৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ | শনিবারবাংলা: ২১ ভাদ্র ১৪৩৩
স্বাস্থ্য

শিশুর কাশিতে সিরাপ কেনার আগে বোতলের এই তথ্যগুলো দেখুন

Main-1-1

শিশুর কাশি শুরু হলে দ্রুত আরাম দিতে অনেক বাবা-মা নিজেরাই কাশির সিরাপ কিনে খাওয়ান। কিন্তু শিশুদের ক্ষেত্রে কাশি বা সর্দির জন্য ব্যবহৃত সব ধরনের ওষুধ সমানভাবে নিরাপদ নয়। বয়স ও শারীরিক অবস্থার ওপর নির্ভর করে কোনো একটি ওষুধ উপকারী হতে পারে, আবার একই ওষুধ অন্য শিশুর জন্য ঝুঁকিপূর্ণও হতে পারে। বিশেষ করে বিভিন্ন কাশির সিরাপে একাধিক সক্রিয় উপাদান থাকায় একই সময়ে অন্য কোনো ওষুধ খাওয়ানো হলে অজান্তেই একই উপাদান দুইবার দেওয়ার আশঙ্কা থাকে। এতে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি মাত্রায় ওষুধ শরীরে প্রবেশ করতে পারে।

এ কারণে শিশুর জন্য কাশির সিরাপ কেনার সময় শুধু পরিচিত ব্র্যান্ডের নাম দেখলেই হবে না। বোতল বা প্যাকেটের গায়ে উল্লেখ করা সক্রিয় উপাদান, শিশুর বয়স অনুযায়ী ব্যবহারের নির্দেশনা এবং নির্ধারিত মাত্রা ভালোভাবে দেখে নেওয়া জরুরি। বিশেষজ্ঞরা শিশুদের কাশি ও সর্দির ওষুধে থাকা ডেক্সট্রোমেথরফান, কিছু ধরনের অ্যান্টিহিস্টামিন, অ্যালকোহল, প্যারাসিটামল বা আইবুপ্রোফেন এবং কোডিনের মতো উপাদান ব্যবহারের ক্ষেত্রে বিশেষ সতর্ক থাকার পরামর্শ দেন।

যুক্তরাষ্ট্রের ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন বা এফডিএ জানিয়েছে, একই সক্রিয় উপাদান রয়েছে এমন একাধিক ওষুধ একসঙ্গে খাওয়ালে কিংবা নির্ধারিত মাত্রার বেশি ওষুধ দিলে শিশুর ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। অন্যদিকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, শিশুদের শ্বাসতন্ত্রে হওয়া বেশিরভাগ সংক্রমণ সময়ের সঙ্গে নিজে থেকেই ভালো হয়ে যায়। সাধারণ ভাইরাসজনিত সর্দি-কাশির ক্ষেত্রে ওষুধ ব্যবহার করে উল্লেখযোগ্য উপকার পাওয়ার প্রমাণও অনেক ক্ষেত্রে সীমিত।

কাশির সিরাপে ব্যবহৃত একটি পরিচিত উপাদান হলো ডেক্সট্রোমেথরফান। এটি মস্তিষ্কের কাশি নিয়ন্ত্রণকারী অংশে কাজ করে কাশির প্রবণতা কমাতে সাহায্য করে। বিভিন্ন ধরনের কাশির ওষুধে এই উপাদান পাওয়া যায়। তবে শিশুদের সাধারণ ভাইরাসজনিত কাশিতে এটি কতটা কার্যকর, তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই প্রশ্ন রয়েছে। ‘পেডিয়াট্রিক্স’ জার্নালে প্রকাশিত ১০০ শিশুকে নিয়ে পরিচালিত একটি গবেষণায় দেখা যায়, রাতে কাশি কমানো কিংবা ঘুমের মান উন্নত করার ক্ষেত্রে ডেক্সট্রোমেথরফান বা ডাইফেনহাইড্রামিন—কোনোটিই প্লাসিবোর তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি কার্যকর ছিল না। যদিও পরবর্তী কিছু গবেষণায় ৬ থেকে ১১ বছর বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রে ডেক্সট্রোমেথরফানের কিছু উপকারের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। তাই শিশুর বয়স, কাশির ধরন ও অন্যান্য উপসর্গ বিবেচনা করে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী এ ধরনের ওষুধ ব্যবহার করা উচিত। কাশি বেড়ে গেলেই নিজের সিদ্ধান্তে ওষুধের মাত্রা বাড়িয়ে দেওয়া নিরাপদ নয়।

