র্যাব বিলুপ্ত করে এসআরবি, সংসদে বিল উত্থাপন

র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) বিলুপ্ত করে পুলিশের অধীনে ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন’ বা এসআরবি নামে নতুন একটি বিশেষায়িত ইউনিট গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ লক্ষ্যে জাতীয় সংসদে ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) বিল, ২০২৬’ উত্থাপন করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।
বিলটি উত্থাপনের সময় বিরোধী দলের পক্ষ থেকে আপত্তি জানানো হয়। তাদের অভিযোগ, নাম ও কাঠামো পরিবর্তন হলেও প্রস্তাবিত এসআরবিতে র্যাবের বিদ্যমান কাঠামো ও ক্ষমতার বড় অংশই বহাল থাকছে। এ নিয়ে সংসদে সরকারি ও বিরোধী দলের সদস্যদের মধ্যে আলোচনা ও বিতর্ক হয়।

পরে বিলটি পর্যালোচনা করে চার কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে পাঠানো হয়।
র্যাবের সম্পদ ও জনবল যাবে এসআরবিতে
প্রস্তাবিত আইনের খসড়া অনুযায়ী, র্যাব বিলুপ্ত হলেও এর প্রাতিষ্ঠানিক ধারাবাহিকতার বড় একটি অংশ নতুন ইউনিটে স্থানান্তরিত হবে। র্যাবের বর্তমান জনবল, ক্ষমতা, কর্তৃত্ব, সুযোগ-সুবিধা, তহবিল, অর্থ, সম্পত্তি, নথিপত্র ও অন্যান্য সম্পদ এসআরবির কাছে হস্তান্তর করার বিধান রাখা হয়েছে।
শুধু সম্পদ নয়, র্যাবের কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও এসআরবির সদস্য হিসেবে গণ্য হবেন। একই সঙ্গে র্যাবের বিদ্যমান দায়, চুক্তি এবং চলমান মামলা নতুন ইউনিটের নামে অব্যাহত রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে।
র্যাব বিলুপ্তির পাশাপাশি ‘আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নস অর্ডিন্যান্স’ রহিত করে নতুন এপিবিএন আইন করার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। এ জন্য পৃথক একটি বিল সংসদে উত্থাপন করা হয়েছে।
এসআরবির ক্ষমতা কী থাকবে
প্রস্তাবিত এসআরবি পুলিশের অধীন একটি বিশেষায়িত ইউনিট হিসেবে কাজ করবে। প্রয়োজন অনুযায়ী পুলিশ ও বিভিন্ন শৃঙ্খলা বাহিনী থেকে নির্দিষ্টসংখ্যক কর্মকর্তা ও সদস্যকে পদায়ন বা প্রেষণে এনে ইউনিটটি গঠন করার কথা বলা হয়েছে।
এসআরবির সদস্যদের পদ, নিয়োগপ্রক্রিয়া ও চাকরির শর্ত বিধির মাধ্যমে নির্ধারণ করা হবে। ইউনিটটির জন্য আলাদা পোশাক, পতাকা ও প্রতীক থাকার কথাও বিলে উল্লেখ রয়েছে।
পুলিশের অন্তত অতিরিক্ত পুলিশ মহাপরিদর্শক পদমর্যাদার একজন কর্মকর্তাকে এসআরবির মহাপরিচালক করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে।
ফৌজদারি অপরাধের তদন্তের পাশাপাশি তল্লাশি, গ্রেপ্তার ও জব্দ করার ক্ষমতাও পাবে এসআরবি। ইউনিটটির নিজস্ব হাজতখানা, মালখানা এবং জিজ্ঞাসাবাদ কক্ষ রাখার বিধানও প্রস্তাবিত আইনে রয়েছে।
এ ছাড়া নাগরিকদের অভিযোগ এবং ইউনিটের সদস্যদের অভ্যন্তরীণ অভিযোগ নিষ্পত্তির জন্য একাধিক পক্ষের সমন্বয়ে একটি অভিযোগ প্রতিকার কমিটি গঠনের প্রস্তাব করা হয়েছে।
র্যাবের পুরোনো বিধিও থাকবে
নতুন আইনের অধীনে বিধিমালা তৈরি না হওয়া পর্যন্ত র্যাবের জন্য প্রযোজ্য ২০০৫ সালের বিধিমালা অনুসরণ করে বিভাগীয় শৃঙ্খলামূলক ব্যবস্থা ও আদালতের কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে।
