বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনমঙ্গলবার, ১৬ জুন, ২০২৬
নারী

‘এই সুন্দরী নারীটি জীবনের সব সুখ পাওয়ার যোগ্য’- মায়ের দ্বিতীয় বিয়েতে ছেলের শুভেচ্ছা বার্তা

ma

‘আমার মা বিয়ে করেছেন’— সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছেলের এই ধরনের পোস্ট সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তোলপাড় তৈরি করেছে।

বাংলাদেশের বাস্তবতায় এটি কেবল একটি বিয়ের সংবাদ নয়; এটি বহু বছরের সামাজিক সংকোচ, একাকীত্ব, কুসংস্কার এবং নারীদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া অদৃশ্য শৃঙ্খলের বিরুদ্ধে এক সাহসী ঘোষণা।

সম্প্রতি এক তরুণ তার মায়ের পুনর্বিবাহের খবর জানিয়ে আবেগঘন একটি পোস্ট করেছেন। সেখানে তিনি লিখেছেন, একজন সিঙ্গেল মাদার হিসেবে দুই দশকেরও বেশি সময় সংগ্রাম করার পর তার মা অবশেষে নিজের জন্য একটি সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। ছেলের ভাষায়, ‘এই সুন্দরী নারীটি জীবনের সব সুখ পাওয়ার যোগ্য’।

বাংলাদেশের সমাজে একজন পুরুষের দ্বিতীয় বিয়ে যতটা সহজভাবে গ্রহণ করা হয়, একজন বিধবা, তালাকপ্রাপ্ত বা স্বামী পরিত্যক্ত নারীর বিয়েকে ততটাই প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়। আজও অনেক নারী নতুন করে সংসার গড়ার সিদ্ধান্ত নিলে তাকে শুনতে হয় নানা কটূক্তি, সামাজিক বিচার এবং চরিত্র নিয়ে অযাচিত মন্তব্য।

অথচ কেউ প্রশ্ন করে না—যে নারীটি স্বামী হারানোর পর বা বিচ্ছেদের পর ২০, ৩০ কিংবা ৪০ বছর একা জীবন কাটিয়ে দিচ্ছেন, তার মানসিক চাহিদা, নিরাপত্তা, ভালোবাসা পাওয়ার অধিকার কিংবা সঙ্গীর প্রয়োজনের কথা। সমাজ যেন ধরে নেয়, একজন নারীর ব্যক্তিগত জীবন তার স্বামীর মৃত্যুর সঙ্গেই শেষ হয়ে গেছে।

সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো, আমাদের সমাজে এখনও অনেক ক্ষেত্রে বিধবা নারীর বিয়েকে ‘লজ্জার’ বা ‘কলঙ্কের’ বিষয় হিসেবে দেখা হয়। যেন একজন নারী সারাজীবন নিঃসঙ্গতা বয়ে বেড়ালে সেটাই সম্মানের, কিন্তু নিজের সুখের জন্য নতুন জীবন শুরু করতে চাইলে সেটি অপরাধ।

বাস্তবতা হলো, একাকীত্ব কোনো রোমান্টিক বিষয় নয়। দীর্ঘদিনের নিঃসঙ্গতা মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর গভীর প্রভাব ফেলে। বিষণ্ণতা, উদ্বেগ, আত্মসম্মানবোধের সংকট—এসবের সঙ্গে প্রতিনিয়ত লড়াই করতে হয় অসংখ্য নারীকে। কিন্তু তাদের এই সংগ্রাম নিয়ে সমাজ খুব কমই কথা বলে। কারণ আমরা নারীর ত্যাগকে উদযাপন করতে শিখেছি, কিন্তু তার সুখকে নয়।

এই ঘটনাটি তাই শুধু একটি বিয়ের গল্প নয়। এটি একজন নারীর নিজের জীবনের ওপর নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠার গল্প। এটি এমন এক ছেলের গল্প, যিনি মায়ের সুখকে সামাজিক ভয় কিংবা লোকলজ্জার চেয়ে বড় মনে করেছেন। এটি এমন একটি পরিবারের গল্প, যারা একজন নারীর ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তকে সম্মান করেছে।

বাংলাদেশে নারী অধিকার নিয়ে অনেক আলোচনা হয়। কিন্তু প্রকৃত ক্ষমতায়ন তখনই হবে, যখন একজন নারী তার জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো সমাজের অনুমতি নয়, নিজের ইচ্ছা অনুযায়ী নিতে পারবেন। যখন একজন বিধবা বা তালাকপ্রাপ্ত নারীর পুনর্বিবাহকে ব্যতিক্রম নয়, স্বাভাবিক ঘটনা হিসেবে দেখা হবে। যখন একজন নারীর পরিচয় শুধু কারও স্ত্রী বা কারও মা হিসেবে নয়, একজন স্বাধীন মানুষ হিসেবেও মূল্যায়িত হবে।

সমাজের কাছে প্রশ্ন রয়ে যায়—একজন পুরুষের নতুন জীবন শুরু করার অধিকার যদি থাকে, তবে একজন নারীর কেন থাকবে না?

একজন নারীও মানুষ। তারও ভালোবাসা পাওয়ার অধিকার আছে। তারও হাসার অধিকার আছে। তারও নতুন করে জীবন শুরু করার অধিকার আছে।

আর সেই অধিকারকে সম্মান করাটাই হওয়া উচিত একটি সভ্য সমাজের পরিচয়।

ছেলেবিয়েমাশুভেচ্ছা