কিনোকুনিয়া এখন ঢাকায়: বিশ্বসাহিত্য আর জ্ঞানের নতুন ঠিকানা

উত্তরার সেন্টারপয়েন্টে পা রাখতেই চোখে পড়ে সারি সারি বইয়ের তাক। সাহিত্য, ইতিহাস, শিল্পকলা, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, ব্যবসা-বাণিজ্য থেকে শুরু করে শিশুদের জন্য রঙিন চিত্রগ্রন্থ—সব মিলিয়ে যেন জ্ঞানের এক বিশাল ভুবন। বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় বইয়ের প্রতিষ্ঠান কিনোকুনিয়া এবার আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করেছে বাংলাদেশে।
গত বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) উদ্বোধন করা হয় ‘কিনোকুনিয়া বাংলাদেশ’-এর প্রথম শাখা। প্রায় ৪০ হাজার বইয়ের এই সংগ্রহশালায় রয়েছে আন্তর্জাতিক বেস্টসেলার, গবেষণাধর্মী প্রকাশনা, গ্রাফিক নভেল, মাঙ্গা, আত্মজীবনী এবং বাংলা সাহিত্যের উল্লেখযোগ্য বই। ফলে এটি কেবল একটি বইয়ের দোকান নয়, বরং বিশ্বসাহিত্য ও স্থানীয় সংস্কৃতির এক মিলনস্থলে পরিণত হয়েছে।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন কিনোকুনিয়ার পরিচালক হিরোয়োশি কাগেয়ামা, আইপিসিও ডেভেলপমেন্টস (বাংলাদেশ) লিমিটেড ও আইপিসিও হোটেলস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক খন্দকার জায়েদ আহসান, ঔপন্যাসিক ও সিটি ব্যাংক পিএলসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মাসরুর আরেফিন এবং স্যার জন উইলসন স্কুলের অধ্যক্ষ সাবরিনা শহীদসহ বিভিন্ন অঙ্গনের বিশিষ্ট ব্যক্তিরা।
হিরোয়োশি কাগেয়ামা বলেন, বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান পঠন সংস্কৃতি ও বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার প্রতি আস্থা রেখেই তারা এখানে যাত্রা শুরু করেছেন। তার ভাষায়, ‘আমরা এমন একটি জায়গা গড়ে তুলতে চাই, যেখানে মানুষ নতুন ধারণার সঙ্গে পরিচিত হবে, বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি সম্পর্কে জানবে এবং বইয়ের মাধ্যমে একে অপরের সঙ্গে সংযুক্ত হতে পারবে।
‘
কিনোকুনিয়ার ভেতরে ঢুকলে সেই ভাবনাটিরই প্রতিফলন দেখা যায়। প্রশস্ত ও নান্দনিক পরিবেশে সাজানো বইয়ের তাকগুলো পাঠককে আমন্ত্রণ জানায় নতুন জগত আবিষ্কারের। কোথাও বিশ্বখ্যাত লেখকদের বই, কোথাও আবার বাংলা সাহিত্যের ক্লাসিক কিংবা সমসাময়িক প্রকাশনা।
বিশেষভাবে নজর কাড়ে শিশুদের জন্য নির্ধারিত কর্নারটি। সেখানে রয়েছে রঙিন চিত্রগ্রন্থ, শিক্ষামূলক বই, সৃজনশীল খেলনা, নান্দনিক স্টেশনারি, অরিগামি সেট, বনসাই তৈরির কিট এবং যোগব্যায়াম অনুশীলনের নানা উপকরণ।
শিশু-কিশোরদের সৃজনশীলতা ও মানসিক বিকাশে সহায়ক এসব আয়োজন অভিভাবকদেরও আকৃষ্ট করছে।

গানচিল মিউজিকের প্রতিষ্ঠাতা আসিফ ইকবাল বলেন, ‘আমাদের চিন্তার জগৎকে আরও বিস্তৃত করতে নানা ধরনের বইয়ের প্রয়োজন। কিনোকুনিয়া সেই উপাদানগুলোকে এক জায়গায় নিয়ে এসেছে। বিশেষ করে শিশু ও তরুণদের কল্পনাশক্তি ও ভাবনার পরিসর বাড়াতে এ ধরনের উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।’
শিশুদের বইমুখী করার প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন স্যার জন উইলসন স্কুলের অধ্যক্ষ সাবরিনা শহীদ। তিনি বলেন, অনলাইনভিত্তিক বিনোদনের এই সময়ে শিশুদের বয়সোপযোগী বইয়ের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া জরুরি। এ জন্য অভিভাবক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও গণমাধ্যমকে একযোগে কাজ করতে হবে।
দোকানে ঘুরতে আসা বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া আরিয়ান রহমান সত্যজিৎ রায়ের বইয়ের ইংরেজি অনুবাদ হাতে নিয়ে বলেন, ‘আমরা সত্যজিৎ রায়ের গল্প পড়ে বড় হয়েছি। তার বইয়ের ইংরেজি সংস্করণ এখানে একসঙ্গে এত সুন্দরভাবে সাজানো দেখে অভিভূত হয়েছি। বাংলা সাহিত্যকে বিশ্বপাঠকের কাছে পৌঁছে দিতে অনুবাদ খুব গুরুত্বপূর্ণ।’
অন্যদিকে তরুণ পাঠক নাফিসা শার্লক হোমসের একটি বিশেষ সংস্করণ হাতে নিয়ে বলেন, ‘অনলাইনে বই দেখা যায়, কিন্তু বই হাতে নিয়ে পাতা উল্টানোর অনুভূতি ভিন্ন। এখানে এসে মনে হচ্ছে, বিশ্বমানের বইয়ের এক জগতে প্রবেশ করেছি।’
কিনোকুনিয়া কর্তৃপক্ষ জানায়, তারা শুধু বই বিক্রির মধ্যেই নিজেদের সীমাবদ্ধ রাখতে চায় না। ভবিষ্যতে পাঠচক্র, সাহিত্য আলোচনা, সাংস্কৃতিক আয়োজন এবং জ্ঞান বিনিময়ের বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে এটি পাঠক, শিক্ষার্থী, গবেষক ও সংস্কৃতিমনা মানুষের মিলনস্থলে পরিণত করার পরিকল্পনা রয়েছে তাদের।
বাংলাদেশে ইংরেজি বই, গ্রাফিক নভেল, মাঙ্গা ও গবেষণাধর্মী প্রকাশনার প্রতি তরুণদের আগ্রহ ক্রমেই বাড়ছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, কিনোকুনিয়ার আগমন সেই চাহিদা পূরণ করার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক প্রকাশনাকে হাতের নাগালে নিয়ে আসবে এবং দেশের জ্ঞানচর্চা ও সাংস্কৃতিক বিনিময়ে নতুন মাত্রা যোগ করবে।


