৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ | বুধবারবাংলা: ২৫ ভাদ্র ১৪৩৩
জীবনযাপন

‘লুটিয়াল আগলিজ’ আসলে কী, মাসিকের আগে কেন নিজেকে অসুন্দর লাগে?

028fc7a0-21c0-11f0-8c2e-77498b1ce297.jpg

মাসিকের আগে হঠাৎ আয়নায় নিজেকে অন্য রকম মনে হচ্ছে? ত্বক নিস্তেজ, মুখ কিছুটা ফোলা, ব্রণ বেড়েছে, শরীর ভারী লাগছে কিংবা মনটা অকারণে খারাপ—এমন অভিজ্ঞতা অনেক নারীরই হয়ে থাকে। শুধু শারীরিক পরিবর্তন নয়, এ সময় আত্মবিশ্বাসেও ভাটা পড়তে পারে। নিজের চেহারার ছোটখাটো ত্রুটিও তখন অনেক বড় বলে মনে হয়।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাম্প্রতিক সময়ে এসব অভিজ্ঞতাকে একত্র করে জনপ্রিয় হয়েছে ‘লুটিয়াল আগলিজ’ (Luteal uglies) শব্দটি। এটি কোনো চিকিৎসাবিজ্ঞানের আনুষ্ঠানিক রোগের নাম নয়; বরং মাসিক চক্রের নির্দিষ্ট সময়ে শরীর, ত্বক, মেজাজ ও আত্মবিশ্বাসে যে সাময়িক পরিবর্তন দেখা দিতে পারে, সেটিকে বোঝাতেই অনলাইনে শব্দটি ব্যবহার করা হচ্ছে।

লুটিয়াল ফেজ কী?

নারীর মাসিক চক্র কয়েকটি পর্যায়ে বিভক্ত। এর মধ্যে একটি হলো ‘লুটিয়াল ফেজ’। সাধারণত ডিম্বস্ফোটন বা ওভুলেশনের পর শুরু হয়ে পরবর্তী মাসিকের প্রথম দিন পর্যন্ত এই পর্যায় থাকে।

এই সময়ে শরীরে বিভিন্ন হরমোনের মাত্রায় স্বাভাবিক পরিবর্তন ঘটে। বিশেষ করে ওভুলেশনের পর প্রোজেস্টেরনের মাত্রা বাড়ে। গর্ভধারণ না হলে চক্রের শেষ দিকে প্রোজেস্টেরন ও ইস্ট্রোজেনের মাত্রা কমতে শুরু করে। এই হরমোনগত পরিবর্তনের প্রভাবেই অনেকের শরীর ও মনে নানা ধরনের উপসর্গ দেখা দিতে পারে।

সবার অভিজ্ঞতা অবশ্য এক রকম নয়। কারও উপসর্গ খুব সামান্য, আবার কারও ক্ষেত্রে তা দৈনন্দিন জীবনেও প্রভাব ফেলতে পারে।

কেন চেহারায় পরিবর্তন আসে?

মাসিকের আগের দিনগুলোতে হরমোনের ওঠানামার পাশাপাশি শরীরে পানি ধরে রাখার প্রবণতা বাড়তে পারে। এর ফলে মুখ কিছুটা ফোলা বা ভারী দেখাতে পারে। পেট ফাঁপা, স্তনে ভারীভাব বা অস্বস্তিও অনুভূত হতে পারে।

Advertisements

ত্বকের ক্ষেত্রেও পরিবর্তন দেখা দিতে পারে। হরমোনের প্রভাবে কিছু মানুষের ত্বকে তেলতেলে ভাব বাড়ে এবং বিশেষ করে চিবুক ও চোয়ালের আশপাশে ব্রণ বা ফুসকুড়ি দেখা দিতে পারে। ফলে যাদের ত্বক সাধারণত পরিষ্কার থাকে, তারাও এ সময়ে সাময়িকভাবে ব্রণের সমস্যায় পড়তে পারেন।

এ কারণে আয়নায় নিজের চেহারা দেখে অনেকের মনে হতে পারে, ‘আজ আমাকে এত ক্লান্ত বা মলিন দেখাচ্ছে কেন?’ বাস্তবে এই পরিবর্তন সাধারণত সাময়িক।

