নারীর শরীর, প্রযুক্তি আর রাজনীতি: ভারতে মুসলিম নারীদের ব্যবহার করে এআই কিভাবে ছড়াচ্ছে ঘৃণার প্রচারণা?

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) আজ বিশ্বজুড়ে প্রযুক্তিগত বিপ্লবের প্রতীক। চিকিৎসা, শিক্ষা, গবেষণা থেকে শুরু করে দৈনন্দিন জীবনের নানা ক্ষেত্রে এর ব্যবহার মানুষের জীবনকে সহজ করছে। কিন্তু প্রযুক্তির এই অগ্রগতির পাশাপাশি জন্ম নিচ্ছে নতুন ধরনের ঝুঁকি। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এআই ব্যবহার করে ভুয়া ছবি, ভিডিও ও তথ্য ছড়িয়ে ব্যক্তি ও গোষ্ঠীকে লক্ষ্যবস্তু করার প্রবণতা উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। ভারতে মুসলিম নারীদের বিরুদ্ধে এমন অপব্যবহারের এক ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে সাম্প্রতিক বিভিন্ন গবেষণা ও ভুক্তভোগীদের অভিজ্ঞতায়।
কাশ্মীরের তরুণ ফ্রিল্যান্স মডেল সামরিন আইয়ুবের জীবন হঠাৎই বদলে যায় একটি ভিডিওর কারণে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া সেই ভিডিওতে তাঁর বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের বিভিন্ন ছবি ব্যবহার করা হয়েছিল। দেখলে মনে হয় যেন এটি একটি তথ্যভিত্তিক প্রতিবেদন। কিন্তু বাস্তবে ভিডিওটির প্রতিটি দাবি ছিল মিথ্যা। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি ভয়েসওভার এবং সাজানো বর্ণনার মাধ্যমে সামরিনকে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছিল, যা তাঁর ব্যক্তিগত সম্মান ও সামাজিক অবস্থানকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে।

সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় হলো, ভিডিওটি এতটাই বাস্তবসম্মত ছিল যে সাধারণ মানুষের পক্ষে সেটিকে ভুয়া বলে শনাক্ত করা প্রায় অসম্ভব। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সেটি বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে ছড়িয়ে পড়ে। শুরু হয় অপমান, কটূক্তি, হুমকি এবং চরিত্রহননের অভিযান। সামরিনের ভাষায়, এটি ছিল এক ধরনের “ডিজিটাল লিঞ্চিং”।
গবেষকরা বলছেন, সামরিনের ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়। বরং এটি একটি বৃহত্তর প্রবণতার অংশ। এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে মুসলিম নারীদের যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ বা আপত্তিকরভাবে উপস্থাপন করা এখন একটি সংগঠিত অনলাইন প্রচারণার রূপ নিচ্ছে।
ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর দ্য স্টাডি অব অর্গানাইজড হেট (সিএসওএইচ)-এর বিশ্লেষণে দেখা গেছে, গত কয়েক বছরে শত শত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অ্যাকাউন্ট থেকে মুসলিম নারীদের লক্ষ্য করে তৈরি করা এআই-নির্ভর ছবি ও ভিডিও ব্যাপকভাবে ছড়ানো হয়েছে। এসব কনটেন্ট কোটি কোটি মানুষের কাছে পৌঁছেছে এবং বিপুল প্রতিক্রিয়া পেয়েছে।
গবেষণায় একটি উদ্বেগজনক ধারা লক্ষ্য করা গেছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে মুসলিম নারীদের যৌনায়িত বা অবমাননাকরভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। একই সঙ্গে মুসলিম পুরুষদের দেখানো হয়েছে সহিংস বা নৈতিকভাবে দুর্বল চরিত্র হিসেবে। অন্যদিকে সংখ্যাগরিষ্ঠ সম্প্রদায়ের পুরুষদের উপস্থাপন করা হয়েছে ‘উদ্ধারকারী’ হিসেবে। ফলে প্রযুক্তিকে ব্যবহার করে একটি রাজনৈতিক ও সামাজিক বয়ান প্রতিষ্ঠার চেষ্টা স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

মিডিয়া বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি কেবল নারীবিদ্বেষের বিষয় নয়; বরং রাজনীতি, পরিচয় ও ক্ষমতার লড়াইয়ের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। নারীর শরীরকে রাজনৈতিক প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করার প্রবণতা নতুন নয়, তবে এআই সেই প্রক্রিয়াকে আরও দ্রুত, আরও ব্যাপক এবং আরও বিপজ্জনক করে তুলেছে।
মিউনিখের লুদভিগ ম্যাক্সিমিলিয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক সহানা উদুপি এই ঘটনাকে “রাজনীতির যৌনকরণ” বা “পর্নিফিকেশন অব পলিটিক্স”-এর অংশ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তাঁর মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মিম, হাস্যরস ও যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ কনটেন্টের আড়ালে ঘৃণা ও নির্যাতনকে স্বাভাবিক করে তোলা হচ্ছে। এর ফলে সংখ্যালঘু ও নারীরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।
এই অনলাইন আক্রমণের প্রভাব কেবল ভার্চুয়াল জগতে সীমাবদ্ধ থাকে না। সামরিনের মতো অনেকের পেশাগত জীবনও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। একজন মডেল হিসেবে তাঁর পরিচিতি ও বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। সম্ভাব্য ক্লায়েন্টরা দূরে সরে যায়, কাজের সুযোগ কমে আসে। এমনকি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, যা একসময় তাঁর কাজের প্রধান মাধ্যম ছিল, সেটিও তাঁর কাছে অনিরাপদ হয়ে ওঠে।
আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, আইনি প্রতিকার পাওয়াও কঠিন। আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিদ্যমান আইন অনেক ক্ষেত্রে এআই-নির্মিত ভুয়া কনটেন্টের বিরুদ্ধে কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা যায় না। কারণ বাস্তবে কোনো ছবি ধারণ না করা হলেও কৃত্রিমভাবে তৈরি ছবি বা ভিডিও মানুষের সম্মানহানি ও মানসিক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। অথচ আইনের ভাষা এখনও সেই বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি খাপ খাইয়ে উঠতে পারেনি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সমস্যা শুধু প্রযুক্তির নয়; এটি সামাজিক, রাজনৈতিক এবং নৈতিক সংকটও। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যত উন্নত হচ্ছে, ততই প্রয়োজন হচ্ছে শক্তিশালী নীতিমালা, জবাবদিহিমূলক প্ল্যাটফর্ম ব্যবস্থা এবং দ্রুত আইনি সুরক্ষা।
প্রযুক্তি মানুষের জীবনকে এগিয়ে নিতে পারে, আবার সেটিই মানুষের বিরুদ্ধে অস্ত্র হিসেবেও ব্যবহৃত হতে পারে। মুসলিম নারীদের বিরুদ্ধে এআই-নির্ভর এই অপপ্রচার সেই বাস্তবতারই একটি কঠিন উদাহরণ। প্রযুক্তির অগ্রযাত্রার এই সময়ে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো- উদ্ভাবনের সঙ্গে মানবিক নিরাপত্তা ও মর্যাদার সুরক্ষা কতটা নিশ্চিত করা যাচ্ছে? সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পাওয়াই এখন সময়ের দাবি।



