৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ | বুধবারবাংলা: ২৫ ভাদ্র ১৪৩৩
বিবিধ

শিশুদের ‘ঘ্রাণ শোঁকা’ শেখানো দরকার, বলছেন গবেষক

IMG_4706

নাক দিয়ে ঘ্রাণ নেওয়া মানুষের স্বাভাবিক ক্ষমতা হলেও কোন ঘ্রাণ কীভাবে চিনতে ও বর্ণনা করতে হয়, তা আলাদাভাবে শেখানো হয় না। অথচ শিশুদের ছোটবেলা থেকেই বিভিন্ন ঘ্রাণ চিনতে ও সেগুলো নিয়ে ভাবতে শেখানো হলে তাদের সুস্থতা বাড়ার পাশাপাশি চারপাশের পৃথিবীকে আরও গভীরভাবে বুঝতে সাহায্য করতে পারে বলে মনে করেন যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব ইয়র্কের গবেষক ড. উইল টালেট।

ঘ্রাণ নিয়ে গবেষণা করা এই ইতিহাসবিদের মতে, বায়ুদূষণ মানুষের ঘ্রাণশক্তির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। একই সঙ্গে আধুনিক জীবনে গাড়ির ভেতর, ঘরবাড়ি কিংবা বিভিন্ন পণ্যে কৃত্রিম সুগন্ধ ব্যবহারের কারণে অনেক সময় কোনো বস্তু বা পরিবেশের স্বাভাবিক ঘ্রাণও পাওয়া যায় না। ফলে বিভিন্ন ঘ্রাণের পার্থক্য বোঝার ক্ষমতা কীভাবে বদলাচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।

এ কারণে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায় থেকেই শিশুদের চারপাশের বিভিন্ন জিনিস শুঁকে ঘ্রাণ চেনার অভ্যাস করানোর পরামর্শ দিয়েছেন টালেট। তার মতে, যত বেশি ঘ্রাণ শোঁকা হবে, ততই বিভিন্ন ঘ্রাণ শনাক্ত ও বর্ণনা করার শব্দভান্ডার সমৃদ্ধ হবে।

ওয়াইনের স্বাদ ও ঘ্রাণ বিচার করা সোমেলিয়েরদের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, তারাও নিয়মিত বিভিন্ন জিনিসের ঘ্রাণ নিয়ে নিজেদের পরিচিতির পরিসর বাড়ান। ফলে পরে কোনো ঘ্রাণের সঙ্গে অন্য ঘ্রাণের মিল বা অমিল সহজে শনাক্ত করতে পারেন।

টালেট মনে করেন, ঘ্রাণের প্রতি সচেতনতা শুধু চারপাশের পরিবেশ বোঝার ক্ষেত্রেই নয়, নিজেদের বোঝার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ। কোনো নির্দিষ্ট ঘ্রাণ কেন স্বস্তি দেয় বা কেন অস্বস্তি তৈরি করে, তা নিয়ে ভাবলে নিজের অনুভূতি সম্পর্কেও ধারণা পাওয়া যায়।

খাবারের ক্ষেত্রেও ঘ্রাণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কোনো খাবার তাজা আছে কি না কিংবা নষ্ট হয়ে গেছে কি না, অনেক সময় ঘ্রাণ থেকেই তা বোঝা সম্ভব। তাই শুধু প্যাকেটের ব্যবহারের শেষ তারিখের ওপর নির্ভর না করে খাবারের স্বাভাবিক ঘ্রাণও বিবেচনায় নেওয়া যেতে পারে।

Advertisements

ঘ্রাণের সঙ্গে মানসিক সুস্থতারও সম্পর্ক রয়েছে। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, ঘ্রাণ উপভোগ করার সক্ষমতা মানুষের মানসিক সুস্থতার সঙ্গে যুক্ত। কোনো কারণে ঘ্রাণশক্তি হারালে বিষণ্নতা ও উদ্বেগের মতো সমস্যার ঝুঁকিও বাড়তে পারে।

তবে মানুষের ঘ্রাণ নিয়ে কথা বলার অভ্যাস কম থাকাটাকেই বড় সমস্যা হিসেবে দেখছেন টালেট। তার মতে, মানুষকে ঘ্রাণ নিয়ে কথা বলার সুযোগ দেওয়া হলে তারা অনেক সময় কোনো নির্দিষ্ট ঘ্রাণের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা পুরোনো স্মৃতি ও অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরতে পারেন। কিন্তু অনেকেরই ঘ্রাণ বর্ণনা করার মতো যথেষ্ট শব্দভান্ডার বা আত্মবিশ্বাস নেই।

৮ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত হওয়ার কথা রয়েছে টালেটের বই ‘সিনিফ: আ হিস্টরি অব স্মেলস’। বইটি নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে তিনি প্রচলিত একটি ধারণার বিরোধিতা করেছেন—অতীত বর্তমানের তুলনায় বেশি দুর্গন্ধময় ছিল। তার মতে, অতীতে ঘ্রাণের পরিমাণ বেশি ছিল এমন নয়, বরং ঘ্রাণ ছিল ভিন্ন ধরনের।

তার মতে, ঘ্রাণের সঙ্গে মানুষের সামাজিক পরিচয় ও বৈষম্যেরও সম্পর্ক রয়েছে। কোনো নির্দিষ্ট খাবারের গন্ধ সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণার কারণে বাড়ির মালিক কোনো জাতিগোষ্ঠীর মানুষকে ভাড়া দিতে না চাইতে পারেন। এমনকি যুক্তরাজ্যে রাস্তায় বসবাসকারী মানুষদের ‘অতিরিক্ত’ গন্ধকে অপরাধের সঙ্গে যুক্ত করার প্রস্তাবও উঠেছিল।

তাই কোনো ঘ্রাণকে ভালো বা খারাপ বলার আগে সেই ধারণার উৎস নিয়েও প্রশ্ন তোলা প্রয়োজন বলে মনে করেন টালেট। কেন কোনো গন্ধকে অপছন্দ করা হচ্ছে এবং অন্য মানুষ সেটিকে কীভাবে দেখছেন—সেটিও বিবেচনা করা উচিত।

তার মতে, নিজেদের ঘ্রাণ-সংক্রান্ত পছন্দ ও ধারণা সম্পর্কে সচেতন হওয়ার পাশাপাশি অন্যের পছন্দের প্রতিও সহানুভূতিশীল হওয়া দরকার। ঘ্রাণকে মানুষের মধ্যে দূরত্ব তৈরির উপায় হিসেবে না দেখে মনোযোগ দিয়ে বোঝার চেষ্টা করলে নিজেদের ও অন্যদের সম্পর্কে আরও ভালো ধারণা পাওয়া সম্ভব।

ঘ্রাণের সঙ্গে নির্দিষ্ট সময় ও পরিবেশের স্মৃতিও গভীরভাবে জড়িয়ে থাকে। টালেটের ধারণা, ভবিষ্যতে একুশ শতকের ব্রিটেনকে হয়তো হাত জীবাণুমুক্ত করার স্যানিটাইজার, দাবানল ও দূষিত পানির ঘ্রাণ দিয়েও মনে রাখা হবে।

একসময় কাঠ পোড়ার ঘ্রাণ অনেকের মনে সুখস্মৃতি ফিরিয়ে আনলেও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ভবিষ্যতে একই ঘ্রাণ মানুষের মনে নস্টালজিয়ার বদলে ভয় বা উদ্বেগ তৈরি করতে পারে।

Advertisements