বিয়ের পর স্বামীর পদবি গ্রহণ: ইসলাম কী বলে?

বর্তমান সমাজে বিয়ের পর অনেক নারী নিজের নামের সঙ্গে স্বামীর নাম বা পদবি যুক্ত করেন। কারও কাছে এটি ভালোবাসার প্রকাশ, কারও কাছে পারিবারিক পরিচয়ের অংশ। তবে ইসলামের দৃষ্টিতে বিষয়টি কেবল সামাজিক রীতি নয়; এটি ব্যক্তির বংশীয় পরিচয় ও পরিচিতির সঙ্গেও সম্পর্কিত। তাই এ বিষয়ে ইসলামের অবস্থান বোঝা গুরুত্বপূর্ণ।
ইসলামে পরিচয়ের ভিত্তি কী?
ইসলাম মানুষের পরিচয়ের ক্ষেত্রে পিতৃপরিচয়কে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। কুরআনুল কারিমে আল্লাহ তাআলা বলেন—
‘তোমরা তাদেরকে তাদের পিতৃ-পরিচয়ে ডাকো; আল্লাহর কাছে এটাই অধিক ন্যায়সঙ্গত।‘
(সুরা আল-আহযাব: ৫)
এই আয়াতের মাধ্যমে ইসলাম স্পষ্টভাবে নির্দেশ দিয়েছে যে, মানুষের বংশীয় পরিচয় তার পিতার সূত্রেই সংরক্ষিত থাকবে। বিয়ে, দত্তক গ্রহণ কিংবা অন্য কোনো কারণে সেই পরিচয় পরিবর্তন করা উচিত নয়।
স্বামীর পদবি গ্রহণের বিষয়ে আলেমদের মত
বেশিরভাগ ইসলামী চিন্তাবিদ ও আলেমের মতে, যদি কোনো নারী বিয়ের পর স্বামীর পদবি নিজের বংশীয় পরিচয় হিসেবে গ্রহণ করেন এবং এর ফলে তার মূল পিতৃপরিচয় আড়াল হয়ে যায়, তাহলে তা ইসলামী শিক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
কারণ ইসলাম চায়, একজন মানুষ তার প্রকৃত বংশপরিচয় অক্ষুণ্ণ রাখুক। একজন নারী বিয়ের মাধ্যমে স্বামীর পরিবারের সদস্য হন ঠিকই, কিন্তু তার বংশীয় পরিচয় পরিবর্তিত হয়ে যায় না। তিনি তার পিতার কন্যাই থেকে যান।
হাদিসে কী বলা হয়েছে?
রাসুলুল্লাহ (সা.) বংশীয় পরিচয় পরিবর্তনের বিষয়ে কঠোর সতর্কতা উচ্চারণ করেছেন। তিনি বলেন—
‘যে ব্যক্তি নিজের পিতা ছাড়া অন্য কারও পরিচয় গ্রহণ করে, তার ওপর আল্লাহ, ফেরেশতা ও সমগ্র মানুষের লানত।‘
(সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৩৭০)
হাদিসটির মূল শিক্ষা হলো, নিজের প্রকৃত পরিচয় গোপন করা বা অন্য পরিচয়ে নিজেকে পরিচিত করা ইসলামে নিরুৎসাহিত।
তাহলে কি স্বামীর নাম উল্লেখ করা যাবে না?
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। কোনো নারী যদি সামাজিক বা পারিবারিক কারণে “অমুকের স্ত্রী” হিসেবে পরিচিত হন, অথবা স্বামীর নাম উল্লেখ করেন, তাহলে তা ভিন্ন বিষয়। কিন্তু নিজের বংশীয় পরিচয় পরিবর্তন করে স্বামীর পদবিকে স্থায়ী পরিচয় হিসেবে গ্রহণ করা ভিন্ন বিষয়।
অর্থাৎ পরিচয় ও সম্পর্ক—এই দুই বিষয়কে আলাদা করে দেখা প্রয়োজন।
আধুনিক বাস্তবতা ও ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গি
পশ্চিমা সমাজে বিয়ের পর স্বামীর পদবি গ্রহণ একটি দীর্ঘদিনের সামাজিক রীতি। অনেক মুসলিম সমাজেও সেই প্রভাব দেখা যায়। তবে ইসলামী আইন ও নৈতিকতার আলোকে একজন নারীর পিতৃপরিচয় সংরক্ষণ করাই অধিকতর গ্রহণযোগ্য বলে অধিকাংশ আলেম মত দিয়েছেন।
তবে এ বিষয়ে সমসাময়িক কিছু আলেমের মধ্যে ব্যাখ্যাগত ভিন্নতাও রয়েছে। কেউ কেউ বলেন, যদি এটি কেবল সামাজিক পরিচয় হয় এবং বংশপরিচয় পরিবর্তনের উদ্দেশ্য না থাকে, তাহলে বিষয়টি ভিন্নভাবে বিবেচিত হতে পারে। কিন্তু পিতৃপরিচয় মুছে ফেলা বা আড়াল করা ইসলামের মূলনীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
ভালোবাসা প্রকাশের ইসলামী পন্থা
ইসলামে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের ভিত্তি হলো ভালোবাসা, দয়া ও পারস্পরিক সম্মান। এই ভালোবাসা প্রকাশের জন্য নাম পরিবর্তন আবশ্যক নয়। বরং একজন স্ত্রী স্বামীর প্রতি আন্তরিকতা, সহযোগিতা, সদাচরণ, দায়িত্বশীলতা এবং দোয়ার মাধ্যমে তার ভালোবাসা ও সম্মান প্রকাশ করতে পারেন।
ইসলাম বংশীয় পরিচয় সংরক্ষণকে অত্যন্ত গুরুত্ব দেয়। তাই বিয়ের পর একজন নারীর জন্য নিজের পিতৃপরিচয় অক্ষুণ্ণ রাখা ইসলামী শিক্ষার সঙ্গে অধিক সামঞ্জস্যপূর্ণ। স্বামীর প্রতি ভালোবাসা ও সম্মান প্রদর্শনের জন্য নাম বা পদবি পরিবর্তনের প্রয়োজন নেই; বরং উত্তম চরিত্র, দায়িত্ববোধ এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধই একটি সুন্দর দাম্পত্য জীবনের প্রকৃত ভিত্তি



