বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনবুধবার, ২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
স্বাস্থ্য

রাতে জ্বর, দিনে সুস্থ- কখন চিন্তার কারণ?

FV

দিনভর শরীর বেশ ভালোই থাকে। কাজকর্মেও তেমন সমস্যা হয় না। কিন্তু সন্ধ্যা নামার পর থেকেই শরীরটা কেমন যেন ম্যাজম্যাজ করতে শুরু করে। ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে শরীরের তাপমাত্রা। রাতে জ্বরে ঘুম ভেঙে যায়, শরীরে আসে দুর্বলতা ও অস্বস্তি। অথচ সকাল হলেই অনেকটা স্বাভাবিক লাগে।

শুধু রাতে জ্বর আসার বিষয়টি অনেকেই খুব একটা গুরুত্ব দেন না। কয়েক দিন জ্বরের ওষুধ খেলেই যখন কমে যায়, তখন মনে হয় সমস্যাও বুঝি শেষ। কিন্তু বারবার এমন হলে বিষয়টি অবহেলা করা ঠিক নয়। কারণ রাতের জ্বর নিজে কোনো নির্দিষ্ট রোগ নয়; বরং এটি শরীরে থাকা কোনো সংক্রমণ বা অন্য সমস্যার একটি উপসর্গ হতে পারে।

রাতে জ্বর কেন বাড়ে?

মানুষের শরীরের তাপমাত্রা স্বাভাবিকভাবেই দিনভর কিছুটা ওঠানামা করে। সাধারণত সন্ধ্যা ও রাতে শরীরের তাপমাত্রা দিনের তুলনায় সামান্য বেশি থাকতে পারে। অসুস্থতার ক্ষেত্রে এই স্বাভাবিক পরিবর্তনের সঙ্গে শরীরের রোগপ্রতিরোধী ব্যবস্থার কার্যক্রম যুক্ত হয়ে জ্বর রাতে বেশি অনুভূত হতে পারে। কোনো সংক্রমণ হলে শরীরের রোগপ্রতিরোধী ব্যবস্থা জীবাণুর বিরুদ্ধে কাজ শুরু করে। এ সময় বিভিন্ন রাসায়নিক উপাদান নিঃসৃত হয়, যা মস্তিষ্কের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের প্রক্রিয়ায় প্রভাব ফেলে। ফলে শরীরের তাপমাত্রা বেড়ে জ্বর দেখা দিতে পারে।

দিনের ব্যস্ততায় জ্বরের কিছু উপসর্গ তুলনামূলক কম অনুভূত হলেও রাতে বিশ্রামের সময় শরীরের অস্বস্তি, কাঁপুনি, শরীর ব্যথা বা গরম লাগার বিষয়টি বেশি স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

সংক্রমণ হতে পারে অন্যতম কারণ

Advertisements

রাতে বারবার জ্বর আসার পেছনে বিভিন্ন ধরনের সংক্রমণ থাকতে পারে। বিশেষ করে দীর্ঘস্থায়ী বা নির্দিষ্ট কিছু ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণের ক্ষেত্রে এমন উপসর্গ দেখা যেতে পারে। যক্ষ্মার মতো রোগে দীর্ঘদিন ধরে সন্ধ্যা বা রাতে জ্বর, রাতে অতিরিক্ত ঘাম, ওজন কমে যাওয়া, ক্ষুধামন্দা কিংবা দীর্ঘস্থায়ী কাশির মতো উপসর্গ থাকতে পারে। আবার হৃদপিণ্ডের ভেতরের আবরণ বা ভালভে সংক্রমণ—যাকে এন্ডোকার্ডাইটিস বলা হয়—সেখানেও দীর্ঘস্থায়ী জ্বর দেখা দিতে পারে।
তবে শুধু রাতে জ্বর হচ্ছে বলেই কারও যক্ষ্মা বা এন্ডোকার্ডাইটিস হয়েছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাবে না। রোগ নির্ণয়ের জন্য অন্যান্য উপসর্গ, শারীরিক পরীক্ষা এবং প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা জরুরি।

শরীরে জীবাণুর প্রতিক্রিয়াতেও জ্বর

জ্বর মূলত শরীরের একটি প্রতিরোধমূলক প্রতিক্রিয়া। ব্যাকটেরিয়া বা অন্য জীবাণুর কিছু উপাদান শরীরে প্রবেশ করলে সেগুলো রোগপ্রতিরোধী ব্যবস্থাকে সক্রিয় করতে পারে। এ ধরনের জ্বর সৃষ্টিকারী উপাদানকে পাইরোজেন বলা হয়।
শরীর এসব সংকেতের প্রতিক্রিয়ায় তাপমাত্রা বাড়িয়ে দেয়। ফলে সংক্রমণের সময় জ্বর দেখা দিতে পারে। তাই জ্বরকে শুধু একটি বিরক্তিকর উপসর্গ হিসেবে না দেখে এর পেছনে থাকা কারণটিও খুঁজে দেখা গুরুত্বপূর্ণ।

স্ট্রেস ও ক্লান্তির ভূমিকা কতটা?