র্যাবের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই দেশ-বিদেশে সমালোচনা রয়েছে। গুম ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের প্রেক্ষাপটে জাতিসংঘ, গুম-সংক্রান্ত তদন্ত কমিশন এবং বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন অতীতে বাহিনীটি বিলুপ্ত করার সুপারিশ করেছে। ২০২১ সালের ডিসেম্বরে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্র র্যাব এবং বাহিনীটির তৎকালীন ও সাবেক কয়েকজন কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয়।
বিল নিয়ে বিরোধীদের আপত্তি
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বিলটি সংসদে তুলতে গেলে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম আপত্তি জানান। তার বক্তব্য, র্যাবের বিরুদ্ধে গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা ও ‘আয়নাঘর’-কেন্দ্রিক অভিযোগ রয়েছে। ফলে বাহিনীটির বিলুপ্তির পরিবর্তে একই ধরনের নতুন প্রতিষ্ঠান তৈরি করা হলে তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাবে।
তিনি বলেন, নির্বাচনের আগে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল র্যাব বিলুপ্ত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। নতুন কোনো বাহিনী গঠন করে র্যাবের কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার কথা তখন বলা হয়নি। তাই নতুন ইউনিট গঠনের আগে সংসদে এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা প্রয়োজন।
জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, র্যাব নামে কোনো বাহিনী থাকবে না—এটাই নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির মূল বিষয়। সেই অনুযায়ী র্যাব বিলুপ্ত করা হচ্ছে। তবে দেশের নিরাপত্তার প্রয়োজনে পুলিশের অধীনে একটি বিশেষায়িত ইউনিট থাকা দরকার বলে তিনি মনে করেন।
বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমানও র্যাব বিলুপ্তির বিষয়টি সমর্থন করেন। তবে নতুন কোনো সংস্থা গঠনের আগে আরও আলোচনা করে সবার সম্মতির ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, এসআরবির কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার জন্য বিলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে বিলটি পর্যালোচনার সময় বিরোধী দলকে সক্রিয়ভাবে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
এপিবিএনকেও দেওয়া হচ্ছে তদন্তের ক্ষমতা
র্যাবের পাশাপাশি ‘আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন) বিল, ২০২৬’ সংসদে উত্থাপন করা হয়েছে। পুরোনো অধ্যাদেশ বাতিল করে নতুন আইনের মাধ্যমে এপিবিএনের কার্যক্রম পরিচালনার প্রস্তাব করা হয়েছে।
প্রস্তাবিত আইনে এপিবিএনের অধীনে স্পেশাল সিকিউরিটি অ্যান্ড প্রটেকশন ব্যাটালিয়ন, পার্বত্য ব্যাটালিয়ন, বিমানবন্দর ব্যাটালিয়নসহ অন্যান্য ব্যাটালিয়ন রাখার কথা বলা হয়েছে।
নতুন আইনে এপিবিএন সদস্যদের ফৌজদারি অপরাধ তদন্তের ক্ষমতা দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে। প্রচলিত আইন ও ফৌজদারি কার্যবিধি অনুসরণ করে কোনো স্থানে প্রবেশ, তল্লাশি, জব্দ এবং গ্রেপ্তারের ক্ষমতাও থাকবে তাদের।
তবে যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া এপিবিএনের কোনো সদস্য সংবাদপত্র বা ইলেকট্রনিক গণমাধ্যমে কোনো তথ্য বা নথি প্রকাশ করতে পারবেন না। এমন তথ্য প্রকাশে সহযোগিতা করা বা প্রকাশের কারণ হওয়ার ক্ষেত্রেও বিধিনিষেধ রাখা হয়েছে।



