তাজমহল কি এবার মন্দিরে রূপ নেবে?

বিশ্বের অন্যতম ঐতিহাসিক স্থাপনা তাজমহলকে ঘিরে ভারতে নতুন করে বিতর্কের সূচনা হয়েছে। উত্তর প্রদেশের এলাহাবাদ হাইকোর্ট কেন্দ্রীয় সরকার এবং আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়া (এএসআই)-কে নোটিশ দিয়ে জানতে চেয়েছেন, তাজমহলের নিচে কথিত কোনো প্রাচীন হিন্দু মন্দিরের অস্তিত্ব রয়েছে কি না তা নির্ধারণে জরিপ পরিচালনা করা যাবে না কেন।
আদালতের এই পর্যবেক্ষণের পর তাজমহলকে ঘিরে দীর্ঘদিনের বিতর্ক আবারও সামনে এসেছে। বিষয়টির সূত্রপাত ২০১৫ সালে, যখন আইনজীবী হরিশঙ্কর জৈন তাজমহলের ভেতরে অ্যাডভোকেট-কমিশনার নিয়োগ করে ছবি ও ভিডিওগ্রাফির মাধ্যমে জরিপ পরিচালনার আবেদন করেছিলেন। তবে সে সময় আগ্রা আদালত আবেদনটি খারিজ করে দেন। পরে ওই আদেশের বিরুদ্ধে করা রিভিশন আবেদনের শুনানিতে এলাহাবাদ হাইকোর্টের বিচারপতি রোহিতরঞ্জন আগরওয়ালের বেঞ্চ প্রশ্ন তোলেন, তাজমহলের নিচে কথিত মন্দিরের অস্তিত্ব অনুসন্ধানে জরিপ করতে আপত্তির কারণ কী।

আবেদনকারীর পক্ষে আইনজীবী হরিশঙ্কর জৈনের দাবি, তাজমহল আসলে ‘তেজো মহালয়া’ নামে একটি প্রাচীন হিন্দু মন্দির, যা ভগবান মহাদেবের উদ্দেশে নির্মিত হয়েছিল। মামলায় মহাদেবকে মূল পক্ষ করা হয়েছে এবং তার ‘পরম বন্ধু’ হিসেবে পরিচয় দিয়ে হরিশঙ্কর জৈন ও কয়েকজন ভক্ত আদালতে আবেদন করেছেন। তাদের দাবি, তাজমহল প্রকৃতপক্ষে একটি হিন্দু মন্দির হওয়ায় সেখানে হিন্দুদের পূজা করার সাংবিধানিক অধিকার রয়েছে। সেই অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য স্থাপনাটির প্রকৃত পরিচয় নির্ধারণে আদালতের তত্ত্বাবধানে জরিপ প্রয়োজন।
রাম জন্মভূমি-বাবরি মসজিদ মামলার পর থেকেই একই ধরনের আরও কয়েকটি ঐতিহাসিক স্থাপনা নিয়ে আইনি লড়াইয়ের ইঙ্গিত দিয়েছিলেন আইনজীবী বিষ্ণুশঙ্কর জৈন, যিনি হরিশঙ্কর জৈনের ছেলে। কয়েক বছর আগে এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছিলেন, যেসব ঐতিহাসিক স্থাপনার নিচে কথিত হিন্দু ধর্মীয় স্থাপনার অস্তিত্ব রয়েছে বলে দাবি করা হয়, সেগুলোর একটি দীর্ঘ তালিকা তাদের কাছে রয়েছে এবং পর্যায়ক্রমে সেগুলো নিয়ে আদালতে মামলা করা হবে। তিনি আরও জানিয়েছিলেন, তারা হিন্দুত্ববাদী সংগঠন হিন্দু মহাসভার সঙ্গে যুক্ত।
বর্তমান মামলায় আবেদনকারীরা দাবি করেছেন, তাজমহল প্রকৃতপক্ষে ‘তেজো মহালয়া’ নামে একটি প্রাচীন শিবমন্দির, যা ১১৫৫-৫৬ খ্রিষ্টাব্দে রাজা পরমর্দি দেব নির্মাণ করেছিলেন এবং সেখানে আগ্রেশ্বর মহাদেব প্রতিষ্ঠিত ছিলেন। তাদের দাবি অনুযায়ী, পরবর্তী সময়ে এটি রাজা মানসিংহ এবং পরে জয়পুরের রাজা জয়সিংহের নিয়ন্ত্রণে আসে। এরপর মোগল সম্রাট শাহজাহান জোরপূর্বক স্থাপনাটি দখল করে তার স্ত্রী মমতাজ মহলের স্মৃতিসৌধে রূপান্তর করেন এবং সে সময় ভবনের কিছু অংশ পরিবর্তন করে ইসলামিক স্থাপত্যের বৈশিষ্ট্য যুক্ত করা হয়। আবেদনকারীদের দাবি, অন্তত ১০৯টি প্রত্নতাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক বৈশিষ্ট্য রয়েছে, যা প্রমাণ করে এটি একটি প্রাচীন হিন্দু মন্দির।
