৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ | রবিবারবাংলা: ২২ ভাদ্র ১৪৩৩
বিশ্লেষণ

সমুদ্র আমাদের এত ভালো লাগে কেন? বিজ্ঞানের চোখে নীলের মায়া

sea-beach-3

সমুদ্রের সামনে দাঁড়ালে হঠাৎ করেই যেন মনটা একটু হালকা হয়ে যায়। ঢেউয়ের পর ঢেউ এসে তীরে আছড়ে পড়ে, আবার ফিরে যায়। দূরে তাকালে চোখে পড়ে শুধু নীল আর নীল। চারপাশের কোলাহল ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে আসে, আর মনের ভেতর জমে থাকা ক্লান্তি, উদ্বেগ কিংবা দুশ্চিন্তাগুলোও যেন কিছুক্ষণের জন্য দূরে সরে যায়।

ডাচ্‌ চিত্রশিল্পী ভিনসেন্ট ভ্যান গঘ একবার বলেছিলেন, ‘সমুদ্রের নীলের মধ্যে এমন কিছু আছে, যা দুঃখ-কষ্ট মুহূর্তেই দূর করে দেয়।’ কথাটি নিছক কাব্যিক অনুভূতি মনে হলেও এর পেছনে বিজ্ঞানেরও কিছু ব্যাখ্যা রয়েছে। সমুদ্রের বিশালতা, ঢেউয়ের ছন্দ, বাতাসের স্পর্শ—সব মিলিয়ে আমাদের মস্তিষ্ক ও শরীরে তৈরি হয় এক বিশেষ ধরনের প্রশান্তির অনুভূতি।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, সমুদ্রের কাছাকাছি গেলেই মন এত ভালো হয়ে যায় কেন?

ঢেউয়ের শব্দেই কি লুকিয়ে আছে প্রশান্তি?

সমুদ্রের সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয়গুলোর একটি হলো এর শব্দ। ঢেউ তীরে এসে ভাঙছে, আবার সরে যাচ্ছে—এই ছন্দময় শব্দ আমাদের মস্তিষ্ককে অনেকটা একঘেয়ে, পুনরাবৃত্তিমূলক প্রাকৃতিক শব্দের সঙ্গে পরিচিত করায়। ফলে মনোযোগ কিছুটা স্থির হতে পারে এবং দৈনন্দিন ব্যস্ততা থেকে মস্তিষ্ক সাময়িক বিরতি পায়।

সমুদ্রের বিশাল দৃশ্যও একইভাবে মনকে প্রভাবিত করে। দিগন্তজুড়ে বিস্তৃত জলরাশি আমাদের দৃষ্টিকে দীর্ঘ সময়ের জন্য একটি খোলা পরিসরে রাখে। চার দেয়ালের সীমাবদ্ধতা থেকে বেরিয়ে এমন বিশাল প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখলে অনেকের মধ্যেই মুক্তির অনুভূতি তৈরি হয়।

নীল রঙের প্রভাবও কি আছে?

সমুদ্রের নীল রং মানুষের মনে শান্তির অনুভূতি তৈরি করতে পারে। প্রকৃতির এই রংটি দীর্ঘক্ষণ দেখলে চোখ ও মস্তিষ্ক তুলনামূলকভাবে আরামদায়ক একটি দৃশ্য পায়। তার সঙ্গে যুক্ত হয় আকাশ, বাতাস, ঢেউ ও সূর্যের আলো—সব মিলিয়ে তৈরি হয় এমন একটি পরিবেশ, যা মনকে স্বাভাবিকভাবেই ধীর করে দিতে পারে। তাই সমুদ্রের কাছে গিয়ে শুধু ‘সুন্দর দৃশ্য’ দেখার আনন্দই হয় না; বরং প্রকৃতির সঙ্গে এক ধরনের মানসিক সংযোগও তৈরি হয়।

বাতাসে থাকা ঋণাত্মক আয়নের গল্প

সমুদ্রের প্রতি আকর্ষণের পেছনে ঋণাত্মক আয়নের ভূমিকা নিয়েও দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা রয়েছে। বিশেষ করে ঢেউ ভাঙার মতো প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ায় বাতাসে আয়নের সৃষ্টি হতে পারে। কিছু গবেষণা ও জনপ্রিয় বিজ্ঞানভিত্তিক লেখায় দাবি করা হয়েছে, ঋণাত্মক আয়ন মানুষের মেজাজ ও মানসিক অবস্থার ওপর ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

পিয়ার্স হাওয়ার্ডের Owner’s Manual for the Brain বইয়েও ঋণাত্মক আয়নের সঙ্গে ইতিবাচক মনোভাবের সম্পর্কের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এ বিষয়ে বৈজ্ঞানিক প্রমাণকে একেবারে চূড়ান্ত বলে ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই। অর্থাৎ, সমুদ্রের কাছে গিয়ে মন ভালো হওয়ার পুরো কারণ শুধু ঋণাত্মক আয়ন—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না।

সমুদ্রের বাতাসে কেন এত স্বস্তি?

সমুদ্রের ধারে দাঁড়ালে যে বাতাস পাওয়া যায়, তার অভিজ্ঞতাও শহরের ব্যস্ত পরিবেশের তুলনায় আলাদা। খোলা জায়গা, বাতাসের প্রবাহ, আর্দ্রতা এবং তুলনামূলক কম নগরদূষণ—সবকিছু মিলে সমুদ্রতীরের পরিবেশ অনেকের কাছেই সতেজ মনে হয়।

তবে ‘সমুদ্রের বাতাসে অক্সিজেন অনেক বেশি’- এই ধারণাটি সরলীকৃত। পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে অক্সিজেনের অনুপাত মোটামুটি একই থাকে। সমুদ্রের কাছে বাতাসকে সতেজ লাগার পেছনে মূলত খোলা পরিবেশ, বাতাসের প্রবাহ ও দূষণের তুলনামূলক কম উপস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে

Advertisements