শুধু চেহারা নয়, মনের ওপরও প্রভাব পড়ে

‘লুটিয়াল আগলিজ’ কথাটির সঙ্গে শুধু সৌন্দর্যের বিষয়টি জড়িত নয়। মাসিকের আগে অনেকের মেজাজেও পরিবর্তন দেখা দিতে পারে।

এ সময় কারও কারও মধ্যে দেখা দিতে পারে—

  • অস্বাভাবিক ক্লান্তি বা অবসাদ
  • মনোযোগ ধরে রাখতে সমস্যা
  • খিটখিটে মেজাজ বা আবেগের ওঠানামা
  • মন খারাপ বা বিষণ্ন লাগা
  • আত্মবিশ্বাস কমে যাওয়া
  • অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা
  • নিজেকে নিয়ে নেতিবাচক চিন্তা
  • সামাজিকভাবে নিজেকে গুটিয়ে নেওয়ার প্রবণতা

কখনো এমনও হয়, যে বিষয়টি অন্য সময়ে খুব একটা গুরুত্বপূর্ণ মনে হয় না, মাসিকের আগে সেটিই অত্যন্ত বিরক্তিকর বা বিব্রতকর বলে মনে হতে পারে। নিজের চেহারা নিয়েও নেতিবাচক চিন্তা বাড়তে পারে।

কেন নিজেকে তখন বেশি ‘অসুন্দর’ মনে হয়?

এখানে শারীরিক পরিবর্তনের পাশাপাশি মানসিক অবস্থাও গুরুত্বপূর্ণ। শরীরে পানি জমে মুখ কিছুটা ফোলা, ত্বকে ব্রণ বা নিস্তেজভাব এবং চোখেমুখে ক্লান্তির ছাপ—এসব পরিবর্তন আয়নায় নিজের পরিচিত চেহারাটিকে কিছুটা আলাদা করে তুলতে পারে।

এর সঙ্গে যদি মন খারাপ, উদ্বেগ বা আত্মবিশ্বাস কমে যাওয়ার মতো বিষয় যোগ হয়, তাহলে নিজের চেহারার ছোটখাটো বিষয়ও অতিরঞ্জিত মনে হতে পারে।

তাই এই সময়ে আয়নায় দেখা চেহারা নিয়ে খুব দ্রুত কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক নয়। কয়েক দিন পর হরমোনের পরিবর্তন স্বাভাবিক হলে এসব উপসর্গও অনেকের ক্ষেত্রে কমে যায়।

এটি কি কোনো রোগ?

‘লুটিয়াল আগলিজ’ নিজে কোনো স্বীকৃত রোগ বা চিকিৎসাবিজ্ঞানের নির্দিষ্ট রোগনির্ণয় নয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচলিত এই শব্দটি মূলত মাসিকের আগের সময়ের সাময়িক শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তন বোঝাতে ব্যবহৃত হয়।

তবে মাসিকের আগে শারীরিক ও মানসিক উপসর্গ খুব বেশি হলে সেটি প্রি-মেনস্ট্রুয়াল সিনড্রোম বা PMS-এর সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। আর উপসর্গ যদি অত্যন্ত তীব্র হয় এবং নিয়মিতভাবে কাজ, সম্পর্ক, পড়াশোনা বা দৈনন্দিন জীবন ব্যাহত করে, তাহলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। কিছু ক্ষেত্রে গুরুতর প্রি-মেনস্ট্রুয়াল উপসর্গের জন্য আলাদা চিকিৎসা প্রয়োজন হতে পারে।

কখন হয় ‘লুটিয়াল আগলিজ’?