মামলায় আবেদনকারীরা আদালতের কাছে তাজমহলকে হিন্দু মন্দির হিসেবে ঘোষণা এবং সেখানে হিন্দুদের পূজার অনুমতি দেওয়ার নির্দেশনা চেয়েছেন। পাশাপাশি আদালতের মাধ্যমে একজন অ্যাডভোকেট-কমিশনার নিয়োগ করে স্থাপনাটির ভেতর ও বাইরের ছবি ও ভিডিও ধারণের নির্দেশ দেওয়ার আবেদন করেছেন। তাদের যুক্তি, ভবনের একাধিক অংশ দীর্ঘদিন ধরে তালাবদ্ধ থাকায় শুধু মৌখিক সাক্ষ্যের মাধ্যমে প্রকৃত অবস্থা নির্ধারণ সম্ভব নয়। এ ছাড়া এএসআইয়ের পরিচালককে আবেদনকারীদের উপস্থিতিতে ভবনের ভেতর ও বাইরের জরিপ পরিচালনার নির্দেশ দেওয়ারও আবেদন জানানো হয়েছে।
অন্যদিকে ২০১৯ সালে আগ্রার অতিরিক্ত দেওয়ানি বিচারক জরিপের আবেদন খারিজ করে বলেছিলেন, আবেদনকারীরা সম্পত্তির সুনির্দিষ্ট অবস্থান, রাজস্ব নথি কিংবা জমির সীমানা সম্পর্কিত নির্ভরযোগ্য তথ্য আদালতে উপস্থাপন করতে পারেননি। পরবর্তীতে ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসে আগ্রার অতিরিক্ত জেলা জজও রিভিশন আবেদন গ্রহণযোগ্য নয় বলে রায় দেন। সেই দুই আদেশকেই এখন এলাহাবাদ হাইকোর্টে চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে।
ইউনেস্কো তাজমহলকে বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। ভারত সরকারের পর্যটনবিষয়ক ওয়েবসাইটেও উল্লেখ করা হয়েছে, মোগল সম্রাট শাহজাহান তার স্ত্রী মমতাজ মহলের স্মৃতিতে তাজমহল নির্মাণ করেছিলেন। ইতিহাসবিদদের মতে, এর নির্মাণকাজ শুরু হয় ১৬৩১ সালে এবং শেষ হয় ১৬৫৩ সালের দিকে। এটি বিশ্বের অন্যতম মূল্যবান ঐতিহাসিক স্থাপনা এবং ভারতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পর্যটনকেন্দ্রগুলোর একটি।
তবে আবেদনকারী হিন্দুত্ববাদী আইনজীবীরা সরকারি ও প্রচলিত ইতিহাসের এই ব্যাখ্যা মানতে নারাজ। তাদের অভিযোগ, তাজমহলের প্রকৃত ইতিহাস আড়াল করা হয়েছে। মামলায় আরও বলা হয়েছে, এএসআই মুসলিমদের শুক্রবার সেখানে নামাজ পড়ার সুযোগ দিলেও হিন্দুদের পূজার সুযোগ দিচ্ছে না, যা তাদের মতে সংবিধানের ২৫ নম্বর অনুচ্ছেদে দেওয়া ধর্মীয় স্বাধীনতার পরিপন্থী।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এলাহাবাদ হাইকোর্টের এই শুনানির মাধ্যমে তাজমহলকে ঘিরে দীর্ঘদিনের বিতর্ক নতুন মাত্রা পেয়েছে। অনেকেই এই পরিস্থিতির সঙ্গে বাবরি মসজিদ-রামমন্দির বিরোধের সূচনার মিল খুঁজছেন। তবে আদালতের বর্তমান নির্দেশ কেবল জরিপের আবেদন নিয়ে সরকার ও এএসআইয়ের মতামত চাওয়ার পর্যায়ে রয়েছে। ভবিষ্যতে মামলাটি কোন দিকে গড়ায় এবং আদালত কী সিদ্ধান্ত দেন, সেটিই এখন দেখার বিষয়।