কিছু কাশি ও সর্দির ওষুধে প্রোমেথাজিন ও ডাইফেনহাইড্রামিনের মতো অ্যান্টিহিস্টামিনও থাকতে পারে। এসব উপাদানের কারণে শিশুর তন্দ্রা বা অতিরিক্ত ঘুম ঘুম ভাব দেখা দিতে পারে। কিন্তু ওষুধ খেয়ে শিশু ঘুমিয়ে পড়েছে মানেই তার কাশি কমেছে বা অসুস্থতা ভালো হচ্ছে—এমনটি ধরে নেওয়া ঠিক নয়। বিশেষ করে খুব অল্প বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রে এসব ওষুধের ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি। যুক্তরাষ্ট্রের এফডিএ দুই বছরের কম বয়সী শিশুদের অ্যান্টিহিস্টামিন বা ডিকনজেস্ট্যান্টযুক্ত সর্দি-কাশির ওষুধ ব্যবহারের বিষয়ে সতর্ক করেছে। এসব ওষুধ ব্যবহারের পর শিশুদের গুরুতর এমনকি জীবনহানিকর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার ঘটনাও নথিভুক্ত হয়েছে।

অভিভাবকদের আরও একটি বিষয় খেয়াল রাখা দরকার, কিছু তরল ওষুধ তৈরিতে দ্রাবক বা সহায়ক উপাদান হিসেবে ইথানল বা অ্যালকোহল ব্যবহার করা হয়। ফলে শিশুকে একাধিক ওষুধ দেওয়ার প্রয়োজন হলে প্রতিটি ওষুধের লেবেল পরীক্ষা করা গুরুত্বপূর্ণ। ইউরোপীয় মেডিসিনস এজেন্সির তথ্য অনুযায়ী, অ্যালকোহলযুক্ত ওষুধ ছোট শিশুদের শরীরে প্রভাব ফেলতে পারে। একাধিক অ্যালকোহলযুক্ত ওষুধ একসঙ্গে দেওয়া হলে শরীরে অ্যালকোহলের পরিমাণ বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কাও থাকে। তবে কোনো ওষুধে অল্প পরিমাণ অ্যালকোহল থাকলেই সেটি প্রতিটি শিশুর জন্য বিপজ্জনক—এমন নয়। এক্ষেত্রে শিশুর বয়স, ওজন এবং ওষুধে থাকা অ্যালকোহলের পরিমাণ বিবেচনা করা প্রয়োজন।

Advertisements

কাশি ও সর্দির কিছু ওষুধে আবার জ্বর বা ব্যথা কমানোর উপাদানও যুক্ত থাকতে পারে। এর মধ্যে প্যারাসিটামল বা নির্দিষ্ট কিছু ফর্মুলেশনে আইবুপ্রোফেন থাকতে পারে। সমস্যা দেখা দিতে পারে তখনই, যখন একই উপাদান আলাদা ওষুধ হিসেবেও শিশুকে দেওয়া হয়। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, কাশির সিরাপে যদি প্যারাসিটামল থাকে এবং একই সময়ে জ্বর কমানোর জন্য শিশুকে আলাদা প্যারাসিটামল খাওয়ানো হয়, তাহলে অজান্তেই নির্ধারিত মাত্রার বেশি প্যারাসিটামল দেওয়া হয়ে যেতে পারে। তাই কোনো কাশির সিরাপ দেওয়ার আগে সেটিতে প্যারাসিটামল, আইবুপ্রোফেন কিংবা অন্য কোনো জ্বর ও ব্যথা কমানোর উপাদান রয়েছে কি না, তা অবশ্যই পরীক্ষা করে নেওয়া উচিত।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো কোডিন। এটি ওপিওয়েড শ্রেণির একটি ওষুধ এবং শরীরে গিয়ে মরফিনে রূপান্তরিত হয়। তবে প্রত্যেক মানুষের শরীরে কোডিন একইভাবে ভাঙে না। কারও শরীরে বেশি পরিমাণ মরফিন তৈরি হতে পারে, যার ফলে গুরুতর শ্বাসকষ্টের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। এ কারণেই শিশুদের ক্ষেত্রে কোডিন ব্যবহারে বিশেষ সতর্কতা প্রয়োজন। ইউরোপীয় মেডিসিনস এজেন্সি ১২ বছরের কম বয়সী শিশুদের কাশি ও সর্দির চিকিৎসায় কোডিনযুক্ত ওষুধ ব্যবহার না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। শিশুদের কাশি কমাতে কোডিন কতটা কার্যকর, সে বিষয়েও শক্তিশালী প্রমাণ খুব বেশি নেই।

