বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনমঙ্গলবার, ৪ আগস্ট, ২০২৬
নারী

মুক্তিযুদ্ধে রণাঙ্গন থেকে বিশ্বমঞ্চ—বীর নারী মিনারা বেগমের অসাধারণ যাত্রা

মুক্তিযুদ্ধে রণাঙ্গন থেকে বিশ্বমঞ্চ—বীর নারী মিনারা বেগমের অসাধারণ যাত্রা

বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধ শুধু রণাঙ্গনের লড়াইয়ে সীমাবদ্ধ ছিল না; আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও চলেছিল স্বাধীনতার পক্ষে জনমত গড়ে তোলার নিরন্তর প্রচেষ্টা। সেই সংগ্রামেরই একজন সাহসী সৈনিক বীর নারী মিনারা বেগম। একদিকে অস্ত্র হাতে সম্মুখযুদ্ধে অংশ নিয়েছেন, অন্যদিকে বিদেশি কূটনীতিক ও আন্তর্জাতিক নেতাদের সামনে পাকিস্তানি বাহিনীর বর্বরতা এবং বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের বাস্তব চিত্র তুলে ধরে বৈশ্বিক সমর্থন আদায়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন তিনি।

সম্প্রতি এক স্মৃতিচারণে মুক্তিযুদ্ধের সেই দিনগুলোর নানা অজানা ঘটনা তুলে ধরেন মিনারা বেগম। তিনি জানান, মার্কিন সিনেটর এডওয়ার্ড এম. কেনেডির সঙ্গে তার ঐতিহাসিক সাক্ষাতের পেছনে ছিল এক কিশোরের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা।

মিনারা বেগমের ভাষ্য অনুযায়ী, আগরতলায় অবস্থানকালে সাঈদ ভাইয়ের বাড়িতে কাজ করত ছোট্ট এক ছেলে—আলি। একদিন আলিই ছুটে এসে জানায়, মার্কিন সিনেটর এডওয়ার্ড এম. কেনেডি আগরতলার জেবি হাসপাতালে যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা ও শরণার্থীদের দেখতে আসছেন। খবরটি শোনার পরই তিনি এবং তার সহযোদ্ধারা হাসপাতালে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।

সেই ঘটনার কথা স্মরণ করে মিনারা বেগম বলেন, ছোট্ট আলির বুদ্ধিমত্তা তাকে আজও মুগ্ধ করে। তিনি বলেন, ‘আলি আমাকে এসে বলেছিল, ‘আপনারা তো জেবি হাসপাতালে যান। আজ সেখানে এডওয়ার্ড কেনেডি আসবেন। আপনারা গিয়ে তার সঙ্গে কথা বলুন।’ এত ছোট একটি ছেলের এমন সচেতনতা আমাকে বিস্মিত করেছিল। শুধু এই খবরই নয়, যুদ্ধের সময় ওরা আমাদের নানা গুরুত্বপূর্ণ তথ্যও এনে দিত’।

Advertisements

মুক্তিযুদ্ধের এক সংকটময় সময়ে এই সফর ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। সে সময় অনেক মুক্তিযোদ্ধার মধ্যেই যুদ্ধের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অবস্থান সম্পর্কেও নির্ভরযোগ্য কোনো তথ্য পাওয়া যাচ্ছিল না। ফলে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমর্থন অর্জন ছিল স্বাধীনতার সংগ্রামের অন্যতম বড় প্রয়োজন।

এই প্রেক্ষাপটে এডওয়ার্ড কেনেডির আগরতলা সফর মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য নতুন আশার সঞ্চার করে।

মিনারা বেগম জানান, যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের দেখতে হাসপাতালে এলে তিনি ও ফোরকান বেগম সিনেটর কেনেডির সঙ্গে দেখা করেন। ইংরেজিতে কথা বলতে পারায় তার সঙ্গে দীর্ঘ সময় আলাপের সুযোগ হয়। আলোচনায় তারা মুক্তিযুদ্ধের বাস্তব অবস্থা, পাকিস্তানি বাহিনীর নির্যাতন এবং বিশেষ করে নারী ও সাধারণ মানুষের মানবিক বিপর্যয়ের চিত্র তুলে ধরেন।

