বিমান দুর্ঘটনার এক বছর: ট্রমা কাটেনি মাইলস্টোনের শিক্ষার্থীদের

আজ (২১ জুলাই) উত্তরার দিয়াবাড়ীর মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে ঘটে যাওয়া ভয়াবহ বিমান দুর্ঘটনার এক বছর পূর্ণ হলো। গত বছরের এই দিনে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর একটি প্রশিক্ষণ বিমান শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির হায়দার আলী একাডেমিক ভবনে বিধ্বস্ত হলে প্রাণ হারান ৩৫ জন। নিহতদের মধ্যে ছিলেন ২৮ জন শিক্ষার্থী, তিনজন শিক্ষক, তিনজন অভিভাবক এবং বিমানের একজন পাইলট। এ ঘটনায় আহত হন ১৭৫ জন, যার মধ্যে ৬৩ জনই ছিলেন শিক্ষার্থী।

এক বছর পেরিয়ে গেলেও সেই ভয়াবহ দিনের স্মৃতি এখনো তাড়া করে ফিরছে অনেক শিক্ষার্থীকে। দীর্ঘ চিকিৎসার পর তারা ক্লাসে ফিরলেও অধিকাংশই স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেনি। অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে যাওয়া কোমলমতি শিশুদের মনে এখনো রয়ে গেছে ভয়, শূন্যতা আর প্রিয় বন্ধুদের হারানোর বেদনা। আকাশ থেকে ধেয়ে আসা আগুনের লেলিহান শিখা, চারপাশের আর্তনাদ এবং চোখের সামনে ঘটে যাওয়া বিভীষিকাময় দৃশ্য তাদের মানসিকতায় গভীর ক্ষত তৈরি করেছে।
অভিভাবকদের ভাষ্য, দুর্ঘটনার পর থেকে অনেক শিশুই আগের মতো নেই। তারা অল্পতেই রেগে যায়, সবকিছুতে বিরক্তি প্রকাশ করে এবং আকাশে বিমানের শব্দ শুনলেই আতঙ্কিত হয়ে কান চেপে ধরে। অনেকের পড়াশোনায় মনোযোগ কমে গেছে, আবার কেউ মাঝরাতে দুঃস্বপ্ন দেখে কেঁদে ওঠে। মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ধরনের ভয়াবহ দুর্ঘটনার পর শিশুদের মধ্যে গভীর ট্রমা তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। কেবল শারীরিক চিকিৎসা নয়, তাদের সুস্থ জীবনে ফিরিয়ে আনতে দীর্ঘমেয়াদি মানসিক পুনর্বাসন ও নিয়মিত কাউন্সেলিং অত্যন্ত জরুরি।

যারা সেই দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন, তাদের শোকে এখনো কাঁদেন পরিবার, সহপাঠী ও শিক্ষকরা। অন্যদিকে, যারা বেঁচে ফিরেছেন, তাদের অনেকেই এখনো এক অজানা আতঙ্ক নিয়ে দিন কাটাচ্ছেন। দুর্ঘটনায় আহত ষষ্ঠ শ্রেণির (ইংরেজি ভার্সন) শিক্ষার্থী জাইয়ানা মাহবুবের মা সানজিদা বেলায়েত জানান, তার মেয়ের আচরণ দিন দিন আরও অস্বাভাবিক হয়ে উঠছে। প্রায়ই সে বলে, ‘মরে গেলে ভালো হতো’। হঠাৎ করেই রেগে যায়, ছোটখাটো বিষয়েও বিরক্ত হয় এবং প্রায় প্রতিদিন ঘুমের মধ্যে কেঁদে ওঠে। সে বারবার জানতে চায়, কেন সেদিন সে মারা গেল না।
সানজিদা বেলায়েত বলেন, তার মেয়েটি আগে খুব পরিপাটি ছিল। হাতে মেহেদি দিত, ব্রেসলেট পরতে ভালোবাসত। কিন্তু দুর্ঘটনায় তার হাত পুড়ে গেছে। এখন সে নিজের হাতকে “জম্বির হাত” বলে উল্লেখ করে। সন্তানের এমন প্রশ্নের জবাব কীভাবে দেবেন, তা তিনি জানেন না। তিনি বলেন, এই শিশুদের ভবিষ্যৎ নিয়ে তাদের পরিবার গভীর উদ্বেগে রয়েছে। পাশাপাশি আহতদের উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে পাঠানোরও দাবি জানান তিনি।

