ঠোঁটে বিশাল প্লেট, তবু এটাই সৌন্দর্য!

সৌন্দর্যের সংজ্ঞা কি সবার কাছে এক? কেউ মনে করেন ফর্সা ত্বক সুন্দর, কেউ আবার লম্বা চুল বা সুঠাম দেহকে সৌন্দর্যের প্রতীক হিসেবে দেখেন। কিন্তু পৃথিবীর এমন কিছু সমাজ আছে, যেখানে সৌন্দর্যের ধারণা আমাদের প্রচলিত চিন্তাধারা থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। পূর্ব আফ্রিকার দেশ ইথিওপিয়ার কিছু আদিবাসী সম্প্রদায়ের নারীদের কাছে সৌন্দর্যের অন্যতম প্রতীক হলো ঠোঁটে পরা বিশাল আকারের প্লেট। শুনতে অবাক লাগলেও শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চলে আসা এই ঐতিহ্য আজও বিশ্বের মানুষের কৌতূহলের কেন্দ্রবিন্দু।
ইথিওপিয়ার দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ওমো উপত্যকায় বসবাসকারী মুরসি ও সুরমা সম্প্রদায়ের নারীরা মূলত এই প্রথার জন্য পরিচিত। এসব সম্প্রদায়ের মেয়েরা সাধারণত কৈশোরে পৌঁছানোর পর নিচের ঠোঁটে একটি ছোট ছিদ্র করান। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই ছিদ্রে ধীরে ধীরে বড় আকারের মাটির বা কাঠের তৈরি প্লেট বসানো হয়। প্রথমে ছোট আকারের প্লেট ব্যবহার করা হলেও পরবর্তীতে বড় প্লেট দিয়ে ঠোঁট প্রসারিত করা হয়। অনেক সময় প্লেটের ব্যাস কয়েক ইঞ্চি পর্যন্ত হয়ে থাকে। বাইরের দৃষ্টিতে এটি কষ্টকর ও অস্বাভাবিক মনে হতে পারে। কিন্তু স্থানীয়দের কাছে এটি কেবল অলংকার নয়; বরং তাদের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। একজন নারী কত বড় প্লেট পরতে পারেন, তা অনেক ক্ষেত্রে তার ধৈর্য, সাহস এবং সামাজিক অবস্থানের প্রতীক হিসেবেও বিবেচিত হয়।
এই প্রথার উৎপত্তি নিয়ে বিভিন্ন মত রয়েছে। কিছু গবেষক মনে করেন, অতীতে দাস ব্যবসার সময় নারীদের দাস হিসেবে অপহরণ থেকে রক্ষা করার জন্য ঠোঁটে বিকৃতি সৃষ্টি করা হতো। ধারণা করা হয়, এতে নারীদের কম আকর্ষণীয় মনে হবে এবং দাস ব্যবসায়ীদের আগ্রহ কমবে। তবে ইতিহাসবিদদের অনেকেই এই ব্যাখ্যাকে পুরোপুরি গ্রহণ করেন না। তাদের মতে, এটি মূলত একটি সাংস্কৃতিক ও সামাজিক প্রথা, যা সময়ের সঙ্গে সৌন্দর্যের প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
মুরসি সমাজে লিপ প্লেট বা ঠোঁটের প্লেটকে নারীর প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার একটি চিহ্ন হিসেবেও দেখা হয়। বিয়ের উপযুক্ত বয়সে পৌঁছানোর পর অনেক তরুণী এই প্রথা অনুসরণ করেন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্লেটের আকারের সঙ্গে বিয়ের সময় পরিবারের মর্যাদা বা সামাজিক সম্মানের বিষয়ও জড়িয়ে থাকে বলে স্থানীয়দের মধ্যে বিশ্বাস রয়েছে।
তবে একটি প্রচলিত ধারণা হলো- যার প্লেট যত বড়, সে তত বেশি সুন্দরী। বাস্তবে বিষয়টি এতটা সরল নয়। স্থানীয় সংস্কৃতিতে বড় প্লেট অবশ্যই প্রশংসিত হতে পারে, কিন্তু এটি কেবল সৌন্দর্যের মাপকাঠি নয়। এর সঙ্গে ঐতিহ্য, সামাজিক পরিচয়, আত্মমর্যাদা এবং সম্প্রদায়ের মূল্যবোধ গভীরভাবে যুক্ত।
বর্তমান বিশ্বায়নের যুগে এই ঐতিহ্যও পরিবর্তনের মুখোমুখি। আধুনিক শিক্ষা, প্রযুক্তির বিস্তার, শহরমুখী জীবনধারা এবং বাইরের সংস্কৃতির প্রভাব তরুণ প্রজন্মের চিন্তাভাবনায় পরিবর্তন এনেছে। ফলে অনেক তরুণী এখন আর লিপ প্লেট পরতে আগ্রহী নন। আবার কেউ কেউ এটি ধারণ করেন নিজেদের সাংস্কৃতিক শিকড়কে ধরে রাখার প্রতীক হিসেবে।
পর্যটনের কারণেও এই ঐতিহ্য নতুন মাত্রা পেয়েছে। প্রতি বছর বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে হাজার হাজার পর্যটক ওমো উপত্যকায় আসেন এই অনন্য সংস্কৃতি কাছ থেকে দেখার জন্য। রঙিন পোশাক, ঐতিহ্যবাহী অলংকার এবং ঠোঁটের প্লেট পরা নারীদের ছবি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। ফলে মুরসি নারীরা আজ বিশ্বের অন্যতম আলোচিত সাংস্কৃতিক প্রতীকে পরিণত হয়েছেন।
তবে এই প্রথা নিয়ে বিতর্কও রয়েছে। মানবাধিকারকর্মী ও স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ মনে করেন, ঠোঁট কেটে দীর্ঘ সময় ধরে প্লেটের আকার বড় করা শারীরিক জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে। অন্যদিকে সম্প্রদায়ের সদস্যরা এটিকে তাদের সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা এবং ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে দেখেন। তাই বাইরের দৃষ্টিভঙ্গি ও স্থানীয় সংস্কৃতির মধ্যে একটি সূক্ষ্ম ভারসাম্যের প্রশ্নও এখানে উঠে আসে। বিশ্বের বিভিন্ন সমাজে সৌন্দর্যের ধারণা ভিন্ন। কোথাও লম্বা গলা, কোথাও উল্কি, কোথাও আবার বিশেষ ধরনের পোশাক সামাজিক মর্যাদার প্রতীক। ইথিওপিয়ার মুরসি নারীদের ঠোঁটের প্লেট সেই বৈচিত্র্যময় মানবসভ্যতারই একটি অনন্য উদাহরণ। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, সৌন্দর্য কোনো সার্বজনীন ধারণা নয়; বরং তা সমাজ, সংস্কৃতি ও ইতিহাসের আলোকে গড়ে ওঠে।
আমাদের কাছে যা অদ্ভুত, অন্য কারও কাছে তা হতে পারে গর্বের বিষয়। আর এ কারণেই পৃথিবীর সংস্কৃতিগুলো এত বৈচিত্র্যময়, এত আকর্ষণীয়। ইথিওপিয়ার এই ঠোঁটের প্লেটের ঐতিহ্য কেবল একটি অলংকারের গল্প নয়; এটি মানুষের পরিচয়, বিশ্বাস, ইতিহাস এবং সৌন্দর্যবোধের এক জীবন্ত দলিল।