শিশুদের কাশি ও সর্দির ওষুধ ব্যবহারের ক্ষেত্রে সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন দেশে নিয়ম আরও কঠোর করা হয়েছে। ক্লোরফেনিরামিন ম্যালেট ও ফিনাইলেফ্রিন হাইড্রোক্লোরাইডের নির্দিষ্ট মাত্রার সংমিশ্রণ এবং চার বছরের কম বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রে এসব উপাদানযুক্ত ওষুধ ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা বা সতর্কতা জারি করা হয়েছে। এসব ওষুধের লেবেল, প্যাকেজ ইনসার্ট ও প্রচারসামগ্রীতে চার বছরের কম বয়সী শিশুদের জন্য ব্যবহার না করার সতর্কবার্তা উল্লেখ করাও বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এখানে ক্লোরফেনিরামিন একটি অ্যান্টিহিস্টামিন এবং ফিনাইলেফ্রিন একটি ডিকনজেস্ট্যান্ট হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

শিশুকে কাশির ওষুধ দেওয়ার ক্ষেত্রে চিকিৎসকদের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ হলো—সবচেয়ে শক্তিশালী ওষুধই যে সবচেয়ে নিরাপদ, তা নয়। শিশুর বয়স, ওজন, শারীরিক অবস্থা এবং কাশির কারণ অনুযায়ী সঠিক ওষুধ ও সঠিক মাত্রা নির্ধারণ করাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তাই শুধু পরিচিত কোনো ব্র্যান্ডের ওপর নির্ভর না করে ওষুধের সক্রিয় উপাদান এবং ব্যবহারের নির্দেশনা পড়ার অভ্যাস করা উচিত। বিশেষ করে নবজাতক, একেবারে ছোট শিশু ও টডলারদের ক্ষেত্রে কাশি বা সর্দির ওষুধ দেওয়ার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

সাধারণ ভাইরাসজনিত সর্দি-কাশির ক্ষেত্রে অনেক সময় আলাদা ওষুধের প্রয়োজন নাও হতে পারে। পর্যাপ্ত তরল পান করানো, নাক বন্ধ থাকলে স্যালাইন নেজাল ড্রপ ব্যবহার এবং ঘরের বাতাসে প্রয়োজনীয় আর্দ্রতা বজায় রাখার মতো সহায়ক ব্যবস্থা শিশুর অস্বস্তি কমাতে সাহায্য করতে পারে। কারণ কাশি নিজে কোনো রোগ নয়, এটি সাধারণত শরীরের একটি উপসর্গ বা প্রতিরক্ষামূলক প্রতিক্রিয়া। তাই প্রতিটি কাশি হলেই সেটিকে ওষুধ দিয়ে বন্ধ করার প্রয়োজন নেই।

সবশেষে, শিশুকে কাশির সিরাপ দেওয়ার আগে বোতলের গায়ে থাকা সক্রিয় উপাদান, বয়সসীমা এবং নির্ধারিত মাত্রা ভালোভাবে দেখে নেওয়া উচিত। একই উপাদান শিশুকে দেওয়া অন্য কোনো ওষুধে রয়েছে কি না, সেটিও যাচাই করা প্রয়োজন। বিশেষ করে অল্প বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রে নিজের সিদ্ধান্তে কাশি বা সর্দির ওষুধ না দিয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ পদ্ধতি।

Advertisements