এক দিনের স্বাধীন রাজ্য! এস্তোনিয়ার গ্রামে ভিসা-মুদ্রা-রাজ্য দিবসের আয়োজন

এস্তোনিয়ার দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের একটি ছোট্ট গ্রাম বছরে মাত্র এক দিনের জন্য প্রতীকীভাবে স্বাধীন রাজ্যে পরিণত হয়। সেই দিনে গ্রামটিতে প্রবেশের জন্য দেওয়া হয় বিশেষ ভিসা, চালু থাকে নিজস্ব প্রতীকী মুদ্রা, আয়োজন করা হয় সামরিক কুচকাওয়াজের আদলে শোভাযাত্রা এবং নানা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। তবে এই প্রতীকী রাজ্যের উদ্দেশ্য কোনো রাজনৈতিক ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা নয়; বরং নিজেদের ভাষা, সংস্কৃতি ও শতাব্দীপ্রাচীন ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রাখা এবং নতুন প্রজন্মের কাছে তা পৌঁছে দেওয়া।
ওয়াশিংটন পোস্টের এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, এ আয়োজনের কেন্দ্রবিন্দু হলো এস্তোনিয়ার সংখ্যালঘু সেতো জনগোষ্ঠী। প্রতি বছরের মতো এবারও দক্ষিণ-পূর্ব এস্তোনিয়ার মিকিতামায়ে গ্রামে অনুষ্ঠিত হয়েছে সেতোদের ঐতিহ্যবাহী ‘কিংডম ডে’ (রাজ্য দিবস)। শনিবার আয়োজিত এই উৎসবে দেশ-বিদেশ থেকে আসা দর্শনার্থীদের উপস্থিতিতে মুখর হয়ে ওঠে পুরো এলাকা।
উৎসবে ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরে অংশ নেন নারী-পুরুষ সবাই। ৮০ বছর বয়সী মাইমে কাপতেন অ্যাকর্ডিয়নের সুরে নেচে দর্শকদের মুগ্ধ করেন। তার পরনে ছিল সেতোদের ঐতিহ্যবাহী পোশাক, আর গলায় ঝুলছিল রুপার তৈরি ভারী চেইন ও অসংখ্য মুদ্রা। নাচের সময় সেগুলোর ঝনঝন শব্দ সেতো সংস্কৃতির এক বিশেষ বৈশিষ্ট্য হিসেবে দর্শকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে।
সেতো জনগোষ্ঠী কয়েক শতাব্দী ধরে এস্তোনিয়া ও রাশিয়ার সীমান্তবর্তী অঞ্চলে বসবাস করে আসছে। তবে তাদের কখনো নিজস্ব স্বাধীন রাষ্ট্র ছিল না। ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর এস্তোনিয়া ও রাশিয়ার মধ্যকার নতুন সীমান্ত তাদের ঐতিহাসিক আবাসভূমিকে দুই ভাগে বিভক্ত করে দেয়। ফলে সীমান্তের দুই পাশে বসবাসকারী একই পরিবারের সদস্যদের একে অপরের সঙ্গে দেখা করা কঠিন হয়ে পড়ে। এমনকি আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে দেখা করতে কিংবা পূর্বপুরুষদের কবর জিয়ারত করতে গেলেও তাদের ভিসা সংগ্রহ করতে হতো।
এই বাস্তবতার পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৯৪ সালে চালু হয় প্রতীকী ‘সেতো রাজ্য’ উদ্যাপন। এর মূল লক্ষ্য ছিল সীমান্তের কারণে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া সেতো জনগোষ্ঠীকে সাংস্কৃতিকভাবে একত্রিত করা, তাদের ভাষা ও ঐতিহ্যকে বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সেই সংস্কৃতি সংরক্ষণ করা।
এস্তোনিয়ার ২০২১ সালের আদমশুমারির তথ্য অনুযায়ী, দেশটিতে প্রায় ২৫ হাজার মানুষ সেতো ভাষা বলতে পারেন। তবে ভাষাবিদদের মতে, দৈনন্দিন জীবনে নিয়মিত এই ভাষা ব্যবহার করেন মাত্র কয়েক হাজার মানুষ। যদিও সেতো ভাষার সঙ্গে এস্তোনীয় ভাষার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে, তবুও সেতো জনগোষ্ঠী এটিকে একটি স্বতন্ত্র ভাষা হিসেবেই বিবেচনা করে।
উৎসবের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো সেতো সম্প্রদায়ের প্রতীকী প্রতিনিধি নির্বাচন। প্রতি বছর একজনকে ‘উলেমসুতস্কা’ হিসেবে নির্বাচিত করা হয়। লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, তিনি সেতোদের পৌরাণিক রাজা পেকো-এর প্রতিনিধি হিসেবে জনগণের কাছে বার্তা পৌঁছে দেন এবং এক বছরের জন্য সম্প্রদায়ের সাংস্কৃতিক মুখপাত্রের দায়িত্ব পালন করেন। এবার এই দায়িত্ব পেয়েছেন লোকজ পোশাক নির্মাতা ইংরিত কালা। দায়িত্ব গ্রহণের পর তিনি জানান, সেতো সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও ভাষাকে আরও বেশি মানুষের কাছে পরিচিত করে তোলাই হবে তার প্রধান লক্ষ্য।
উৎসবের সবচেয়ে আকর্ষণীয় আয়োজনগুলোর একটি হলো ‘লেলো’ নামের প্রাচীন লোকগান পরিবেশনা। এক হাজার বছরেরও বেশি পুরোনো এই গায়কি ঐতিহ্য ইউনেসকোর অমূর্ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এই বিশেষ গানের ধরনে একজন নারী প্রথমে গানের সূচনা করেন, এরপর দলগতভাবে অন্যরা শেষ অংশে কণ্ঠ মেলান। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে লিখিত নয়, বরং মৌখিকভাবে এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে এই গান সংরক্ষিত হয়ে আসছে।
তবে সেতো ভাষা ও সংস্কৃতি রক্ষার পথ একেবারেই সহজ নয়। সম্প্রদায়ের নেতাদের মতে, পরিবারে যদি শিশুদের সঙ্গে নিয়মিত সেতো ভাষায় কথা বলা না হয়, তাহলে শুধু বিদ্যালয়ে ভাষা শেখানোর মাধ্যমে সেটিকে জীবন্ত রাখা সম্ভব নয়। তাই ঘর থেকেই ভাষা চর্চা শুরু করার ওপর তারা গুরুত্ব দিচ্ছেন।
এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে কাজ করছেন তরুণ প্রজন্মের অনেক সদস্যও। তাদেরই একজন ২৩ বছর বয়সী মারিয়া গ্রুনবার্গ। তিনি মনে করেন, সেতো ভাষা ও গান শুধু প্রবীণদের স্মৃতির অংশ হয়ে থাকলে চলবে না। বরং শিশু, কিশোর ও তরুণদেরও এই ঐতিহ্যের সঙ্গে সম্পৃক্ত করতে হবে, যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম নিজেদের সংস্কৃতি ও পরিচয় ধরে রাখতে পারে।
বছরে মাত্র এক দিনের জন্য প্রতীকী স্বাধীন রাজ্যে রূপ নেওয়া এই উৎসব এখন শুধু সেতো জনগোষ্ঠীর নয়, বরং এস্তোনিয়ার সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক। ভাষা, ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক পরিচয় রক্ষার এই ব্যতিক্রমী আয়োজন প্রতিবছরই দেশ-বিদেশের অসংখ্য মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করছে।