অতিরিক্ত মানসিক চাপ, ঘুমের ঘাটতি ও দীর্ঘদিনের ক্লান্তি শরীরের স্বাভাবিক কার্যক্রমে প্রভাব ফেলতে পারে। অনেক সময় এসব কারণে শরীর গরম লাগা বা অসুস্থ বোধ হতে পারে। তবে স্ট্রেসকে সব ধরনের রাতের জ্বরের কারণ হিসেবে ধরে নেওয়া ঠিক নয়। থার্মোমিটারে বারবার জ্বরের তাপমাত্রা উঠলে এর প্রকৃত কারণ খুঁজে দেখা প্রয়োজন। শুধু মানসিক চাপের কারণে হচ্ছে ভেবে বিষয়টি এড়িয়ে গেলে কোনো অন্তর্নিহিত রোগের চিকিৎসা দেরি হতে পারে।

ওষুধ বা অ্যালার্জির প্রতিক্রিয়াও হতে পারে

কিছু ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় জ্বর হতে পারে। আবার নির্দিষ্ট কোনো উপাদানের প্রতি শরীরের অতিসংবেদনশীল প্রতিক্রিয়াও জ্বরের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে। নতুন কোনো ওষুধ শুরু করার পর থেকে যদি বারবার জ্বর দেখা দেয়, তাহলে নিজের মতো করে ওষুধ বন্ধ বা পরিবর্তন না করে চিকিৎসকের সঙ্গে বিষয়টি আলোচনা করা উচিত।

ত্বকের সংক্রমণও বাদ দেওয়া যাবে না

শরীরের কোথাও ব্যাকটেরিয়াজনিত বা অন্য ধরনের সংক্রমণ থাকলেও জ্বর হতে পারে। ত্বকে দীর্ঘদিনের ক্ষত, ফোঁড়া, পুঁজ বা সংক্রমণ থাকলে সেটিও জ্বরের সম্ভাব্য কারণ হতে পারে। তাই রাতের জ্বরের সঙ্গে শরীরের কোথাও লালচে হয়ে যাওয়া, ফুলে যাওয়া, ব্যথা বা পুঁজের মতো লক্ষণ থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

কখন সতর্ক হবেন?

এক-দুই দিন হালকা জ্বর হলেই আতঙ্কিত হওয়ার প্রয়োজন নেই। কিন্তু কয়েক দিন ধরে একই সময়ে জ্বর ফিরে আসা, জ্বরের সঙ্গে অস্বাভাবিক ওজন কমে যাওয়া, রাতে অতিরিক্ত ঘাম, দীর্ঘস্থায়ী কাশি, শ্বাসকষ্ট, ক্ষুধামন্দা, অতিরিক্ত দুর্বলতা কিংবা শরীরের কোথাও দীর্ঘস্থায়ী সংক্রমণ থাকলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিত। উচ্চ জ্বরের সঙ্গে বিভ্রান্তি, অস্বাভাবিক আচরণ, প্রলাপ, শ্বাসকষ্ট, খিঁচুনি বা পানিশূন্যতার লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়াপ্রয়োজন।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—জ্বর কমে গেলেই যে এর কারণও সেরে গেছে, এমন নয়। বারবার রাতে জ্বর ফিরে এলে শুধু জ্বরের ওষুধ খেয়ে উপসর্গ চাপা না দিয়ে কেন এমন হচ্ছে, সেটি খুঁজে বের করাই বুদ্ধিমানের কাজ। প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসক রক্ত পরীক্ষা, প্রস্রাব পরীক্ষা, বুকের পরীক্ষা বা অন্যান্য পরীক্ষা দিতে পারেন।

রাতের জ্বর তাই সবসময় ভয়াবহ কোনো রোগের লক্ষণ নয়। তবে এটি যদি বারবার ফিরে আসে বা অন্য কোনো উপসর্গের সঙ্গে থাকে, তাহলে শরীরের এই সংকেতকে অবহেলা না করাই ভালো।

Advertisements