Skip to content

২০শে আগস্ট, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ | শনিবার | ৫ই ভাদ্র, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

পুরুষের ধূমপানে ‘দোষ নেই’, নারীর বেলায় খড়্গহস্ত?

ছবি : সংগৃহীত

বিশ্বে নারীর ক্ষমতায়ন অনেকটা বেড়েছে সত্য। কিন্তু নারীদের জন্য জীবনের সব ক্ষেত্রে পুরুষের সমান অধিকার এখনো নিশ্চিত হয়নি। বরং বৈষম্য এখনো প্রকট। বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বব্যাপী নারীরা গড়ে পুরুষের ৭৫ ভাগ সমান অধিকার ভোগ করে। পরিবার, কর্মস্থল থেকে শুরু করে সর্বত্রই নারী বৈষম্যের শিকার। শুধু অধিকারের বেলায়ই নয়, সামাজিক বিভিন্ন নিয়ম-নীতিতেও রয়েছে নারী-পুরুষের বৈষম্য। অথচ একই সমাজে বসবাস করা প্রতিটি মানুষের থাকা উচিত একই ধরনের অধিকার, ভোগ করা উচিত একই ধরনের সুযোগ-সুবিধা। নিয়ম হওয়া উচিত সর্বসাধারণের জন্য সমান।

কিন্তু সমাজ যেন চলছে উল্টো পথে। পুরুষ পোশাক নির্বাচনের সময় যেকোনো ধরনের পোশাক নির্বাচন করতে পারলেও নারীর বেলায় সে অধিকার দিতে নারাজ। পুরুষ রাত করে ঘরে ফিরতে পারলেও নারীর জন্য ওঁত পেতে থাকে হাজারো প্রশ্ন। উচ্চপদগুলোতে নারীদের নিয়োগ দিতে কর্তৃপক্ষের কত গড়িমসি। প্রকাশ্যে পুরুষ ধূমপান করতে পারলেও নারীর বেলায় তা মহাপাপ। সমাজের নিয়মে কেন এত বিভেদ। নিয়মের বেলায় কেন জাত, ধর্ম, বর্ণ, লিঙ্গ ভেদাভেদ করা হয়।

নিষেধাজ্ঞা জারি করতে হলে তা ধর্ম, বর্ণ, জাতি, লিঙ্গ নির্বিশেষে করা উচিত। ছবি : সংগৃহীত

সমাজে কোনো বিষয়ের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করতে হলে তা ধর্ম, বর্ণ, জাতি, লিঙ্গ নির্বিশেষে করতে হবে। রাত ১০ টার পর ঘর থেকে বের হওয়াকে যদি অন্যায়ের চোখে দেখা হয়, তবে তা নারী-পুরুষ উভয়ের ক্ষেত্রে সমানভাবে দেখতে হবে। ধূমপান স্বাস্থ্যের পক্ষে ক্ষতিকর এ বিষয়ে সন্দেহ নেই। তবে তা নারীপুরুষ নির্বিশেষে সবার জন্য ক্ষতিকর। তবে শুধু নারীর বেলায় তা অন্যায়ের চোখে দেখা হবে কেন। আবার যেখানে দেশের আইনেও নারীর ধূমপানকে আলাদা করে অন্যায় হিসেবে চিহ্নিত করা হয়নি সেখানে একটি নির্দিষ্ট শ্রেণির মানুষ বরাবরই নারীর ধূমপানকে অন্যায় বলে স্মরণ করিয়ে দেয়।

বিভিন্ন সময় বিভিন্ন অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের বদৌলতে সামনে এসেছে। যেখানে দেখা গিয়েছে নারীকে প্রকাশ্যে ধূমপান করার কারণে পুরুষতান্ত্রিক নিপীড়ন-হেনস্থার শিকার হতে হচ্ছে। কিন্তু এবার জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে নারীর ধূমপান নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে কথা বললেন জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্য কাজী ফিরোজ। তিনি বলেন, ‘প্রাইভেট ইউনিভার্সিটির সামনে মেয়েদের হাতে সিগারেট দেখি। এক হাতে কাপ, এক হাতে সিগারেট। একটা ছেলে, একটা মেয়ে হাত ধরে হাঁটাহাঁটি করতেছে, সিগারেট খাচ্ছে। এটা কোন সংস্কৃতিতে পরে, কোন শিক্ষায় পরে?’ এছাড়া তিনি সংসদে উপস্থিত সবার উদ্দেশে বলেন, ‘আমরাও তো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছি। এখানে যারা আছেন সবাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছেন। অতএব, শিক্ষার মান শুধু কমেনি, চরম নৈতিক অধঃপতনও ঘটেছে।’

