বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনবৃহস্পতিবার, ২৫ জুন, ২০২৬
বিবিধ

গাজা: শিশুদের লক্ষ্যবস্তু করেছে ইসরায়েল?

গাজার শিশু(2)

জাতিসংঘের অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড ও ইসরায়েল বিষয়ক স্বাধীন আন্তর্জাতিক তদন্ত কমিশনের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইসরায়েল ইচ্ছাকৃতভাবে ফিলিস্তিনি শিশুদের লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে, যার ফলে গাজায় গণহত্যা, মানবতাবিরোধী অপরাধ এবং যুদ্ধাপরাধ সংঘটিত হয়েছে। একই সঙ্গে অধিকৃত পশ্চিম তীরেও যুদ্ধাপরাধের ঘটনা ঘটেছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়, ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ ও নিরাপত্তা বাহিনী ‘ইচ্ছাকৃতভাবে হাজার হাজার ফিলিস্তিনি শিশুর মৃত্যু এবং গুরুতর শারীরিক ও মানসিক ক্ষতি সাধনের মতো কর্মকাণ্ড চালিয়েছে’ এবং গত অক্টোবরের যুদ্ধবিরতির পরও এই সহিংসতা থামেনি।

কমিশনের মতে, এসব কর্মকাণ্ড ‘গাজায় ফিলিস্তিনিদের ভবিষ্যৎ ধ্বংস করার একটি পরিকল্পিত কৌশলের অংশ’, যেখানে বিশেষভাবে শিশুদেরই লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে।

তবে ইসরায়েলের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই প্রতিবেদনকে সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে। তাদের ভাষায় এটি ‘মানহানিকর প্রহসন’ এবং আগের মতোই একটি ‘প্রচারমূলক প্রতিবেদন’।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের নেতৃত্বে দক্ষিণ ইসরায়েলে হামলায় প্রায় ১,২০০ জন নিহত হন এবং ২৫১ জনকে জিম্মি করা হয়। সেই ঘটনার পরই ইসরায়েল গাজায় সামরিক অভিযান শুরু করে।

গাজার হামাস-নিয়ন্ত্রিত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, তখন থেকে ইসরায়েলি হামলায় অন্তত ৭৩,০৩৫ জন নিহত হয়েছেন, যার মধ্যে ২১,২৮০ জনেরও বেশি শিশু রয়েছে। জাতিসংঘ এই তথ্যকে নির্ভরযোগ্য হিসেবে বিবেচনা করে।

অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড ও ইসরায়েল বিষয়ক স্বাধীন তদন্ত কমিশনটি ২০২১ সালে জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদ দ্বারা গঠিত হয়। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ও মানবিক আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ তদন্ত করাই এর দায়িত্ব। এটি তিন সদস্যের একটি বিশেষজ্ঞ প্যানেল, যা জাতিসংঘের আনুষ্ঠানিক মুখপাত্র নয়।

গত সেপ্টেম্বরে কমিশনটি প্রথমবারের মতো গাজায় গণহত্যার অভিযোগ তোলে। তাদের আগের প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, ১৯৪৮ সালের গণহত্যা সনদের পাঁচটি মানদণ্ডের মধ্যে চারটি ইসরায়েলি বাহিনীর কর্মকাণ্ডে পূরণ হয়েছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো যথেষ্ট ভিত্তি রয়েছে।

ইসরায়েল তখনও সেই প্রতিবেদনকে কঠোরভাবে প্রত্যাখ্যান করে এবং এটিকে বিকৃত ও মিথ্যা দাবি হিসেবে আখ্যা দেয়।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের পর যুদ্ধবিরতির বিভিন্ন উদ্যোগ ও রাজনৈতিক প্রক্রিয়া চললেও সংঘাত পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। গত অক্টোবর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের উদ্যোগে একটি যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও উভয় পক্ষ একে অপরকে বারবার লঙ্ঘনের অভিযোগ করেছে।

গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বলছে, যুদ্ধবিরতির পরও অন্তত ১,০২০ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন, যার মধ্যে ২৬৫ জন শিশু রয়েছে। অন্যদিকে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী জানিয়েছে, তাদের চারজন সৈন্য নিহত হয়েছে।

মঙ্গলবার প্রকাশিত প্রতিবেদনে কমিশন বলেছে, গাজায় ইসরায়েলি সামরিক অভিযানের ‘তীব্রতা ও পদ্ধতিগত চরিত্র’ এখনো অব্যাহত রয়েছে, যার ফলে ফিলিস্তিনি শিশুরা অভূতপূর্ব মৃত্যু, আঘাত ও মানসিক ট্রমার শিকার হচ্ছে।