দুর্ঘটনার পর আহতদের বিনা মূল্যে চিকিৎসাসেবা দেওয়া হলেও এখন পর্যন্ত নিহত কিংবা আহতদের পরিবার সরকারের কাছ থেকে কোনো আর্থিক ক্ষতিপূরণ পায়নি। অন্তর্বর্তী সরকার নিহতদের পরিবারকে ২০ লাখ এবং আহতদের ৫ লাখ টাকা দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিল। তবে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো এই সহায়তাকে অপর্যাপ্ত বলে প্রত্যাখ্যান করে।
সানজিদা বেলায়েত জানান, গত ১৭ জুন ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য লিখিত আবেদন করা হলেও এখনো সেই সাক্ষাৎ হয়নি। এর আগে গত ২১ জানুয়ারি বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে তারা সাক্ষাৎ করেন। সে সময় তারেক রহমান সরকার গঠন করতে পারলে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করার আশ্বাস দেন।
তার ভাষায়, দুর্ঘটনার এক বছর পার হলেও ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য এখনো কোনো কার্যকর পুনর্বাসন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হয়নি। অনেক আহত শিশু এখনো দগ্ধজনিত জটিলতা, একাধিক প্লাস্টিক সার্জারি এবং দীর্ঘমেয়াদি মানসিক ট্রমার কারণে স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারছে না।

প্রধানমন্ত্রীর কাছে দেওয়া আবেদনে শহীদ ও আহত পরিবারের পক্ষ থেকে চার দফা দাবি জানানো হয়েছে। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে—নিহতদের পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং আহতদের চিকিৎসা ব্যয়ের জন্য পর্যাপ্ত আর্থিক ক্ষতিপূরণ প্রদান ও হাইকোর্টের রিট দ্রুত বাস্তবায়ন; আহতদের আজীবন বিনা মূল্যে চিকিৎসাসেবা এবং সম্মিলিত সামরিক হাসপাতাল (সিএমএইচ) থেকে বিশেষ মেডিক্যাল কার্ড প্রদান; নিহতদের রাষ্ট্রীয়ভাবে শহীদের মর্যাদা ও সনদ দেওয়া; এবং প্রতি বছরের ২১ জুলাইকে ‘জাতীয় শিক্ষা শোক দিবস’ ঘোষণা করে উত্তরায় শহীদদের স্মরণে একটি মসজিদ নির্মাণ।
দুর্ঘটনায় আহত পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী নূরে জান্নাত ইউসার শরীরের প্রায় ১০ শতাংশ পুড়ে যায়। দুর্ঘটনার পরদিন তাকে জাতীয় বার্ন ইনস্টিটিউটে ভর্তি করা হয় এবং কয়েক সপ্তাহ চিকিৎসা শেষে বাড়ি ফেরে। বর্তমানে সে নিয়মিত ক্লাস করছে। তবে ইউসা জানায়, একসময় তার স্বপ্ন ছিল পাইলট হওয়ার। কিন্তু এখন আকাশে বিমান উড়তে দেখলেই সে ভয় পেয়ে দুই হাত দিয়ে কান চেপে ধরে। সেই স্বপ্নও আর নেই।
দুর্ঘটনার দিনটি ছিল একটি সাধারণ শিক্ষাদিবস। ২০২৫ সালের ২১ জুলাই সোমবার দুপুর পর্যন্ত সবকিছু স্বাভাবিকভাবেই চলছিল। শিক্ষার্থীরা ক্লাস করছিল, কেউ পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছিল। দুপুর ১টায় ছুটি হয়। এর কিছুক্ষণ পর, বেলা ১টা ৬ মিনিটে বিমান বাহিনীর এফ-৭ বিজিআই প্রশিক্ষণ বিমানটি ঢাকার বিমান বাহিনী ঘাঁটি বীর উত্তম এ কে খন্দকার থেকে উড্ডয়ন করে। মাত্র ১২ মিনিট পর, বেলা ১টা ১৮ মিনিটে সেটি মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের হায়দার আলী একাডেমিক ভবনে বিধ্বস্ত হয়।
মুহূর্তের মধ্যেই পুরো এলাকা আগুন, ধোঁয়া, ধুলো, চিৎকার আর কান্নায় ভারী হয়ে ওঠে। শিক্ষার্থীরা প্রাণ বাঁচাতে দিগ্বিদিক ছুটতে থাকে। বিধ্বস্ত বিমানটি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভবনের সিঁড়ির সামনে গিয়ে আঘাত করে এবং এর দুই ডানার আগুনে শিশুদের দুটি শ্রেণিকক্ষ সম্পূর্ণ পুড়ে যায়।

