়া যাচ্ছে না। ১০৩ শতাংশ টিকাদান কভারেজের দাবি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তিনি। শুধু টিকা সরবরাহ করলেই হবে না, শিশুদের টিকাকেন্দ্রে নিয়ে আসতে মায়েদের উৎসাহিত করতে ব্যাপক জনসচেতনতা প্রয়োজন বলেও জানান তিনি।

অধ্যাপক মাহমুদুর রহমান আরও বলেন, ছয় মাসের কম বয়সি কোনো শিশুর জ্বর হলে দ্রুত হাম শনাক্ত করে তাকে আলাদা রাখার বিষয়েও গুরুত্ব দিতে হবে। তার মতে, হাম বর্তমানে সরকারের অগ্রাধিকার তালিকা থেকে অনেকটাই হারিয়ে গেছে।

তবে সরকারের পক্ষ থেকে এ বক্তব্যের সঙ্গে একমত নন প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বিষয়ক বিশেষ সহকারী ড. এস এম জিয়াউদ্দিন হায়দার। তিনি বলেন, সরকার সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে পরিস্থিতি মোকাবিলায় কাজ করছে।

তার ভাষ্য, যেসব শিশুর শরীরে ইমিউনিটি নেই এবং যারা রোগের শেষ পর্যায়ে হাসপাতালে আসছে, তাদের মধ্যে মৃত্যুর ঝুঁকি বেশি। টিকার কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন উঠলে বিষয়টি যাচাই করা হচ্ছে। টিকা নেওয়া শিশুদের কাছ থেকে রক্ত সংগ্রহ করে পরীক্ষা করা হচ্ছে এবং ফল পেতে কিছুটা সময় লাগবে।

তিনি আরও জানান, প্রতিটি উপজেলায় হামের টিকা মজুত রাখা হয়েছে, যাতে প্রয়োজন অনুযায়ী শিশুদের টিকা দেওয়া যায়। সরকারের প্রচেষ্টায় কোনো ঘাটতি নেই বলেও দাবি করেন তিনি।

গত মার্চের শুরুতে দেশে হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দেওয়ার পর এপ্রিল মাসে ৬ মাস থেকে ৫ বছর বয়সি শিশুদের জন্য বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি শুরু করে সরকার। ওই কর্মসূচিতে সারা দেশে অন্তত ১ কোটি ৮০ লাখ ১৫ হাজার শিশুকে টিকার আওতায় আনার লক্ষ্যমাত্রা ছিল।

এরপর জুন মাসে একই বয়সসীমার শিশুদের ভিটামিন ‘এ’ খাওয়ানোর কর্মসূচি চালানো হলে দেখা যায়, অংশ নেওয়া শিশুর সংখ্যা ছিল ২ কোটি ২৬ লাখ। ফলে হামের টিকাদান কর্মসূচিতে প্রায় ৪৬ লাখ শিশু বাদ পড়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।

তবে ড. এস এম জিয়াউদ্দিন হায়দার এই ৪৬ লাখ শিশুকে হামের টিকার বাইরে থাকা শিশু হিসেবে চিহ্নিত করার বিষয়ে সতর্কতা জানিয়েছেন। তার মতে, ভিটামিন ‘এ’ কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া সব শিশুর বয়স পাঁচ বছরের নিচে ছিল কি না, তা নিশ্চিত নয়। বিষয়টি নিশ্চিত করতে জরিপ প্রয়োজন।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডাব্লিউএইচও) মতে, হাম সংক্রমণের শৃঙ্খল ভাঙতে অন্তত ৯৫ শতাংশ শিশুকে দুই ডোজ টিকার আওতায় আনতে হয়। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, বাংলাদেশে চলমান বড় ধরনের হামের প্রাদুর্ভাবের পেছনে টিকাদানের এই ইমিউনিটি গ্যাপ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

Advertisements