৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ | শনিবারবাংলা: ২১ ভাদ্র ১৪৩৩
স্বাস্থ্য

লিভারে জমা চর্বি কমাতে প্রতিদিনের খাবারে আনুন এই পরিবর্তন

IMG_4482

ফ্যাটি লিভার এখন অনেকেরই পরিচিত স্বাস্থ্যসমস্যা। লিভারে চর্বি জমলে অনেকেই বিশেষ কোনো পানীয়, ডিটক্স ড্রিংক বা ঘরোয়া উপায়ে দ্রুত লিভার পরিষ্কার করার চেষ্টা করেন। তবে বাস্তবে ফ্যাটি লিভার কমানোর কোনো জাদুকরি পানীয় বা ঘরোয়া সমাধান নেই। রোগের কারণ নিয়ন্ত্রণ, স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত শরীরচর্চা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী ওজন কমানোই গুরুত্বপূর্ণ।

লিভারে অতিরিক্ত চর্বি জমার পেছনে অতিরিক্ত ওজন, টাইপ ২ ডায়াবেটিস, ইনসুলিন প্রতিরোধ, অস্বাস্থ্যকর খাবার, শারীরিক পরিশ্রমের অভাব ও অ্যালকোহল গ্রহণের মতো কারণ থাকতে পারে। অ্যালকোহল ছাড়া বিপাকীয় কারণে হওয়া ফ্যাটি লিভারকে বর্তমানে মেটাবলিক ডিসফাংশন-অ্যাসোসিয়েটেড স্টিয়াটোটিক লিভার ডিজিজ বা MASLD বলা হয়।

অনেক সময় ফ্যাটি লিভারে তেমন কোনো উপসর্গ দেখা যায় না। ফলে অন্য কোনো কারণে পরীক্ষা করতে গিয়ে রোগটি ধরা পড়ে। অতিরিক্ত ওজন থাকলে ধীরে ধীরে ওজন কমানো এ ক্ষেত্রে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। শরীরের মোট ওজনের অন্তত ৫ শতাংশ কমাতে পারলে লিভারের চর্বি কমতে পারে। ৭ থেকে ১০ শতাংশ ওজন কমানো হলে প্রদাহসহ রোগের আরও কিছু বৈশিষ্ট্যের উন্নতিও হতে পারে।

তবে দ্রুত ওজন কমানোর চেষ্টা না করে ধীরে ও নিয়ম মেনে ওজন কমানোই নিরাপদ। কঠোর ডায়েট বা দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকার মতো পদ্ধতি অনুসরণ করার আগে চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের পরামর্শ নেওয়া ভালো।

খাদ্যাভ্যাসেও আনতে হবে পরিবর্তন। মিষ্টি, কোমল পানীয়, চিনি দেওয়া চা-কফি ও অতিরিক্ত চিনি থাকা খাবার কমানো জরুরি। একই সঙ্গে অতিরিক্ত স্যাচুরেটেড ও ট্রান্স ফ্যাটযুক্ত ভাজাপোড়া, চর্বিযুক্ত মাংস ও প্রক্রিয়াজাত খাবার সীমিত করা উচিত।

এর পরিবর্তে মাছ, ডাল, শাকসবজি, ছোলা, পূর্ণ শস্য, বাদাম ও বীজের মতো খাবার খাদ্যতালিকায় বাড়ানো যেতে পারে। অ্যাভোকাডো, মাছ ও অন্যান্য অসম্পৃক্ত চর্বির উৎসও স্বাস্থ্যকর বিকল্প হতে পারে।

Advertisements

ফ্যাটি লিভার হয়েছে বলে ভাত পুরোপুরি বাদ দেওয়ার প্রয়োজন নেই। তবে সাদা ভাত ও অন্যান্য পরিশোধিত শর্করা পরিমাণমতো খেয়ে খাবারের সঙ্গে বেশি সবজি, ডাল ও প্রোটিন রাখা ভালো। সব ফলও বাদ দেওয়ার দরকার নেই; ফলের প্রাকৃতিক চিনি আর কোমল পানীয় বা মিষ্টি খাবারে যোগ করা চিনি এক নয়।

নিয়মিত শরীরচর্চাও ফ্যাটি লিভার নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ। হাঁটা, দ্রুত হাঁটা, সাইকেল চালানো, সাঁতারসহ অ্যারোবিক ব্যায়ামের পাশাপাশি পেশিশক্তি বাড়ানোর ব্যায়াম করা যেতে পারে। সাধারণভাবে প্রাপ্তবয়স্কদের সপ্তাহে অন্তত ১৫০ মিনিট মাঝারি মাত্রার শারীরিক কর্মকাণ্ডের লক্ষ্য রাখতে বলা হয়। যারা ব্যায়ামে অভ্যস্ত নন, তারা অল্প সময় দিয়ে শুরু করে ধীরে ধীরে সময় বাড়াতে পারেন।

অ্যালকোহল গ্রহণের ক্ষেত্রেও সতর্ক থাকা জরুরি। অ্যালকোহলজনিত ফ্যাটি লিভার থাকলে তা পুরোপুরি বন্ধ করার পরামর্শ দেওয়া হয়। অন্য ধরনের ফ্যাটি লিভার থাকলেও অ্যালকোহল এড়িয়ে চলা বা কমানো ভালো।

এদিকে ফ্যাটি লিভার দূর করার নামে বাজারে বিভিন্ন ডিটক্স ড্রিংক, হারবাল মিশ্রণ ও বিশেষ জুসের প্রচার থাকলেও এগুলোকে চিকিৎসা হিসেবে ধরে নেওয়া ঠিক নয়। লিভার নিজেই শরীরের বিভিন্ন রাসায়নিক পদার্থ প্রক্রিয়াজাত করে। তাই বিশেষ কোনো পানীয় দিয়ে লিভার ‘পরিষ্কার’ করার বদলে রোগের কারণ নিয়ন্ত্রণ করাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

ফ্যাটি লিভার ধরা পড়লেই নিজের ইচ্ছায় ওষুধ বা সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করাও উচিত নয়। কিছু ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সাপ্লিমেন্ট নিয়ে গবেষণা থাকলেও সেগুলোর উপকারিতা ও সম্ভাব্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া বিবেচনা করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন। কিছু ওষুধ বা হারবাল সাপ্লিমেন্ট উল্টো লিভারের ক্ষতিও করতে পারে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, শুধু ওজন কমলেই সবার ফ্যাটি লিভার পুরোপুরি সেরে যাবে—এমন নয়। কারও ক্ষেত্রে শুধু চর্বি জমে থাকতে পারে, আবার কারও লিভারে প্রদাহ বা ফাইব্রোসিসও দেখা দিতে পারে। দীর্ঘদিন অবহেলা করলে কিছু ক্ষেত্রে রোগ সিরোসিসসহ গুরুতর জটিলতার দিকে এগোতে পারে।

তাই ফ্যাটি লিভার ধরা পড়লে ডিটক্স পানীয় বা ঘরোয়া টোটকার ওপর নির্ভর না করে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পরীক্ষা, ফলোআপ এবং জীবনযাপনে পরিবর্তন আনা জরুরি। অতিরিক্ত চিনি ও ভাজাপোড়া কমানো, স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়া, পরিমিত কার্বোহাইড্রেট গ্রহণ, নিয়মিত ব্যায়াম এবং প্রয়োজন হলে ধীরে ধীরে ওজন কমানোই লিভারের চর্বি নিয়ন্ত্রণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

Advertisements