৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ | মঙ্গলবারবাংলা: ২৪ ভাদ্র ১৪৩৩
জীবনযাপন

মায়ের বুকের দুধ দিয়ে তৈরি অলঙ্কার, মাতৃত্বের স্মৃতি থাকবে অমলিন

মায়ের বুকের দুধ দিয়ে তৈরি অলঙ্কার, মাতৃত্বের স্মৃতি থাকবে অমলিন

সন্তানের প্রথম চুল, দুধের দাঁত কিংবা নাড়ি সংরক্ষণ করে রাখার চল বহু পুরোনো। শিশুর শৈশবের বিশেষ মুহূর্তগুলো স্মৃতি হিসাবে ধরে রাখতে অনেক মা-বাবাই এসব জিনিস যত্ন করে রেখে দেন। তবে সময়ের সঙ্গে সেই স্মৃতি ধরে রাখার ধরনেও এসেছে পরিবর্তন।

এখন কয়েক ফোঁটা মায়ের বুকের দুধ দিয়েই তৈরি হচ্ছে আংটি, লকেট, দুল, ব্রেসলেটসহ নানা ধরনের গহনা। ‘ব্রেস্ট মিল্ক জুয়েলারি’ নামে পরিচিত এই গয়না বিশ্বের বিভিন্ন দেশে জনপ্রিয় হওয়ার পাশাপাশি আমাদের দেশেও ধীরে ধীরে পরিচিতি পাচ্ছে।

মাতৃত্বের বিশেষ সময়কে স্মরণীয় করে রাখতেই মূলত এসব গয়না তৈরি করা হয়। মায়েরা নিজেদের পছন্দ অনুযায়ী নকশা ও অন্যান্য উপাদান যোগ করে গয়নাগুলো কাস্টমাইজও করতে পারছেন।

কীভাবে তৈরি হয় ব্রেস্ট মিল্ক জুয়েলারি?

এ ধরনের গহনা তৈরির জন্য মায়ের বুকের দুধ সংগ্রহের পর প্রথমে এর জলীয় অংশ কমিয়ে আনা হয়। এরপর বিশেষ প্রক্রিয়ায় দুধকে শুকিয়ে গুঁড়ো করা হয়।

পরবর্তী ধাপে এই গুঁড়ো একটি বিশেষ ধরনের রেজিনের সঙ্গে মেশানো হয়। মিশ্রণটি শক্ত হওয়ার পর সেটিকে আংটি, লকেট বা পাথরের মতো পছন্দের আকৃতি দেওয়া হয়। সবশেষে এর ওপর বিভিন্ন ধরনের ধাতব আবরণ বা অলংকারের কাজ করা হয়।

Advertisements

গহনা তৈরির পদ্ধতি ও ব্যবহৃত উপকরণ কারিগর বা প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভর করে ভিন্ন হতে পারে।

মায়ের কাছে কেন এত বিশেষ?

মাতৃত্বের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা স্মৃতি ধরে রাখাই এই গহনার মূল আকর্ষণ। ভারতের কলকাতার বাসিন্দা ৩০ বছর বয়সী শ্রেয়া প্রধান এক কন্যাসন্তানের মা। তিনি জানান, তার জন্য বুকের দুধ খাওয়ানোর সময়টা সহজ ছিল না। তবে সেই সময়ের কষ্টের পাশাপাশি ছিল গভীর আনন্দও।

সন্তান বড় হয়ে গেলে জীবনের সেই সময় আর ফিরে আসবে না। এই ভাবনা থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্রেস্ট মিল্ক জুয়েলারি দেখে একটি আংটি বানানোর সিদ্ধান্ত নেন তিনি। এখন নিয়মিত সেই আংটি পরেন।

বাড়ছে বাজার

দেশে এখন বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তি উদ্যোক্তা ব্রেস্ট মিল্ক জুয়েলারি তৈরি করছেন। অনলাইনেও এসব গহনা বিক্রি হচ্ছে। সাধারণত মায়ের বুকের দুধ জীবাণুমুক্ত ও মুখবন্ধ পাত্রে সংরক্ষণ করে কারিগরের কাছে পাঠাতে হয়। দাম নকশা, আকার, ব্যবহৃত ধাতু ও অন্যান্য উপকরণের ওপর নির্ভর করে। এসব গহনার দাম প্রায় ৫০০ টাকা থেকে শুরু করে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত হতে পারে।

নতুন নয় ধারণাটি

ব্রেস্ট মিল্ক জুয়েলারির ধারণা একেবারে নতুন নয়। পশ্চিমা দেশগুলোতে এক দশকেরও বেশি সময় ধরে বুকের দুধ ব্যবহার করে স্মারক গহনা তৈরির কাজ চলছে। আমাদের দেশে ঠিক কখন এই প্রবণতা শুরু হয়েছে, তার নির্দিষ্ট সময়রেখা স্পষ্ট নয়।

কেমন হতে পারে এই গয়না?