আলাপের একপর্যায়ে তারা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অবস্থান সম্পর্কেও জানতে চান। জবাবে এডওয়ার্ড কেনেডি তখন বিস্তারিত কিছু না বললেও পরে তাদের জানান যে, বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের মিয়ানওয়ালি কারাগারে আছেন এবং জীবিত ও সুস্থ আছেন।

মিনারা বেগম আরও জানান, সেই সফরের সময় তাদের সঙ্গে কেনেডির তোলা ছবি ভারতীয় উপমহাদেশের বিভিন্ন শীর্ষস্থানীয় সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়েছিল। যুগান্তর, দ্য স্টেটসম্যানসহ একাধিক পত্রিকায় শুধু ছবি নয়, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ভয়াবহতা, যুদ্ধাহতদের দুর্দশা এবং নির্যাতিত নারীদের করুণ বাস্তবতার কথাও গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশিত হয়।

তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র সরকার সে সময় পাকিস্তানের প্রতি সহানুভূতিশীল অবস্থানে থাকলেও মার্কিন জনগণের বড় একটি অংশ বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে ছিল। এডওয়ার্ড কেনেডিও স্বাধীনতাকামী বাঙালিদের প্রতি সমর্থন প্রকাশ করে সম্ভাব্য সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছিলেন।

স্বাধীনতার পর দেশে ফিরে আবারও শিক্ষাজীবনে মনোনিবেশ করেন মিনারা বেগম। তবে যুদ্ধের অভিজ্ঞতা তার মানসিক জগতে গভীর প্রভাব ফেলেছিল বলে জানান তিনি।

তিনি বলেন, ‘মাধ্যমিক পরীক্ষায় ভালো ফল করেছিলাম। কিন্তু যুদ্ধ শেষে ফিরে আগের মতো ফলাফল আর করতে পারিনি। যুদ্ধ করা, মানুষ মারা, গ্রেনেড ব্যবহার—এসব অভিজ্ঞতা মানুষের মস্তিষ্কে প্রভাব ফেলে। তারপরও আমি থেমে থাকিনি’।

শিক্ষাজীবনে তিনি চার্টার্ড অ্যাকাউন্টেন্সি সম্পন্ন করেন এবং বাংলাদেশের প্রথম নারী হিসেবে এই বিষয়ে পড়াশোনা করার কৃতিত্ব অর্জন করেন। পরে এমবিএ শেষ করে তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানিতে প্রথম নারী কর্মকর্তা হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন।

পেশাগত জীবনে দীর্ঘদিন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন শেষে তিনি প্রতিষ্ঠানটির অর্থ বিভাগের পরিচালক হিসেবে অবসর গ্রহণ করেন।

বর্তমানে তিনি মহিলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কেন্দ্রীয় পরিষদের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এছাড়া বৃহত্তর ঢাকা সমিতির সভাপতির দায়িত্বও পালন করেছেন। অবসর-পরবর্তী সময়েও তিনি বিভিন্ন বিদ্যালয়, মহাবিদ্যালয় এবং এতিমখানার সঙ্গে যুক্ত থেকে সমাজসেবামূলক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় ভূমিকা রেখে চলেছেন।

মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের পক্ষে জনমত গড়ে তোলার প্রচেষ্টা এবং স্বাধীনতার পর দেশের উন্নয়নে তার অবদান—সব মিলিয়ে বীর নারী মিনারা বেগমের জীবন এক অনন্য সংগ্রাম, সাহস ও দেশপ্রেমের ইতিহাস হয়ে আছে।

Advertisements
নারীবীরমিনারামুক্তিযুদ্ধ