যে নারীর ত্যাগে বিশ্ব ফুটবলের তারকা লামিনে ইয়ামাল

ফুটবল মাঠে দুর্দান্ত নৈপুণ্য দেখিয়ে খুব অল্প সময়েই বিশ্বজুড়ে পরিচিতি পেয়েছেন স্পেনের তরুণ তারকা লামিনে ইয়ামাল। বার্সেলোনার জার্সিতে নিজের প্রতিভার স্বাক্ষর রাখার পর স্পেনের হয়ে ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ জয়ের সাফল্যও অর্জন করেন তিনি। এরপর মাত্র ১৯ বছর বয়সেই বিশ্বকাপের শিরোপা জিতে নিজেকে নিয়ে গেছেন অনন্য উচ্চতায়।

তবে ইয়ামালের এই সাফল্যের গল্প শুধু ফুটবল প্রতিভার নয়। এর পেছনে রয়েছে একটি পরিবারের দীর্ঘ সংগ্রাম, ত্যাগ ও কঠোর পরিশ্রমের ইতিহাস। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম টাইমস অব ইন্ডিয়া তাদের এক বিশেষ প্রতিবেদনে তুলে ধরেছে এই অনুপ্রেরণামূলক যাত্রার গল্প।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইয়ামালের সাফল্যের ভিত্তি তৈরি হয়েছিল বহু বছর আগে তার পৈতৃক দাদি ফাতিমা রোমানির সাহসী সিদ্ধান্তের মাধ্যমে। পরিবারের ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার স্বপ্ন নিয়ে তিনি একাই মরক্কো ছেড়ে স্পেনে পাড়ি জমান। সে সময় তার কাছে প্রয়োজনীয় আইনি কাগজপত্র কিংবা আর্থিক সহায়তা—কোনোটিই ছিল না। তবু অজানা এক দেশে নতুন জীবন শুরু করার কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে পিছপা হননি তিনি।
স্পেনে পৌঁছানোর পর প্রথমে আলজেসিরাস ও গ্রানাদায় কিছুদিন বসবাস করেন ফাতিমা। পরে কাতালুনিয়ার মাতোরো শহরের রকাফোন্দা এলাকায় স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। সেখানে জীবনের শুরুটা ছিল অত্যন্ত কঠিন। নিরাপত্তা কিংবা আর্থিক স্থিতিশীলতা—কোনোটিই ছিল না তার।

অন্যদিকে মরক্কোতে রয়ে গিয়েছিলেন তার সন্তানরা, যাদের মধ্যে ছিলেন ইয়ামালের বাবা মুনির নাসরাউই। সন্তানদের নিজের কাছে এনে একসঙ্গে বসবাসের স্বপ্ন পূরণ করতে ফাতিমা একাধিক শিফটে কাজ শুরু করেন। দিনের পর দিন কঠোর পরিশ্রম করে অর্থ সঞ্চয় করেন এবং শেষ পর্যন্ত সন্তানদের স্পেনে এনে পরিবারকে পুনরায় একত্রিত করতে সক্ষম হন।
পরিবারের সংগ্রাম এখানেই শেষ হয়নি। পরে লামিনে ইয়ামালের বাবা-মায়ের বিচ্ছেদ হলে আবারও পরিবারের সবচেয়ে বড় ভরসা হয়ে ওঠেন দাদি ফাতিমা। রকাফোন্দার কঠিন সামাজিক পরিবেশের মধ্যেও তিনি নাতিকে আগলে রাখেন, তাকে মানসিকভাবে শক্ত রাখেন এবং ফুটবলের প্রতি মনোযোগ ধরে রাখতে সবসময় উৎসাহ দিয়ে যান।
বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম আলোচিত তারকায় পরিণত হলেও ইয়ামাল কখনো নিজের শিকড় কিংবা দাদির আত্মত্যাগ ভুলে যাননি। গোল করার পর তিনি প্রায়ই হাত দিয়ে ‘৩০৪’ সংখ্যা দেখান। এটি আসলে তার বেড়ে ওঠার জায়গা রকাফোন্দার পোস্টকোড ০৮৩০৪-এর প্রতি ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতার প্রতীক।
ইয়ামালের বিভিন্ন সাক্ষাৎকার ও মন্তব্য থেকে জানা যায়, ট্রফি জেতার চেয়েও তার কাছে সবচেয়ে বড় আনন্দ হলো তার বাবা, মা ও দাদিকে সুখে-শান্তিতে রাখতে পারা। ফুটবল ক্যারিয়ারে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর নিজের উপার্জনের অর্থ দিয়ে তিনি রকাফোন্দাতেই দাদি ফাতিমার জন্য একটি বাড়ি কিনে দেন। বর্তমানে ফাতিমা সেই বাড়িতেই বসবাস করছেন।
বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম উজ্জ্বল তারকা হয়ে ওঠার পরও লামিনে ইয়ামাল বারবার স্মরণ করেন তার শৈশবের সংগ্রাম, পরিবারের কঠিন সময় এবং বিশেষ করে দাদি ফাতিমা রোমানির অসীম ত্যাগ ও সাহসিকতার কথা। তার জীবনের এই অধ্যায়ই প্রমাণ করে, অনেক বড় সাফল্যের পেছনে লুকিয়ে থাকে একজন নীরব সংগ্রামীর অমূল্য অবদান।