দশম শ্রেণির এক শিক্ষার্থী বলেন, পরীক্ষা দিয়ে বের হওয়ার পরই তিনি দেখেন আগুনে জ্বলতে থাকা বিমানটি ভবনে আঘাত করছে। তার চোখের সামনেই এক বন্ধু মারা যায়। সেই দৃশ্য এখনো তিনি ভুলতে পারেননি। একইভাবে একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী হাসবিয়া রহমান আঝরা জানান, বিকট শব্দ, আগুনে দগ্ধ মানুষ এবং শিশুদের আর্তনাদের দৃশ্য এখনো তাকে তাড়িয়ে বেড়ায়। বিমানের শব্দ শুনলেই সেই দিনের স্মৃতি ফিরে আসে।
শিক্ষার্থীদের মানসিক ট্রমা কাটিয়ে তুলতে বিভিন্ন সামাজিক ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানও উদ্যোগ নিয়েছে। রোটারি ক্লাব অব বনানী ঢাকা এবং ছুটি রিসোর্টের যৌথ উদ্যোগে গাজীপুরের পুবাইলে ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষার্থীদের নিয়ে বিশেষ ‘মেন্টাল হিলিং’ কর্মসূচি আয়োজন করা হয়। সেখানে শিক্ষার্থীদের প্রকৃতির কাছাকাছি নিয়ে গিয়ে মেডিটেশন, ছবি আঁকা, ফুটবল খেলা এবং উন্মুক্ত কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা করা হয়। নিহত সহপাঠীদের স্মরণে চারাগাছও রোপণ করা হয়, যাতে শোককে ইতিবাচক শক্তিতে রূপান্তর করা যায়।

এদিকে দুর্ঘটনার এক বছর পূর্তি উপলক্ষে নিহতদের স্মরণ এবং আহতদের সুস্থতা কামনায় সোমবার মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের দিয়াবাড়ী ক্যাম্পাসে দোয়া ও স্মরণসভার আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানে শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকেরা অংশ নেন। কলেজটির অধ্যক্ষ জাহাঙ্গীর আলম খান বলেন, শিক্ষার্থীরা তাদের হারিয়ে যাওয়া বন্ধুদের স্মরণ করতে এবং সবার আত্মার মাগফিরাত কামনা করতে একত্রিত হয়েছে। একই সঙ্গে আহতদের দ্রুত সুস্থতার জন্য দোয়া করা হয়েছে।
এ ছাড়া নিহতদের স্মরণ এবং আহতদের প্রতি সংহতি জানাতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি দুই দিনের কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। এর অংশ হিসেবে আজ মঙ্গলবার দুর্ঘটনাস্থল সবার জন্য উন্মুক্ত রাখা হয়েছে। সেখানে স্কাউট ও রোভার সদস্যরা গার্ড অব অনার প্রদান করবেন। ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন, এক মিনিট নীরবতা পালন, দোয়া, স্মৃতিচারণ এবং নিহতদের ছবি ও সহপাঠীদের লেখা স্মৃতিচারণমূলক বার্তা প্রদর্শনের আয়োজন থাকবে। আজকের কর্মসূচিতে অভিভাবকদেরও অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে।