সাধারণত মাসিক শুরু হওয়ার আগের কয়েক দিনেই এসব পরিবর্তন বেশি চোখে পড়ে। তবে ঠিক কখন উপসর্গ শুরু হবে, তা ব্যক্তি ও মাসিক চক্রভেদে আলাদা হতে পারে।

কারও ক্ষেত্রে ওভুলেশনের পর থেকেই সামান্য পরিবর্তন শুরু হতে পারে, আবার কারও ক্ষেত্রে মাসিকের কয়েক দিন আগে উপসর্গ বেশি স্পষ্ট হয়। মাসিক শুরু হওয়ার পর অনেকের এসব উপসর্গ দ্রুত কমে যায়।

নিজের ক্ষেত্রে বিষয়টি বোঝার সবচেয়ে সহজ উপায় হলো কয়েক মাস ধরে মাসিকের তারিখ, ত্বকের অবস্থা, মেজাজ, ঘুম, ক্ষুধা, ফোলাভাব ও ক্লান্তির মতো উপসর্গ নোট করে রাখা। এতে একটি নির্দিষ্ট প্যাটার্ন আছে কি না, তা বোঝা সহজ হবে।

এই সময় স্বস্তি পেতে যা করতে পারেন

‘লুটিয়াল আগলিজ’ মোকাবিলায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো নিজের শরীরের পরিবর্তনকে স্বাভাবিকভাবে নেওয়া এবং নিজের প্রতি একটু বেশি যত্নশীল হওয়া।

মাসিকের চক্র ট্র্যাক করুন:
অ্যাপ বা ডায়েরিতে মাসিকের তারিখ এবং উপসর্গ লিখে রাখুন। কয়েক মাস পর কোন সময়ে আপনার শরীর ও মনের পরিবর্তন বেশি হয়, তা সহজেই বুঝতে পারবেন।

ত্বকের যত্নে সরল থাকুন:
এই সময়ে ত্বকে নতুন বা কড়া প্রসাধনী ব্যবহার না করে পরিচিত ও মৃদু স্কিনকেয়ার রুটিন অনুসরণ করাই ভালো। ত্বকের ধরন অনুযায়ী ময়শ্চারাইজার ব্যবহার করতে পারেন।

পর্যাপ্ত পানি পান করুন:
পর্যাপ্ত পানি পান শরীরকে হাইড্রেটেড রাখতে সাহায্য করে। লবণ বেশি খেলে কারও কারও ফোলাভাব বাড়তে পারে, তাই সুষম খাবারের দিকে নজর দেওয়া ভালো।

ঘুমকে গুরুত্ব দিন:
পর্যাপ্ত ও নিয়মিত ঘুম ক্লান্তি ও মেজাজের ওঠানামা সামলাতে সহায়ক হতে পারে।

হালকা ব্যায়াম করুন:
হাঁটা, স্ট্রেচিং বা নিজের জন্য আরামদায়ক হালকা শরীরচর্চা অনেকের ক্ষেত্রে মন-মেজাজ ভালো রাখতে সাহায্য করে।

নিজেকে নিয়ে কঠোর হবেন না:
এই কয়েক দিনে আয়নায় নিজেকে দেখে ‘আমি খারাপ দেখাচ্ছি’—এমন সিদ্ধান্তে না গিয়ে মনে রাখা ভালো, এটি সাময়িক পরিবর্তন হতে পারে। চেহারার পাশাপাশি মানসিক অবস্থাও নিজের উপলব্ধিকে প্রভাবিত করতে পারে।

গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত কয়েক দিন পরে নিলেই ভালো

মাসিকের আগের সময়ে যদি নিজের চেহারা, আত্মবিশ্বাস বা মেজাজ নিয়ে নেতিবাচক অনুভূতি তৈরি হয়, সেটিকে স্থায়ী সত্য ধরে নেওয়ার প্রয়োজন নেই। বিশেষ করে নিজের চেহারা, সম্পর্ক বা ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে বড় কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে কিছুটা সময় অপেক্ষা করা যেতে পারে।

কারণ শরীরের এই পর্যায়টি কেটে গেলে অনেকেরই মেজাজ, ত্বক ও আত্মবিশ্বাস স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে।

সবশেষে মনে রাখা দরকার, ‘লুটিয়াল আগলিজ’ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জনপ্রিয় একটি শব্দ—নিজের শরীর বা সৌন্দর্যকে বিচার করার কোনো বৈজ্ঞানিক মাপকাঠি নয়। মাসিক চক্রের স্বাভাবিক পরিবর্তনের কারণে কয়েকটি দিন নিজেকে আলাদা লাগতেই পারে। তাই সেই সময়টুকুতে নিজের প্রতি একটু বেশি যত্ন, বিশ্রাম ও সহানুভূতিই হতে পারে সবচেয়ে ভালো উপায়।

Advertisements