বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনশনিবার, ১৮ জুলাই, ২০২৬
সাহিত্য-সংস্কৃতি

বুকস্ট্রিমিং: নতুন প্রজন্ম কি এবার বইমুখী হবে?

বুকস্ট্রিমিং: নতুন প্রজন্ম কি এবার বইমুখী হবে?

স্মার্টফোন আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে অনেকেই মনে করেন, বই পড়ার অভ্যাস ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে। কিন্তু ঠিক এই ডিজিটাল দুনিয়াতেই বইকে ঘিরে তৈরি হয়েছে নতুন এক ট্রেন্ড — বুকস্ট্রিমিং (Bookstreaming)। অনেকের মতে, এটি তরুণদের মধ্যে বই পড়ার আগ্রহ আবারও বাড়িয়ে তুলতে পারে।

বুকস্ট্রিমিং বলতে বোঝায়, কেউ লাইভে বসে বই পড়ছেন, বই নিয়ে আলোচনা করছেন কিংবা গল্পের নানা মুহূর্তে নিজের প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছেন। দর্শকেরাও একই সময়ে মন্তব্য করছেন, প্রশ্ন করছেন এবং আলোচনায় অংশ নিচ্ছেন। ফলে একা বই পড়ার অভিজ্ঞতা বদলে যাচ্ছে সম্মিলিত পাঠের অভিজ্ঞতায়।

এই ধারা মূলত টুইচ, ইউটিউব লাইভ ও অন্যান্য লাইভস্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মে জনপ্রিয় হয়েছে। আগে এসব প্ল্যাটফর্মে গেমিং বা আড্ডাধর্মী কনটেন্ট বেশি দেখা গেলেও এখন বইও সেখানে নিজের জায়গা করে নিচ্ছে।

বুকস্ট্রিমিংয়ের সমর্থকদের মতে, আজকের তরুণদের ডিজিটাল প্ল্যাটফর্‌ম থেকে দূরে সরিয়ে বই পড়াতে বলা বাস্তবসম্মত নয়। তারা যেখানে সময় কাটায়, বইকেও সেখানে নিয়ে যাওয়াই বেশি কার্যকর হতে পারে।

Advertisements

এই প্রবণতা অনেকটা বুকটকের পরবর্তী ধাপ বলেও মনে করছেন অনেকে। টিকটকের বুকটক যেমন বহু অচেনা বইকে বেস্টসেলার বানিয়েছে, তেমনি বুকস্ট্রিমিং বই নিয়ে দীর্ঘ সময়ের আলাপ ও পাঠের পরিবেশ তৈরি করছে। এতে দর্শক শুধু বইয়ের নামই জানছেন না, বরং পড়ার আনন্দও ভাগ করে নিচ্ছেন।

বই পড়ার অভ্যাস যে সামাজিকভাবেও তৈরি হয়, সেটিও নতুন করে সামনে আনছে বুকস্ট্রিমিং। পরিচিত বা প্রিয় কোনো কনটেন্ট নির্মাতাকে বই পড়তে দেখলে দর্শকদের মধ্যেও সেই বই পড়ার আগ্রহ তৈরি হয়। ফলে বইকে ঘিরে নতুন ধরনের সাংস্কৃতিক আলোচনার পরিবেশ তৈরি হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, স্কুলের বাধ্যতামূলক পড়াশোনার বাইরে তরুণদের কাছে বইকে আনন্দের বিষয় হিসেবে তুলে ধরতে পারছে বুকস্ট্রিমিং। এখানে কঠিন সাহিত্য বিশ্লেষণের চাপ নেই, আছে সহজ আলাপ এবং পাঠের আনন্দ।

সবচেয়ে আলোচিত উদাহরণ অবশ্য জনপ্রিয় স্ট্রিমার কাই সেনাট। গেমিংয়ের বাইরে এসে তিনি লাইভে বিভিন্ন বই পড়া শুরু করেন। কঠিন শব্দের অর্থ খুঁজে দেখা কিংবা বই পড়তে গিয়ে নিজের সীমাবদ্ধতা স্বীকার করার মতো মুহূর্তগুলো দর্শকদের কাছে তাকে আরও গ্রহণযোগ্য করে তুলেছে। তার দেখাদেখি আরও অনেক স্ট্রিমার বই নিয়ে লাইভ করা শুরু করেছেন।

তবে সমালোচকেরা মনে করেন, কাউকে বই পড়তে দেখা আর নিজে বই পড়া এক বিষয় নয়। বুকস্ট্রিমিং একা সংকটের সমাধান করতে পারবে না। কিন্তু সমর্থকদের যুক্তি, এটি অন্তত বইয়ের প্রতি আগ্রহ তৈরি করতে পারে। সেই আগ্রহই মানুষকে বই হাতে তুলে নিতে উৎসাহিত করবে।

তারপরও বিশেষজ্ঞদের মতে, মানুষকে বইয়ের প্রতি আগ্রহী করে তুলতে বুকস্ট্রিমিং ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। কারণ এটি বইকে নতুন প্রজন্মের পরিচিত ডিজিটাল পরিবেশেই পৌঁছে দিচ্ছে। একসময় যেমন বইয়ের খবর পাওয়া যেত পত্রিকা, লাইব্রেরি বা বইমেলায়, এখন সেই জায়গার একটি অংশ দখল করেছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম।

বইয়ের সঙ্গে প্রযুক্তির এই মেলবন্ধন শেষ পর্যন্ত কতটা স্থায়ী হবে, তা সময়ই বলে দেবে। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—যদি একটি ভিডিও বা লাইভ কাউকে একটি নতুন বই হাতে নিতে উদ্বুদ্ধ করে, তাহলে বুকস্ট্রিমিং নিঃসন্দেহে পাঠাভ্যাস গড়ে তোলার নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে।

Advertisements
প্রজন্মবইমুখীবুকস্ট্রিমিং