কমিশনের চেয়ারম্যান ভারতীয় বিচারবিদ শ্রীনিবাসন মুরালিধর বলেন, ২০২৫ সালের অক্টোবরের যুদ্ধবিরতির পরও শিশুদের হত্যা ও গুরুতর আহত হওয়ার ঘটনা অব্যাহত রয়েছে। তার মতে, আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে শিশুদের যে সুরক্ষা পাওয়ার কথা, তা ইসরায়েল কার্যত অগ্রাহ্য করছে।

তিনি আরও বলেন, ফিলিস্তিনি শিশুদের সুরক্ষা, পরিচর্যা ও জীবনধারণ ফিলিস্তিনি জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। তার ভাষায়, শিশুদের লক্ষ্যবস্তু করা মানে একটি জাতির ভবিষ্যৎ ও অস্তিত্বের ভিত্তির ওপর আঘাত হানা।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইসরায়েল গাজায় সরাসরি শিশুদের লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে। এতে কোয়াডকপ্টার ড্রোনের মতো নির্ভুল অস্ত্র ব্যবহার করে শিশুদের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গপ্রত্যঙ্গে আঘাত করা হয়েছে এবং স্নাইপার দিয়ে গুলি চালানো হয়েছে। আবাসিক ভবন, স্কুল ও বাস্তুচ্যুত মানুষের শিবিরে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন অস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে বলেও উল্লেখ রয়েছে।

পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি সেনা ও বসতি স্থাপনকারীদের হাতে শিশুদের লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে বলে কমিশন জানিয়েছে। শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হওয়ায় ইসরায়েল আইনগতভাবে দায়ী বলেও প্রতিবেদনে দাবি করা হয়।

এছাড়া প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গাজা ও পশ্চিম তীরের শিশুদের—বিশেষ করে কিশোরদের—গ্রেফতার, নির্যাতন এবং ইসরায়েলি কারাগার ও আটককেন্দ্রে অমানবিক আচরণের শিকার হতে হয়েছে। এমনকি আটক অবস্থায় যৌন ও লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার ঘটনাও নথিভুক্ত হয়েছে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, নবজাতক ও শিশু হাসপাতালগুলোর ওপর হামলার মাধ্যমে শিশুদের জীবনরক্ষাকারী চিকিৎসা পাওয়ার ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। পাশাপাশি ইসরায়েল যুদ্ধকৌশল হিসেবে অনাহার ব্যবহার করছে বলেও অভিযোগ করা হয়েছে। মানবিক সহায়তা প্রবেশে বাধা দেওয়ায় শিশুদের মধ্যে তীব্র অপুষ্টি ও দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

স্কুলে হামলা, ব্যাপক বাস্তুচ্যুতি এবং বিভিন্ন সেবা বন্ধের মাধ্যমে শিশুদের শিক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংসের অভিযোগও আনা হয়েছে, যার ফলে ফিলিস্তিনি সমাজের ভবিষ্যৎ ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ছে।

ইসরায়েলের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এসব অভিযোগ নাকচ করে জানিয়েছে, কমিশনটি একটি পক্ষপাতদুষ্ট ও ত্রুটিপূর্ণ প্রক্রিয়ার অংশ, যার লক্ষ্য সত্য অনুসন্ধান নয় বরং ইসরায়েলকে এককভাবে অভিযুক্ত করা।

তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, প্রতিবেদনে হামাসের হাতে নিহত ও অপহৃত ইসরায়েলি শিশুদের বিষয় উপেক্ষা করা হয়েছে এবং ফিলিস্তিনি শিশুদের মানবঢাল হিসেবে ব্যবহারের বিষয়টিও বাদ দেওয়া হয়েছে।

ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ আরও দাবি করেছে, তাদের অভিযোগের পক্ষে কোনো বিশ্বাসযোগ্য যাচাই ব্যবস্থা নেই।

ইসরায়েলের সরকার দীর্ঘদিন ধরেই গণহত্যার অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে আসছে এবং বলছে, গাজায় তাদের সামরিক অভিযান আত্মরক্ষার অংশ, যার লক্ষ্য হামাস ও অন্যান্য সশস্ত্র গোষ্ঠীকে পরাজিত করা এবং জিম্মিদের উদ্ধার করা।

তাদের দাবি, সেনারা আন্তর্জাতিক আইন মেনে কাজ করছে এবং বেসামরিক ক্ষতি কমাতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হচ্ছে।

এদিকে আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (ICJ) দক্ষিণ আফ্রিকার দায়ের করা গণহত্যা মামলার শুনানি চালাচ্ছে। তবে চূড়ান্ত রায় আসতে কয়েক বছর সময় লাগতে পারে।

ইসরায়েল এই মামলাকে ভিত্তিহীন এবং পক্ষপাতদুষ্ট বলে অভিহিত করেছে।

ইসরায়েলগাজাজাতিসংঘশিশু