কেন ‘হাজার বছর ধরে’ এখনও বাংলা চলচ্চিত্রের অনন্য সৃষ্টি

কিংবদন্তি অভিনেত্রী ও নির্মাতা কোহিনূর আক্তার সুচন্দাকে নিয়ে প্রকাশিত এক বিশ্লেষণধর্মী লেখায় তাকে জহির রায়হানের শিল্পদর্শনের সবচেয়ে সফল উত্তরসূরিদের একজন হিসেবে মূল্যায়ন করা হয়েছে। লেখায় বলা হয়েছে, ‘বেহুলা’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে জহির রায়হানের আবিষ্কার হিসেবে চলচ্চিত্রে যাত্রা শুরু করা সুচন্দা পরবর্তীতে শুধু তার জীবনসঙ্গীই নন, বরং তার সৃষ্টিশীল ভাবনারও অংশ হয়ে ওঠেন। জহির রায়হানের সাহিত্য, সমাজভাবনা ও চলচ্চিত্র নির্মাণের দর্শন তিনি এতটাই গভীরভাবে উপলব্ধি করেছিলেন যে, বহু বছর পরও সেই চিন্তাধারাকে সফলভাবে পর্দায় তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছেন।
লেখকের মতে, জহির রায়হানের কালজয়ী উপন্যাস হাজার বছর ধরে অবলম্বনে নির্মিত চলচ্চিত্রটি সুচন্দার অন্যতম সেরা কাজ। এতে মূল উপন্যাসের আবহ, সমাজবাস্তবতা, মানুষের জীবনসংগ্রাম এবং গ্রামবাংলার সৌন্দর্যকে অত্যন্ত আন্তরিক ও বাস্তবধর্মীভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। এমনকি লেখকের মন্তব্য, জহির রায়হান নিজে চলচ্চিত্রটি নির্মাণ করলেও হয়তো এর চেয়ে ভিন্নভাবে উপস্থাপন করতেন না।
বিশ্লেষণে চলচ্চিত্রটির অন্যতম শক্তি হিসেবে গ্রামবাংলার নিখুঁত চিত্রায়ণের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। নদী, খাল-বিল, মাঠ, কৃষিকাজ, নৌকা, লোকজ সংস্কৃতি, গৃহস্থালি জীবন, বিয়ের আয়োজন, গ্রামীণ আচার-অনুষ্ঠান থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের প্রতিদিনের জীবনযাপন—সবকিছুই স্বাভাবিক ও বিশ্বাসযোগ্যভাবে পর্দায় উঠে এসেছে। পুরো নির্মাণজুড়েই বাংলার প্রকৃতি ও ঐতিহ্যের একটি জীবন্ত রূপ ফুটে উঠেছে।
লেখায় চলচ্চিত্রটির সামাজিক দিকগুলোকেও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। নারীর ত্যাগ, মাতৃত্বের আকাঙ্ক্ষা, বহুবিবাহ, তালাক, পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারীর অসহায়ত্ব, কুসংস্কার, তাবিজ-কবচ, ঝাড়ফুঁকসহ গ্রামীণ সমাজের নানা বাস্তবতা সংবেদনশীলভাবে তুলে ধরেছেন সুচন্দা। একই সঙ্গে এসব বিষয়কে কেবল গল্পের অংশ হিসেবে নয়, সমাজের বাস্তব চিত্র হিসেবেও উপস্থাপন করা হয়েছে।
চলচ্চিত্রের প্রেমের গল্প নিয়েও ইতিবাচক মূল্যায়ন করা হয়েছে। মন্তু ও টুনির সম্পর্ককে বাংলা সাহিত্যের অন্যতম নির্মল ও অপূর্ণ প্রেমের প্রতীক হিসেবে উল্লেখ করে লেখক বলেন, তাদের সম্পর্ক ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও আত্মত্যাগের এক অনন্য উদাহরণ, যেখানে আবেগের গভীরতা থাকলেও তা কখনো শালীনতার সীমা অতিক্রম করেনি।
অভিনয়ের ক্ষেত্রেও চলচ্চিত্রটির শিল্পীদের প্রশংসা করা হয়েছে। মন্তু চরিত্রে রিয়াজ, টুনি চরিত্রে শারমিন জোহা শশী এবং মকবুল শিকদার চরিত্রে এ টি এম শামসুজ্জামানের অভিনয়কে চলচ্চিত্রটির অন্যতম শক্তি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি টুনির মায়ের চরিত্রে সুচন্দার অভিনয়ও দর্শকের মনে আলাদা ছাপ ফেলেছে বলে মন্তব্য করা হয়েছে।
এছাড়া জহির রায়হানের লেখা গান, আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুলের সংগীত পরিচালনা, লোকসংগীতের ব্যবহার এবং চিত্রগ্রহণের নান্দনিকতাও লেখায় বিশেষভাবে তুলে ধরা হয়েছে। লেখকের মতে, হাজার বছর ধরে শুধু একটি সফল সাহিত্যনির্ভর চলচ্চিত্র নয়, বরং জহির রায়হানের শিল্পভাবনাকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে সুচন্দার এক অনন্য সৃজনশীল অর্জন।



