বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনশুক্রবার, ২৬ জুন, ২০২৬
বিবিধ

হাতে ছাপা নকশায় সময়ের গল্প বলে যে মাধ্যম – ব্লক প্রিন্টের মুগ্ধতা

Block-Printing-in-Jaipur

ছোট-বড়-মাঝারি। কোনোটা লম্বা, কোনোটা গোল তো কোনোটা চৌক। আছে কলকা, ফ্লোরাল, পেইজলির মতো আউট অব দ্য বক্স মোটিফও। প্রতিটিই কাঠের ব্লক। তার ওপর খোদাই করা নকশা। যাতে রকমারি রং মাখিয়ে কাপড়ের ওপর চেপে ধরে সেই ছাপ ফুটিয়ে তোলা হয় হুবহু। এরই পুঁথিগত নাম ব্লকপ্রিন্ট। উৎস বাংলায় নয়, পুরোপুরি মেইড ইন চায়না। কিন্তু বাঙালি হস্তশিল্পের তালিকায় এর নাম থাকবে না— তা হবে না! কোনো রিপিট মার্ক না রেখেই প্রতিটি ব্লক ধরে ধরে কাপড়ে তার ছাপ ফেলা, কাজটি কিন্তু সহজ নয়। সময়সাপেক্ষ তো বটেই, পরিশ্রমও কোনো অংশে কম লাগে না। ফলে মেশিনে ব্লক প্রিন্টিংয়ের চাহিদা ক্রমশ ঊর্ধ্বমুখী। কিন্তু দেশে এখনো পুরোনো পদ্ধতি মেনেই ব্লক প্রিন্ট করতে দেখা যায় বেশির ভাগ কারিগরকে। দক্ষ ও সুনিপুণ হাতের ছোঁয়া থাকে বলে ব্লক প্রিন্টের চিরন্তন এই কৌশল আজও আবেদন হারায়নি।

ব্লক প্রিন্ট এর ইতিহাস

আজ থেকে ৪০০০ হাজার বছর আগে চায়নাতে মুলত কাঠের ব্লক প্রিন্ট এর প্রচলন শুরু হয়, এটি মুলত সিল্ক কাপড়ের উপরে অক্ষর ছাপানোর কাজে ব্যবহার করা হত। যদিও চীনারা তিন রঙের সমন্বয়ে ফুল, লতা, পাতা দিয়ে মুদ্রণ শুরু করে।

দশম শতাব্দীর দিকে মিশরে ব্লক প্রিন্টের ব্যবহার দেখা যায়, আরবিতে একে বলা হতো “তারশ”। সে সময় কাপড় মোমে চুবিয়ে নানা রকম নকশা করা হতো। সেই কাপড় দিয়ে মমি সংরক্ষণ করা হতো। পরবর্তীতে কাপড় ডিজাইন করার জন্য এই পদ্ধতি অনুসরণ করে- জাপান, ভারত, শ্রীলংকা, আফ্রিকা সহ বিভিন্ন দেশে ‘বাটিক’ নামে ছড়িয়ে পরে।

১২ শতাব্দীতে ভারত উপমহাদেশে ব্লক প্রিন্টিং এর জন্য নিদিষ্ট কিছু সেন্টার তৈরি হলো, যেমন- সাউথ,ইস্টার্ন, ওয়েস্টার্ন উপকূলে ব্লকের টেক্সটাইল মিলগুলো তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য। এছাড়া গুজরাট , রাজস্থান, অন্ধ্রপ্রদেশে ব্লকের জন্য বিখ্যাত সব টেক্সটাইল মিল রয়েছে ।

১৭৬০ সালে যখন জাপানে ব্লক প্রিন্টের প্রসার ঘটে তখন তিন রঙের মুদ্রনে সীমিত থাকে নি, বহু রঙের মুদ্রণে এটির ব্যবহার হতে থাকে। সাধারণত বই ছাপার কাজে এর মুদ্রন ব্যবহার হয়েছিলো। জাপানে এই প্রক্রিয়াকে বলা হতো “নিশিকি”।

