হাতে খবরের কাগজ, চোখে বাঁচার স্বপ্ন নিয়ে ৩৫ বছর ধরে ছুটছেন নার্গিস

সিরাজগঞ্জের কাজিপুরে দীর্ঘ ৩৫ বছর ধরে পায়ে হেঁটে সংবাদপত্র বিক্রি করছেন পঞ্চাশোর্ধ্ব নার্গিস খাতুন। এক সময় সামাজিক প্রতিকূলতা আর পারিবারিক অবহেলার শিকার এই নারী আজ স্বনির্ভরতার এক অনন্য প্রতীক। প্রতিকূল জীবনকে জয় করে হকার হিসেবে পত্রিকা বিক্রি করেই তিনি নিজের থাকার আবাসন গড়েছেন, সচল রাখছেন সংসারের চাকা।
কাজিপুর উপজেলার পাঁচগাছি গ্রামের আব্বাস আলীর মেয়ে নার্গিসের জীবনসংগ্রাম শুরু হয় নব্বইয়ের দশকের শুরুতে। কিশোরী বয়সে বিয়ে হলেও সতীনের সংসারে বনিবনা না হওয়ায় ১৯৯০ সালে বিচ্ছেদ ঘটে। কোলে শিশু সন্তান নিয়ে বাবার বাড়িতে আশ্রয় নিতে চাইলেও ভাইদের আপত্তিতে সেখানে জায়গা হয়নি তার। ঘোর সংকটে পড়া নার্গিস তখন অন্যের করুণার ওপর নির্ভর না করে বেছে নেন সংবাদপত্র বিক্রির মতো চ্যালেঞ্জিং পেশা।
শুরুতে প্রতিকূলতা থাকলেও হার মানেননি তিনি। বর্তমানে প্রতিদিন দেড় থেকে দুইশ কপি পত্রিকা বিক্রি করেন তিনি। সকাল হলেই কাজিপুরের অলিতে-গলিতে খবরের কাগজ হাতে ঘুরে বেড়ান এই সংগ্রামী নারী। দীর্ঘদিনের এই আয়ে কোনোমতে সংসার চালানোর পাশাপাশি সঞ্চয় করা অর্থ দিয়ে গ্রামে ৫ শতক জমি কিনে নিজের মাথা গোঁজার ঠাঁই করেছেন তিনি। বর্তমানে ছেলে, পুত্রবধূ ও নাতনিকে নিয়ে তার পরিবার।
পত্রিকা বিক্রির আগে অন্যের বাড়িতে কাজ করা এবং কাঁথা সেলাইয়ের চেষ্টা করেছিলেন নার্গিস। তবে শ্রমের সঠিক মজুরি না পাওয়ায় তিনি স্বাধীন এই পেশায় থিতু হন। বয়স বাড়ার কারণে আগের মতো শারীরিক শক্তি না থাকলেও জীবিকার তাগিদে প্রতিদিন কয়েক মাইল পথ পাড়ি দেন তিনি। আত্মপ্রত্যয়ী এই নারী জীবনের শেষদিন পর্যন্ত এই পেশাতেই থাকতে চান।
নার্গিস খাতুন তার কষ্টের কথা জানিয়ে বলেন, ‘স্বামীর সঙ্গে বিচ্ছেদের পর কারো ওপর বোঝা হতে চাইনি। মজুরি বৈষম্যের কারণে আগের কাজ ছেড়ে কাগজ বিক্রি শুরু করি। এখন বয়স হয়েছে, আগের মতো হাঁটতে কষ্ট হয়, তবু পেটের দায়ে কাজ করছি।’
নার্গিস খাতুন যখন পত্রিকা বিক্রি শুরু করেন, তখন নারী হকার হিসেবে কাজ করা সামাজিকভাবে বেশ কঠিন ছিল। নারীদের ঘরবন্দি থাকার মানসিকতার বিপরীতে গিয়ে তিনি প্রমাণ করেছেন যে ধৈর্য এবং পরিশ্রম থাকলে একজন নারীও আত্মনির্ভরশীল হতে পারেন। কাজিপুর এলাকার মানুষের কাছে তিনি এখন পরিশ্রমী ও সংগ্রামী মানুষের এক অনুপ্রেরণার নাম।