জাতীয় পার্টির (জাপা) সংসদ সদস্য কাজী ফিরোজ রশীদ। ছবি : সংগৃহীত

ঘুরেফিরে এই সংসদ সদস্যও সমাজের সেই তথাকথিত ট্যাবুগুলোকেই যেন উসকে দিলেন। তার বক্তব্যে টেনে আনলেন লিঙ্গ-বৈষম্য। তার বক্তব্যে প্রকাশ পায় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের নারী শিক্ষার্থীদের সিগারেট খাওয়া দেখে তিনি বেশ বিচলতি এবং হতাশ। তার কাছে পুরুষদের ধূমপান করার বিষয়টি স্বাভাবিক হলেও নারীর বেলায় তা অস্বাভাবিক। তাইতো নারীর ধূমপান নিয়ে তিনি এতো বিচলিত। পুরুষ যুগের পর যুগ প্রকাশ্যে ধূমপান করে আসলেও তাতেও নৈতিক অবক্ষয় খুব একটা ঘটতে দেখেননি তিনি। তবে বর্তমানে আধুনিক নারীদের এক হাতে চায়ের কাপ আর অন্য হাতে সিগারেট, নৈতিক অবক্ষয় নিয়ে তাকে ভাবাচ্ছে।

নারী স্বাধীনতার জন্য পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নেহাত কম লড়াই করতে হয় না। এককালে নারী শুধু মুখ বুঝে মেনে নিতে জানতো। নারীর উপর চাপিয়ে দেয়া সব অন্যায়, অত্যাচার নারী নীরবে সহ্য করতো। কিন্তু ধীরে ধীরে নারী স্বাধীনতার কথা চিন্তা করছে, নিজের স্বাধীন জীবন উপভোগের চেষ্টা করলেও পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতার একদল লোক এতে সমাজের অধঃপতন কিংবা এই সংসদ সদস্যের মত নৈতিক অবক্ষয় খুঁজে পান। বস্তুত এ সবকিছুই নারী স্বাধীনতার পথে বাধা সৃষ্টি করার তরিকা বলা চলে। অথচ তিনি ধূমপান নারী-পুরুষ সবার জন্য ক্ষতিকর বা অন্যায় কথাটি সবাইকে স্মরণ করিয়ে দিতে পারতেন।

নারীকে হেনস্তা করার ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটতে পারে হরহামেশা। ছবি : সংগৃহীত

তার কথার প্রভাব পরতে পারে প্রগতিশীল নারীদের ওপর, পরিবারের ওপর এমনকি সমাজের ওপর। জাতীয় সংসদের মত জায়গায় যেখানে নারী স্পিকারের সামনে, নারী সংসদ সদস্যদের সামনে নারী-পুরুষ বৈষম্য করে বক্তব্য দেওয়া হয়, সেখানে যে কেউ বুক ফুলিয়ে নারী স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ পেয়ে যাবে। নারী-পুরুষের মধ্যকার যে বৈষম্য, তা আরও প্রকট হতে পারে। যেমন, বেশ কিছুদিন আগে রাজশাহীতে এক তরুণী প্রকাশ্যে ধূমপান করার কারণে ২০-২৫ জন লোক একজোট হয়ে তাকে হেনস্তা করেন। এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটতে পারে হরহামেশা।

কোনো ধরনের অন্যায় সমাজে গ্রহণযোগ্য নয়। প্রতিটি অন্যায়ের বিরুদ্ধে সবার আগে আওয়াজ তোলা উচিত সমাজের বিশেষজ্ঞদের, জনপ্রতিনিধিদের। একজন জনপ্রতিনিধি হিসেবে কাজি ফিরোজ রশিদের ধূমপান স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর কিংবা প্রকাশ্যে ধূমপানে নৈতিক অবক্ষয় ঘটছে তা স্মরণ করিয়ে দেওয়া নিঃসন্দেহে দরকারি পদক্ষেপ। তবে বিষয়টিতে শুধু নারীর ধূমপানকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানোই প্রশ্ন উঠছে প্রগতিশীল মানুষের মনে। তিনি নারীস্বাধীনতা কিংবা নারী অধিকারকে যেভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন, তার উচিত নিজের বক্তব্য প্রত্যাহার করা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ধূমপান নিয়ে নিষেধাজ্ঞা থাকলে নারী-পুরুষ উভয়ের ক্ষেত্রেই যেন তা প্রয়োগ হয়, সে বিষয়ে জোর দেওয়া।

অনন্যা/জেএজে