ব্রেস্ট মিল্ক জুয়েলারির নকশায় এখন বেশ বৈচিত্র এসেছে। মায়েরা নিজেদের পছন্দ ও সন্তানের স্মৃতির সঙ্গে মিলিয়ে গহনা তৈরি করাচ্ছেন।

আংটি: সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয় নকশাগুলোর মধ্যে রয়েছে ক্রাউন রিং, ওভাল স্টোন রিং ও হার্ট শেপ রিং। প্রতিদিন পরার সুবিধার কারণে আংটির চাহিদাও বেশি।

লকেট: ‘মিল্ক ড্রপ’ লকেট দেখতে অনেকটা এক ফোঁটা দুধের মতো। এ ছাড়া গোল, চৌকো ও ‘ট্রি অব লাইফ’ নকশাও ব্যবহার করা হয়।

দুল ও নাকফুল: ছোট স্টাড দুলের মধ্যে বুকের দুধের তৈরি পাথর বসানো যায়। কেউ কেউ নাকফুলও তৈরি করছেন।

ব্রেসলেট ও পেনডেন্ট: চার্ম ব্রেসলেটে ছোট বিড হিসেবে কিংবা পেনডেন্টে এই বিশেষ উপাদান ব্যবহার করা হচ্ছে।

বাবাদের জন্যও: শুধু মায়েদের জন্য নয়, বাবাদের জন্যও কাফলিঙ্ক, টাই-পিন কিংবা কী-রিংয়ের মতো স্মারক তৈরি করা হয়।

দুধের তৈরি পাথরে যোগ হচ্ছে নানা স্মৃতি

গহনার মূল পাথরটিকেও নানা উপায়ে বিশেষ করে তোলা যায়।

ক্লাসিক সাদা পাথর: শুধু বুকের দুধ ব্যবহার করে সাদা রঙের পাথর তৈরি করা হয়। দেখতে অনেকটা মুক্তোর মতো। সাধারণ ও ছিমছাম নকশা পছন্দ করেন যারা, তাদের জন্য এটি উপযোগী।

পার্ল শিমার: দুধের সঙ্গে পার্ল পিগমেন্ট মেশালে পাথরে মুক্তোর মতো ঝিলিক আসে।

শিশুর প্রথম চুল: সন্তানের প্রথম চুল সংরক্ষণ করে থাকলে তা ছোট করে কেটে দুধের তৈরি পাথরের মধ্যে রাখা যায়।

নাড়ির অংশ: সন্তানের জন্মের পর সংরক্ষণ করা নাড়ির শুকনো অংশও কিছু ক্ষেত্রে এই ধরনের স্মারকে ব্যবহার করা হয়। অনেক মায়ের কাছে এটি হয়ে উঠতে পারে আরও আবেগঘন স্মৃতি।

ফ্লেক ও গ্লিটার: কেউ কেউ সোনালি বা রুপালি ফ্লেক, গ্লিটার কিংবা রোজ গোল্ড ডাস্ট ব্যবহার করে পাথরটিকে আরও ঝলমলে করে তোলেন।

নাম বা আঙুলের ছাপ: সন্তানের নামের আদ্যক্ষর, হাতের বা পায়ের ছোট্ট ছাপও নকশার অংশ হিসেবে ব্যবহার করা যায়।

স্মৃতি যখন গয়নায়

ব্রেস্ট মিল্ক জুয়েলারি মূলত দামি অলংকারের চেয়ে স্মৃতির মূল্যকে গুরুত্ব দেয়। সন্তানের জন্ম ও বুকের দুধ খাওয়ানোর সময়টি অনেক মায়ের জীবনের অত্যন্ত আবেগঘন একটি অধ্যায়। সেই সময়ের কয়েক ফোঁটা দুধ যখন দীর্ঘস্থায়ী একটি স্মারকের রূপ নেয়, তখন গহনাটি হয়ে ওঠে সন্তানের শৈশবের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এক ব্যক্তিগত স্মৃতি।

ফ্যাশনের পাশাপাশি মাতৃত্বের এই বিশেষ অধ্যায়কে ধরে রাখার উপায় হিসেবে তাই বিশ্বের বিভিন্ন দেশে জনপ্রিয় হচ্ছে ব্রেস্ট মিল্ক জুয়েলারি।

Advertisements