১৯ শতকে ব্লক প্রিন্টিং শিল্পটা সারা বিশ্বে পরিচিতি পেতে শুরু করে। কেননা ঐ সময় টাতে বৃটিশরা বিভিন্ন দেশে বানিজ্য করা শুরু করে। ভারতে ব্লকের পোশাক নিয়ে তারা সারা বিশ্ব বানিজ্য করে। এবং তা ভারতের সৃষ্টিশীল এবং সৃজনশীল কাজ ধীরে ধীরে বিশ্বে ছড়িয়ে পরতে থাকে।

বাংলাদেশে ব্লক প্রিন্ট

বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের যাত্রা শুরু হয় ষাটের দশকে। তবে এই শিল্প রপ্তানি খাত হিসেবে বিকাশ লাভ করে সত্তরের দশকের শেষের দিকে। বর্তমানে এটি বাংলাদেশের বৃহত্তম রপ্তানিমুখী শিল্প হিসেবে স্বীকৃত। পাশাপাশি, দেশীয় ফ্যাশন হাউজগুলো ১৬ কোটি মানুষের বিশাল অভ্যন্তরীণ বাজারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে।

শুরুর দিকে দেশীয় ফ্যাশনের একটি বড় অংশ জুড়ে ছিল ব্লক প্রিন্টের প্রাধান্য। এই প্রাধান্য ক্রমে পৌঁছে যায় ব্যক্তি পর্যায়ে। বাসা-বাড়িতে নিজেদের উদ্যোগে ব্লক প্রিন্টিং চলতে থাকে। একটি হাতে বানানো বিছানার চাদর বা পছন্দের নকশায় প্রিন্ট করা একটি শাড়ি বৈশাখ উদযাপনের অন্যতম অংশ হয়ে ওঠে। এভাবে ব্লক প্রিন্টের ঐতিহ্য শহর থেকে ছড়িয়ে পড়ে গ্রামাঞ্চলেও।

বর্তমানে ব্লক প্রিন্টিংয়ে জিওমেট্রিক ডিজাইনের ব্যাপক ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়। এর শিকড় খুঁজে পাওয়া যায় মোগল যুগে, যখন ব্লক প্রিন্টে জিওমেট্রিক নকশার ব্যবহার শুরু হয়। একই সঙ্গে ফুল, পাখি, পশু ইত্যাদির মোটিফ যুক্ত হয়ে ব্লক প্রিন্টকে আরও নান্দনিক ও বৈচিত্র্যময় করে তোলে। এই ঐতিহ্যবাহী প্রক্রিয়া আজও বাংলাদেশের ফ্যাশন শিল্পে একটি অনন্য রূপ এবং নিজস্বতার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত।

কোন কাপড়ে ব্লক প্রিন্ট করা যায়?

যে কোন কাপড় খন্ডেই ব্লক প্রিন্ট করা যায়। নির্ভর করছে সেই কাপড় খন্ড দিয়ে পরবর্তিতে কি বাননো হবে। সিল্ক, মাসলিন, সুতি এব কাপড়ে খুব সহজেই টেকসই প্রিন্ট করা যায় যা দিয়ে শাড়ি, ড্রেস, বিছানার চাদর, বালিশের কাপড়, পর্দা তৈরী করা যেতে পারে। খেয়াল রাখতে হবে প্রিন্টং এর সময় পরিমানমত কেমিকাল এবং প্রিন্টিং এর পরে পর্যাপ্ত হিট আয়রন করে রং টা পাকা করতে হবে। তা হলে অনেক দিন পর্যন্ত ভালো থাকবে।

ব্লক খোদাই কারিগরদের ভুমিকা

ব্লক প্রিন্টিংয়ের জন্য কাঠের টুকরোতে নকশা তুলতে বা খোদাই করতে দক্ষ কারিগরের ভূমিকা অপরিহার্য। দক্ষ খোদাই শিল্পী ছাড়া ব্লকের কোনো কার্যকর ব্যবহার সম্ভব নয়। ব্লক তৈরির প্রথম ধাপে প্রয়োজন হয় নকশা খোদাই শিল্পীর, যিনি কাঠের টুকরোতে সূক্ষ্মভাবে নকশা তুলে দেন। খোদাই করার আগে শিল্পীরা প্রথমে একটি কাগজে নকশা এঁকে নেন বা কার্বন পেপারের সাহায্যে সরাসরি কাঠের টুকরোতে নকশাটি স্থানান্তর করেন। এরপর কাঠ খোদাইয়ের জন্য বিশেষ টুলস ব্যবহার করে খুব যত্নসহকারে কাঠে নকশা তৈরি করেন। ব্লক প্রিন্টিংয়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং শ্রমসাধ্য কাজ এটি। তবে এই শিল্পীরা প্রায়ই থেকে যান আড়ালে, তাদের অবদানের যথাযথ স্বীকৃতি মেলে না।

ব্লকের নকশা এবং ফিনিশিংয়ের মান সরাসরি প্রিন্টিংয়ের গুণগত মান নির্ধারণ করে। ভালো ডিজাইন এবং নিখুঁত ফিনিশিং ছাড়া ব্লক প্রিন্টের সৌন্দর্য ফুটিয়ে তোলা সম্ভব নয়।

ব্লক তৈরির কাঠের ক্ষেত্রেও বিভিন্ন ধরনের ভিন্নতা রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, ভারতের খোদাই শিল্পীরা সাধারণত শিশাম গাছের কাঠ ব্যবহার করেন, যা টেকসই এবং উচ্চমানের। অন্যদিকে, বাংলাদেশে সাধারণত আম গাছের কাঠ ব্যবহার করা হয়, যা তুলনামূলকভাবে কম খরচে পাওয়া যায়। প্রতিটি ব্লক সাধারণত ১ থেকে ৩ ইঞ্চি গভীরতায় খোদাই করা হয়।

খোদাই করার পর ব্লকগুলোর টেকসইতা নিশ্চিত করতে এগুলো সরিষার তেলে ডুবিয়ে রাখা হয়। এতে কাঠ কিছুটা নরম হয় এবং প্রিন্টিংয়ের সময় রং ভালোভাবে কাঠের গায়ে লেগে থাকে। তেলের এই প্রক্রিয়া ব্লকের স্থায়িত্ব বাড়ায় এবং সেগুলো দীর্ঘদিন ব্যবহার উপযোগী থাকে। এইভাবে, দক্ষ খোদাই শিল্পীদের নিবিড় শ্রম এবং সৃজনশীলতায় তৈরি হয় ব্লক, যা ব্লক প্রিন্টিংয়ের মূল ভিত্তি এবং সৌন্দর্যের উৎস।

ব্লকের কাপড়ের যত্ন-আত্তি

ব্লক প্রিন্টের কাপড় সাধারণত কিছুদিন পর রঙ মলিন হয়ে যেতে পারে। তবে সঠিক যত্ন নিলে এই পোশাকগুলো দীর্ঘদিন ধরে তাদের আবেদন বজায় রাখতে পারে। হালকা রঙের কাপড়ে প্যাস্টেল শেডের রং ব্যবহার করলে রঙের হেরফের কম হয়। তবে সমস্যাটি বেশি দেখা যায় যখন গাঢ় রঙের কাপড়ে পাউডার পেস্ট ব্যবহার করে উজ্জ্বল রঙের প্রিন্ট করা হয়।

যত্নের উপায়:

১. শ্যাস্পু বা সাবান ব্যবহার:
হালকা ক্ষারযুক্ত শ্যাস্পু বা সাবান দিয়ে ব্লক প্রিন্টের কাপড় ধোয়া উচিত। এটি কাপড়ের মলিনতা কমাতে সাহায্য করে।

২. সূর্যের আলোতে না শুকানো:
প্রিন্ট করা কাপড় সরাসরি সূর্যের আলোতে শুকানো উচিত নয়। সরাসরি সূর্যের তাপে উজ্জ্বল রং ফেড হয়ে যেতে পারে। তাই ছায়ায় শুকানোর পরামর্শ দেওয়া হয়।

৩. আলমারিতে সংরক্ষণ:
কাপড় আলমারিতে ঝুলিয়ে রাখা যেতে পারে। পোকার হাত থেকে রক্ষা করতে আলমারিতে ন্যাপথেলিন ব্যবহার করা যেতে পারে।

এইসব যত্নবিধি মেনে চললে ব্লক প্রিন্টের পোশাকের সৌন্দর্য ও স্থায়িত্ব বজায় রাখা সম্ভব।

নকশাবাংলাদেশব্লক প্রিন্ট